প্রমোদ বিকাশ কার্বারি: পাহাড়ের বহুমুখী প্রতিভার এক দীপ্তিমান নাম - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘ পথরেখায় যে কজন মানুষ তাঁদের মেধা, মনন, জ্ঞান ও সৃজনশীলতার আলো দিয়ে স্বতন্ত্র এক পরিসর নির্মাণ করেছেন, প্রমোদ বিকাশ কার্বারি (ফেলাজেয়্যা) তাঁদের অন্যতম। পাহাড়ের মানুষের কাছে তিনি অধিক পরিচিত পি. বি. কার্বারি নামে। শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, কবি, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবী, এক জীবনের ভেতর এতগুলো পরিচয়কে ধারণ করা সহজ নয়। অথচ প্রমোদ বিকাশ কার্বারির জীবন যেন সেই বহুমাত্রিকতারই এক দীর্ঘ ও দীপ্তিমান পাঠ। 

তাঁর জীবনের বৃহৎ অংশ কেটেছে শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যসাধনায়। শ্রেণিকক্ষে তিনি জ্ঞানের আলো বিলিয়েছেন, প্রশিক্ষণকেন্দ্রে জ্ঞান ও দক্ষতার প্রসার ঘটিয়েছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগে যুক্ত থেকেছেন, আর সাহিত্যের পাতায় তুলে এনেছেন পাহাড়ের মানুষ, প্রকৃতি, জীবন, অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে। বিশেষত চাকমা ভাষায় তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যচর্চা তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্যভুবনে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ আসন দিয়েছে।

একজন মানুষের জীবনের মূল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি কী রেখে গেলেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, জ্ঞান, প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য, চিন্তা ও সংস্কৃতির কোন উত্তরাধিকার, সেখানেও তাঁর জীবনের তাৎপর্য নিহিত থাকে। সেই বিচারে পি. বি. কার্বারির জীবন শুধু একজন শিক্ষাবিদ বা সাহিত্যিকের জীবন নয়; এটি পাহাড়ের একটি সময়, সমাজ ও সাংস্কৃতিক জাগরণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

প্রমোদ বিকাশ কার্বারি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪০ সালের ২ জানুয়ারি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার শান্তিপুর গ্রামে। তাঁর পিতা কমল কিশোর কার্বারি এবং মাতা বনলতা চাঙমা। তাঁরা ছয় ভাই। যতিন্দ্র লাল কার্বারি, বীরেন্দ্র লাল কার্বারি, দিজেন্দ্র লাল কার্বারি, সত্যন্দ্র লাল কার্বারি, প্রমোদ বিকাশ (পি. বি.) কার্বারি (ফেলাজেয়্যা) ও পুন্দ্রে বিকাশ চাঙমা (মা আলাদা)। 

পাহাড়ের শান্ত-নির্জন পরিবেশে তাঁর শৈশব কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা, অনুসন্ধিৎসু মন এবং জ্ঞানের প্রতি গভীর টান। পরবর্তী জীবনে তাঁর যে বহুমাত্রিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে, তার বীজ যেন রোপিত হয়েছিল সেই শৈশবেই।

পরবর্তী জীবনে তিনি রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার তুলবান গ্রামের তরুণী মোহন চাঙমার কন্যা মানসী চাঙমাকে বিবাহ করেন। বিবাহের পর তিনি পরিচিত হন মানসী কার্বারি নামে। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় চার সন্তান- সুবীর চাঙমা, মেরিনা চাঙমা, এপোলো চাঙমা ও জেশন চাঙমা। সুবীর ও মেরিনা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী।

সংসার, কর্মজীবন ও সাহিত্য, জীবনের এই তিনটি প্রবাহকে একসঙ্গে বহন করেই তিনি এগিয়ে গেছেন দীর্ঘ পথ।

পি. বি. কার্বারির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় ১৯৫০ সালে রাঙ্গামাটি পুলিশ লাইনস্থ নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই তাঁর মেধার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৫৬ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে স্টার মার্ক অর্জন করেন। পরবর্তীতে এইচএসসি পরীক্ষাতেও প্রথম বিভাগ লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নিয়ে যায় ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও এমএ সম্পন্ন করেন এবং উভয় পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণি অর্জন করেন।

এই শিক্ষাযাত্রা ছিল কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। জ্ঞানকে নিজের মধ্যে আটকে না রেখে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার যে মানসিক প্রস্তুতি তাঁর পরবর্তী জীবনে দেখা যায়, তার ভিত তৈরি হয়েছিল এই শিক্ষাজীবনেই।

শিক্ষাজীবন শেষ করে পি. বি. কার্বারি শিক্ষকতাকে জীবনের প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে তাঁর কাছে শিক্ষকতা কখনোই কেবল চাকরি ছিল না। এটি ছিল মানুষ গড়ার দায়িত্ব, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সামাজিক অঙ্গীকার।

তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা তুলাবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর কেদারমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতলব ডিগ্রি কলেজ (কুমিল্লা), রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ, রাঙ্গামাটি নাইট কলেজ, শাহ হাই স্কুল, অভয় বিনোদিনী কলেজ (বাসাবো, ঢাকা), কদমতলা পূর্ব বাসাবো হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। সব মিলিয়ে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে প্রায় ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি কাপ্তাই টেক্সটাইল ট্রেনিং সেন্টার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি শুধু পাঠদান করেননি; অসংখ্য শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চা ও জীবনবোধ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল পেশার চেয়ে বড়, ছিল মানুষ গড়ার এক সামাজিক দায়িত্ব।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তাঁর সংস্পর্শে এসেছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তিনি তাঁদের জ্ঞান, জীবনবোধ ও চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর এই ভূমিকা তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে।

পি. বি. কার্বারির শিক্ষা-ভাবনা শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা যে একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান শক্তি, এই উপলব্ধি তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

এই বৃহত্তর শিক্ষা-ভাবনার সঙ্গে যুক্ত ছিল হিল পয়েন্ট স্কুল ও স্ট্যান্ড মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। তিনি এই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণের যে প্রাথমিক উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তার সঙ্গেও তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।

একজন শিক্ষক যখন একটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, তখন তিনি কয়েক ডজন শিক্ষার্থীর কাছে জ্ঞান পৌঁছে দেন; কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সঙ্গে যুক্ত হলে সেই জ্ঞানচর্চার পরিসর বহু প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। হিল পয়েন্ট স্কুল ও স্ট্যান্ড মডেল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা সেই বৃহত্তর শিক্ষাচিন্তারই পরিচায়ক।

তাঁর জীবনের এই দিকটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু নিজে শিক্ষা গ্রহণ করেননি, শুধু শিক্ষকতাও করেননি, শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজেও অংশ নিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা-দর্শনের মধ্যে তাই ব্যক্তিগত জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি সামাজিক শিক্ষাবিস্তারের একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায়।

শিক্ষা তাঁর কাছে ছিল মানুষকে আলোকিত করার মাধ্যম। সেই আলো যেন একটি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে আটকে না থাকে, সমাজের বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন পাওয়া যায়।

একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সাহিত্যিক যাত্রা অনেক সময় একটি ভাষা দিয়ে শুরু হয়ে অন্য ভাষায় নিজের প্রকৃত সত্তাকে খুঁজে পায়। পি. বি. কার্বারির ক্ষেত্রেও যেন তেমনই ঘটেছিল।

ছাত্রাবস্থায় তিনি চাঙমা ভাষায় কবিতা ও ছোটগল্প লিখতেন। কর্মজীবনের শুরুতে নানা ব্যস্ততার কারণে সাহিত্যচর্চায় কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। কিন্তু ১৯৬১ সাল তাঁর সাহিত্যিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিয়ে আসে।

বিঝু উপলক্ষে তুলবান হাই স্কুলে তাঁর রচিত একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। সেই নাট্যচর্চা তাঁকে চাকমা ভাষার সাহিত্য সম্ভাবনার দিকে নতুনভাবে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর ধীরে ধীরে চাকমা ভাষাই হয়ে ওঠে তাঁর সৃজনশীলতার অন্যতম প্রধান আশ্রয়।

কবিতা, ছড়া, নাটক, ছোটগল্প ও উপন্যাস বিভিন্ন সাহিত্যধারায় তিনি চাকমা ভাষাকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কলমে চাকমা ভাষা শুধু কথোপকথনের মাধ্যম হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে অনুভূতি প্রকাশের, চিন্তা নির্মাণের এবং সাহিত্য সৃষ্টির শক্তিশালী বাহন। এখানেই পি. বি. কার্বারির সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

তিনি নিজের চারপাশের মানুষ, পাহাড়ের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, প্রেম, স্মৃতি, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে সাহিত্যের উপাদান করেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্য একই সঙ্গে ব্যক্তিমানস ও সমাজমানসের দলিল হয়ে উঠেছে।

পি. বি. কার্বারির কথাসাহিত্য তাঁর বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর কথা মতে উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১। ধেবাছরি বো, ২। কুকি মোন পরানি আ মনচান, ৩। পরঙির জিংকানির বোজেক্যা ঝর, ৪। ঘর কুনত জিংকানি এবং ৫। রাজ কুমার মধু সন্ধ্যা।

নামগুলোর মধ্যেই যেমন চাকমা ভাষার স্বতন্ত্র সুর ধ্বনিত হয়, তেমনি এসব রচনার ভেতর দিয়ে পাহাড়ি সমাজের জীবন ও অনুভূতির নানা স্তর পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়।

তাঁর কথাসাহিত্যে মানুষ নিছক চরিত্র নয়, তারা একটি সমাজের প্রতিনিধি, একটি সংস্কৃতির বাহক এবং একটি সময়ের স্মৃতিবাহী। পাহাড়ের জীবনযাপন, সম্পর্ক, অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ তাঁর কথাসাহিত্যে স্থান পেয়েছে।

নাট্যকার হিসেবেও পি. বি. কার্বারির অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর নাট্যকর্মের মধ্যে রয়েছে- ১। যেঙরি উদে পুগ বেল (যা আগে ‘জাগি উদ’ নামে পরিচিত ছিল), ২। বজঙির মার চোত্তা পাদা দক, ৩। শিয়াল্যা মাহ্’জন্যা কেরামতি, ৪। এঙেরি কন মোগে কোচপেব, ৫। তিন দেবীর কোল কজ্যা এবং ৬। দ্বি মোক্যা ভিলে আর এক্কো মোক লব।

তাঁর নাট্যচর্চার সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তুলবান হাই স্কুলের সেই বিঝুর অনুষ্ঠান। সাহিত্য যখন মঞ্চে উঠে আসে, তখন তার প্রভাব কেবল পাঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দর্শকের চোখ, কান ও অনুভূতির মধ্য দিয়েও তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। পি. বি. কার্বারি সেই শক্তিকে উপলব্ধি করেছিলেন।

তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি সমাজের নানা বিষয়কে মানুষের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের আরও কাছে নিয়ে আসার প্রয়াস লক্ষ করা যায়।

কবিতার জগতে পি. বি. কার্বারির সৃষ্টিশীলতা আরও একটি স্বতন্ত্র মাত্রা অর্জন করেছে। তাঁর (মতে) উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কিযিঙৎ পুগোবেল, কোচপানা কবিতা, গোজেন লামা এবং রাধামন ধনপুদি (জুম কাবা)।

এর মধ্যে কিযিঙৎ পুগোবেল, গোজেন লামা ও রাধামন ধনপুদি (জুম কাবা) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  রেগা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি চাকমা, বাংলা ও ইংরেজি, তিন ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। তিন ভাষার এই বিন্যাস তাঁর সাহিত্যকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করেছে।

তাঁর কবিতায় পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের অন্তর্গত অনুভব। আছে দেশপ্রেম, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবাদী চেতনা এবং জীবনসংগ্রামের স্বর। তাই তাঁর কবিতাকে কেবল প্রকৃতিনির্ভর পাহাড়ি কবিতা হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। বরং তাঁর কবিতায় আধুনিক জীবনবোধ ও সামাজিক সচেতনতার একটি স্বতন্ত্র প্রকাশ লক্ষ করা যায়। তাঁর ছড়ার মধ্যে “এ্যাইল জুমর দেচ” উল্লেখযোগ্য, যার বাংলা অনুবাদও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন কবি।

এ ছাড়া “আলোর পথ দেখালো যারা” এবং “ধ্রুপদী নায়িকারা” তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। পি. বি. কার্বারির সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো তাঁর মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা।

তিনি চাকমা ভাষাকে কেবল দৈনন্দিন কথাবার্তার ভাষা হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে এই ভাষা ছিল সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা, অনুভূতি প্রকাশের ভাষা, সংস্কৃতির স্মৃতি বহনের ভাষা।

একটি ভাষা তখনই তার পূর্ণ সাহিত্যিক শক্তি অর্জন করে, যখন সেই ভাষায় কবিতা লেখা হয়, গল্প বলা হয়, নাটক মঞ্চস্থ হয়, উপন্যাস সৃষ্টি হয় এবং মানুষের জীবন ও স্বপ্নের কথা বলা হয়। পি. বি. কার্বারি তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের মধ্য দিয়ে সেই কাজটিই করে গেছেন।

তাঁর কলমে চাকমা ভাষা পেয়েছে কাব্যের ছন্দ, নাটকের সংলাপ, গল্পের বয়ান এবং উপন্যাসের বিস্তৃত জীবনভূমি। ফলে তাঁর সাহিত্যকর্ম চাকমা ভাষার লিখিত সাহিত্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরে পি. বি. কার্বারি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা তাঁর সাহিত্যেও প্রতিফলিত হয়েছে।

পাহাড়ের মানুষ, তাঁদের জীবন, ভাষা, সংস্কৃতি, স্বপ্ন ও সংগ্রাম তাঁর লেখায় বিভিন্ন মাত্রায় ফিরে এসেছে। তাঁর সাহিত্য তাই শুধু নান্দনিকতার অনুশীলন নয়; এর ভেতরে রয়েছে সমাজকে দেখা, মানুষকে বোঝা এবং সময়কে ধরে রাখার প্রয়াস।

তাঁর শিক্ষা-চিন্তা এবং সাহিত্যচর্চার মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্রও লক্ষ করা যায়। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, আর সাহিত্য সেই জ্ঞানকে অনুভব ও সৃষ্টির জগতে নিয়ে যায়। পি. বি. কার্বারির জীবন যেন এই দুই ধারার এক আন্তঃসম্পর্কেরই উদাহরণ।

পি. বি. কার্বারির সাহিত্যজীবনের আলোচনায় কিযিঙৎ পুগোবেল আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। গ্রন্থটি পাঠকসমাজে প্রশংসিত ও বহুপঠিত হয়েছে এবং এর বিক্রিও উল্লেখযোগ্য বলে জানা যায়।

তিন ভাষায় প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থ একদিকে চাকমা ভাষার পাঠকের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে, অন্যদিকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠকের কাছেও তাঁর সৃষ্টিকে পৌঁছানোর পথ তৈরি করেছে।

গ্রন্থটির কবিতায় আধুনিক জীবনবোধ, দেশপ্রেম, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের সংগ্রামের নানা স্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সেই কারণে কিযিঙৎ পুগোবেল তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য চিহ্ন হয়ে আছে।

প্রমোদ বিকাশ কার্বারির জীবনকে কোনো একটি পরিচয়ের বাক্সে আটকে রাখা যায় না। তিনি শিক্ষক, কিন্তু শুধু শিক্ষক নন; তিনি শিক্ষাবিদ। তিনি কবি, কিন্তু শুধু কবি নন; তিনি নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিকও। তিনি সাহিত্যিক, কিন্তু সাহিত্যকে সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি।

আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল। হিল পয়েন্ট স্কুল ও স্ট্যান্ড মডেল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা প্রমাণ করে যে শিক্ষা তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত পেশা ছিল না; শিক্ষা বিস্তারের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণের সঙ্গেও তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

তাঁর জীবনের বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতু রয়েছে- জ্ঞান, মানুষ ও সৃষ্টিশীলতার প্রতি দায়বদ্ধতা।

শিক্ষক হিসেবে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীর হাতে জ্ঞানের প্রদীপ তুলে দিয়েছেন। প্রশিক্ষক হিসেবে জ্ঞান ও দক্ষতার প্রসারে ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগে যুক্ত হয়ে শিক্ষার পরিসর বিস্তারে অংশ নিয়েছেন। আর সাহিত্যিক হিসেবে নিজের মাতৃভাষাকে সৃজনশীল প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত করেছেন।

সময়ের নদী কখনো থেমে থাকে না। প্রজন্ম বদলায়, মানুষের জীবনযাপন বদলায়, ভাষার ব্যবহারও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু একটি ভাষায় লেখা সাহিত্য সময়ের ভেতর মানুষের অস্তিত্বের চিহ্ন রেখে যায়। এই জায়গাতেই পি. বি. কার্বারির সাহিত্যিক ও শিক্ষাগত উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি যে সময়ে লিখেছেন, সেই সময়ের পাহাড়কে তিনি নিজের ভাষায় ধারণ করেছেন। তাঁর চরিত্রেরা কথা বলেছে নিজেদের ভাষায়, তাঁর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে পাহাড়ের মানুষের অনুভব, তাঁর নাটকে মঞ্চ পেয়েছে সমাজের নানা অনুষঙ্গ। আবার শিক্ষক ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষ হিসেবে তিনি জ্ঞানচর্চার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন।

তাঁর সাহিত্য তাই একদিকে ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ, অন্যদিকে একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও অংশ। তাঁর শিক্ষাজীবন ও শিক্ষা-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড একই সঙ্গে পাহাড়ের শিক্ষার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

একজন সাহিত্যিক যখন নিজের সমাজের কথা লেখেন, তখন তিনি কেবল বর্তমানকে লিখে যান না, ভবিষ্যতের জন্যও রেখে যান একটি স্মৃতিভাণ্ডার। আর একজন শিক্ষক যখন একটি প্রজন্মকে শিক্ষা দেন, তখন তাঁর প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা ও কর্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। পি. বি. কার্বারির জীবনে এই দুই উত্তরাধিকার পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে।

প্রমোদ বিকাশ কার্বারি পাহাড়ের বহুমুখী প্রতিভার এমন এক নাম, যাঁর জীবনকে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির তিনটি প্রবাহে একসঙ্গে পাঠ করা যায়। মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে প্রশিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগের সহযাত্রী এবং সেখান থেকে চাকমা ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যস্রষ্টা হয়ে ওঠার তাঁর দীর্ঘ পথচলা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলা ভাষায় কবিতা ও ছোটগল্প দিয়ে সাহিত্যচর্চার সূচনা করেও পরবর্তীতে চাকমা ভাষাকে নিজের সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কবিতা, ছড়া, নাটক ও উপন্যাসে তাঁর বিচরণ চাকমা সাহিত্যকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা। কিযিঙৎ পুগোবেল, গোজেন লামা, রাধামন ধনপুদি (জুম কাবা) সহ তাঁর অন্যান্য রচনা তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের সাক্ষ্য বহন করে।

অন্যদিকে হিল পয়েন্ট স্কুল ও স্ট্যান্ড মডেল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা তাঁর শিক্ষা-ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। তিনি শুধু জ্ঞান গ্রহণ ও বিতরণ করেননি; শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজেও নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

তাঁর জীবন যেন পাহাড়ের একটি দীর্ঘ পথ, কখনো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, কখনো প্রশিক্ষণকেন্দ্রে, কখনো নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগে, কখনো নাট্যমঞ্চে, আবার কখনো কবিতার নিঃশব্দ পাতায়। সেই পথের প্রতিটি বাঁকে তিনি রেখে গেছেন জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও ভাষার প্রতি ভালোবাসার চিহ্ন।

সময়ের সঙ্গে মানুষ হারিয়ে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়; কিন্তু ভাষায় লেখা সাহিত্য হারিয়ে যেতে চায় না। কারণ সাহিত্য মানুষের অস্তিত্বকে শব্দের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে। শিক্ষা মানুষকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে দেয়, আর সাহিত্য তাকে তার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

সেই অর্থে পি. বি. কার্বারির জীবন শুধু একজন বহুমুখী প্রতিভার ব্যক্তিগত কীর্তির স্মারক নয়, এটি পাহাড়ের শিক্ষা, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসেরও এক মূল্যবান অধ্যায়। তাঁর রেখে যাওয়া শব্দ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও গভীরভাবে পাঠ ও মূল্যায়নের দাবি রাখে।

তথ্যসূত্র

কবির সাক্ষাৎকার; কবির প্রকাশিত গ্রন্থাবলি; Chittagong Hill Tracts লেখক সম্মাননা ২০২৫- সংক্রান্ত তথ্য।

বি.দ্র.: গ্রন্থতালিকাটি আমার নিজস্ব সংকলন নয়; পি. বি. কার্বারির কাছ থেকেই সংগৃহীত। আমার জানা মতে, তাঁর তিনটি গ্রন্থ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে আরও কিছু অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ হয়। এর মধ্যে উল্লেখিত গ্রন্থগুলোর পাণ্ডুলিপির পাশাপাশি ছোটদের জন্য ‘এম. এন. লারমা’ শিরোনামের একটি পাণ্ডুলিপিও চোখে পড়ে। ফলে তাঁর প্রকাশিত সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি আরও কিছু অপ্রকাশিত সৃষ্টির অস্তিত্বের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

লেখাটিতে তথ্যগত অসংগতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। কোনো কোনো বক্তব্য আপনার জানা তথ্য বা মতের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তাই লেখাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে, নিজস্ব জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ রইল।    

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা