মহান শিক্ষাগুরু ও মানবতাবাদী চিত্ত কিশোর চাকমা - ইনজেব চাঙমা
![]() |
| ছবি উদ্দিপন চাঙমা থেকে সংগৃহীত |
তাঁর জীবনকে কেবল কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পিতা হিসেবে দেখলে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও অবদান আড়ালে পড়ে যায়। তিনি ছিলেন নিজের কর্ম, চিন্তা ও আদর্শে স্বতন্ত্র এক মানুষ। তাঁর সন্তানদের মধ্যে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (মঞ্জু) এবং জ্যোতিরীন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু), পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু তাঁদের পিতা হওয়ার পরিচয়ের বাইরেও চিত্ত কিশোর চাকমার নিজস্ব কর্মময় জীবন তাঁকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
চিত্ত কিশোর চাকমা ১৯১২ সালের ১২ ডিসেম্বর রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর থানার বুড়িঘাট মৌজার ছোট মহাপ্রুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন চানমনি চাকমা এবং মাতা সুন্দরপুদি (সুন্দরবি) চাকমা। পরবর্তীকালে খাগড়াছড়ির খবংপয্যা গ্রামের রমেশ চন্দ্র দেওয়ানের জ্যেষ্ঠ কন্যা সুভাষিণী দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।
তাঁদের সংসারে জন্ম নেন চার সন্তান, জ্যোতি প্রভা লারমা (মিনু), শুভেন্দু প্রবাস লারমা (বুলু), মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (মঞ্জু) এবং জ্যোতিরীন্দ্র নারায়ণ লারমা (সন্তু)। সন্তানদের তিনি শুধু পিতৃস্নেহেই আগলে রাখেননি; শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সমাজচেতনার মধ্য দিয়ে তাঁদের জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
চিত্ত কিশোর চাকমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। প্রথম জীবনে তিনি মহাপ্রুম উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। অষ্টম শ্রেণি থেকে তিনি মহামুনি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকেই ১৯৩০ সালে মেট্রিক পাস করেন।
এরপর তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে আই.এ. দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। কিন্তু পারিবারিক কারণে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন সেখানে থেমে গেলেও জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ কখনো থেমে যায়নি। পরবর্তী জীবনে শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা ও সমাজভাবনার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৩৩ সালে মহাপ্রুম এম.ই. স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। শিক্ষকতাকে তিনি নিছক জীবিকা হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন মানুষ গড়ে তোলার এক মহৎ দায়িত্ব হিসেবে।
চাকরির পাশাপাশি তিনি পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ভার্নাকুলার ট্রেনিং গ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালে একই অঞ্চলের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে ফিজিক্যাল ট্রেনিং সার্টিফিকেটও অর্জন করেন। শিক্ষার প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল গভীর ও বাস্তবমুখী। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ের পাশে ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা এবং তার ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন তদারকির দায়িত্বও তিনি নিজেই পালন করতেন।
তাঁর কাছে শিক্ষা মানে কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল শৃঙ্খলা, চরিত্র, শারীরিক সক্ষমতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ। প্রত্যন্ত পাহাড়ি সমাজে যখন শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন তিনি বহু শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসেন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী জীবনে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁদের সাফল্যের অন্তরালে এই শিক্ষকের শ্রম, শাসন ও স্নেহের স্মৃতি আজও জড়িয়ে আছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম শিক্ষক সমিতি গঠিত হওয়া। এর মাধ্যমে শিক্ষক সমাজকে সংগঠিত করার পাশাপাশি পাহাড়ে শিক্ষার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
চিত্ত কিশোর চাকমার ব্যক্তিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর সাহিত্যিক সত্তা। তিনি ছিলেন কবি, গীতিকার ও সাহিত্যানুরাগী। তাঁর সাহিত্যচর্চা ছিল অনেকটাই নীরব, অন্তর্মুখী ও প্রচারবিমুখ। জীবদ্দশায় তাঁর বহু রচনা প্রকাশের আলো পায়নি; কবিতা ও গানের অনেক পাণ্ডুলিপি অপ্রকাশিত থেকে যায় বলে জানা যায়।
তাঁর রচনার মধ্যে ব্যক্তিমানুষের অনুভূতির পাশাপাশি সমাজ, জাতিসত্তা, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও প্রতিফলিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জাতীয় চেতনা ও জাগরণের আকাঙ্ক্ষা তাঁর গানেও প্রকাশ পেয়েছে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে রচিত তাঁর একটি বহুল পরিচিত গানে নবজাগরণ, আত্মপরিচয় ও জাতিগত চেতনার আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে। সেই সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাঁর সমাজভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চাকমা জাতির ইতিহাস, সমাজ ও জীবনস্মৃতির প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তাঁর রচিত চাকমা জাতির জীবন স্মৃতি গ্রন্থটি ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি এতে চাকমা সমাজের জীবন, ঐতিহ্য ও অতীতের নানা উপাদান স্থান পেয়েছে। ফলে গ্রন্থটি তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি একটি সামাজিক-ঐতিহাসিক স্মৃতিদলিল হিসেবেও তাৎপর্য বহন করে।
শিক্ষার সঙ্গে শরীরচর্চা ও ক্রীড়ার সম্পর্ককেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য মেধার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতারও বিকাশ প্রয়োজন।
তাই শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ক্রীড়া ও শরীরচর্চার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল একটি সমন্বিত জীবনচর্চা, যেখানে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, চরিত্র, স্বাস্থ্য ও সামাজিক দায়িত্ববোধ একে অন্যের পরিপূরক।
চিত্ত কিশোর চাকমার জীবন ছিল তাঁর সময়ের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। জীবনসম্পর্কিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, ছাত্রজীবনেই তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের আন্দোলনের সহযোদ্ধা ছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার, আত্মপরিচয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তাঁর চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। জুম্ম জাতীয় চেতনার বিকাশ, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারভিত্তিক আন্দোলন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়।
তবে তাঁর সমাজভাবনাকে শুধু রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর চিন্তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না। তাঁর কাছে জাতিসত্তার বিকাশের প্রশ্নের সঙ্গে শিক্ষা, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল।
জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে চিত্ত কিশোর চাকমা প্রবেশ করেন গভীর ধর্মীয় সাধনার পথে। শিক্ষকতা ও কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর ১৯৬৯ সালে কাপ্তাইয়ের চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারে তিনি শ্রামণ হিসেবে দীক্ষা গ্রহণ করেন। একই বছরে রাঙামাটি চাকমা রাজবিহারে শ্রীমৎ ধর্মপ্রিয় ভিক্ষু নামে উপসম্পদা গ্রহণ করেন।
১৯৭০ সালে তিনি দিঘীনালা বনবিহারে আগমন করেন। সে সময় সেখানে শ্রদ্ধেয় সাধনানন্দ ভান্তে (বনভান্তে) অবস্থান করছিলেন। প্রায় ছয়-সাত মাস তাঁরা সেখানে একসঙ্গে অবস্থান করেন। পরবর্তীকালে বনভান্তে লংগদুর তিনটিলা বনবিহারে চলে গেলে ধর্মপ্রিয় ভান্তে দিঘীনালা বনবিহারে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন।
তাঁর ধর্মজীবনের বৈশিষ্ট্য ছিল কঠোর শীলাচরণ, সংযম ও সাধনা। তিনি আজীবন ধুতাঙ্গধারী ও শীলবান ভিক্ষুর জীবন অনুসরণ করেন এবং পরবর্তীকালে মহাস্থবির পদে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর ধর্মীয় জীবন ছিল আত্মসংযম, নৈতিকতা ও মানবিকতার এক অনুশীলন।
দিঘীনালা বনবিহারে তাঁর দীর্ঘ অবস্থান ছিল জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৮৬ সালের ১৩ জুন দিঘীনালা উপজেলায় সেনাবাহিনী ও সেটেলার বাঙ্গালিদের সংঘটিত অগ্নিসংযোগে বহু গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে গেলে বনবিহারটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময় এলাকার বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হলে ধর্মপ্রিয় মহাস্থবিরও চলে যেতে বাধ্য হয়।
কিছুদিন তিনি দিঘীনালার নোকাছড়ায় অবস্থান করেন। সেখানে রাঙ্গু (ডাক নাম) নামে এক ব্যক্তি জঙ্গলের মধ্যে তাঁর জন্য ছোট্ট একটি কুঠির নির্মাণ করে দেন এবং নিয়মিত তাঁর দেখাশোনা করতেন। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভারতে পটাছড়ায় চলে যেতে হয়।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর জুম্ম শরণার্থী ও শান্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাবর্তনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেই সময় ধর্মপ্রিয় মহাস্থবিরও দেশে ফিরে আসেন। তবে ততদিনে তাঁর বয়স অনেক বেড়ে গেছে। বার্ধক্যজনিত কারণে আর দিঘীনালা বনবিহারে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি আবারও নোকাছড়ায় রাঙ্গুর কাছে সেই পুরোন কুঠিরে অবন্থান করেন।
পরবর্তী সময়ে বার্ধক্য আরও গভীর হলে তাঁকে খাগড়াছড়ির নানিয়ারখিয়ায় তাঁর একমাত্র কন্যা জ্যোতিপ্রভা লারমার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। জীবনের শেষ পর্বে সেখানেই তিনি আপনজনের স্নেহ ও পরিচর্যায় অবস্থান করেন।
১৯৯৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি সরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পানছড়ি নিজ জায়গাতে তাঁর দাহ কার্য সম্পাদন করা হয়। একটি দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজভাবনা ও ধর্মীয় সাধনার উত্তরাধিকার আজও স্মরণীয়।
চিত্ত কিশোর চাকমার জীবনকে বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তাঁর সন্তানদের জীবন ও চিন্তার দিকে তাকানো। তাঁর চার সন্তান- জ্যোতি প্রভা লারমা (মিনু), শুভেন্দু প্রবাস লারমা (বুলু), মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (মঞ্জু) এবং জ্যোতিরীন্দ্র নারায়ণ লারমা (সন্তু), প্রত্যেকেই তাঁর পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার উত্তরাধিকার বহন করেছেন।
বিশেষত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এবং জ্যোতিরীন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার জীবন ও চিন্তার বিকাশে পিতার প্রভাবের কথা তাঁদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। ২০০০ সালের মে মাসে প্রথম আলো-তে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে জ্যোতিরীন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা তাঁর পিতাকে শিক্ষক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে স্মরণ করেন এবং তাঁকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম শিক্ষক, পারিবারিক জীবনের বন্ধু ও সংগ্রামী জীবনের পরামর্শদাতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ থেকে বোঝা যায়, চিত্ত কিশোর চাকমার প্রভাব শুধু তাঁর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা ও জীবনদর্শনের ওপরও তাঁর গভীর ছাপ ছিল।
চিত্ত কিশোর চাকমার জীবনকে একটি মাত্র পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যিনি শিক্ষাকে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন; এমন একজন সাহিত্যিক, যিনি শব্দের মধ্যে জাতির স্মৃতি ধারণ করতে চেয়েছিলেন; এমন একজন ক্রীড়া সংগঠক, যিনি শিক্ষার সঙ্গে শরীরচর্চার সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছিলেন; এমন একজন সমাজচিন্তক, যিনি মানুষের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন; এবং এমন একজন ধর্মীয় সাধক, যিনি জীবনের শেষ অধ্যায়ে আত্মসংযম ও নৈতিকতার পথ অনুসরণ করেছিলেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদ, পুরস্কার কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার নিহিত মানুষের মধ্যে আলো জ্বালানোর প্রয়াসে। তাঁর ছাত্রদের জীবনে, তাঁর সাহিত্যকর্মে, তাঁর সন্তানদের স্মৃতিতে, তাঁর শিক্ষাদর্শনে এবং তাঁর সমাজভাবনায় সেই আলোর প্রতিফলন আজও অনুভব করা যায়।
একজন মানুষের জীবন তখনই সত্যিকার অর্থে মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তাঁর চলে যাওয়ার পরও তাঁর চিন্তা ও কর্ম অন্য মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে যায়। চিত্ত কিশোর চাকমার জীবন সেই অর্থে একটি আলোকিত উত্তরাধিকার।
মহান শিক্ষাগুরু, সাহিত্যিক, সমাজচিন্তক, মানবতাবাদী এবং ধর্মীয় সাধক শ্রীমৎ ধর্মপ্রিয় মহাস্থবির, চিত্ত কিশোর চাকমার জীবন ও কর্ম তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ ও মানবিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র
- চাকমা জাতির জীবন স্মৃতি , চিত্ত কিশোর চাকমা
- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রকাশনা
- প্রথম আলো, মে ২০০০- জ্যোতিরীন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার সাক্ষাৎকার
- নবকমল চাঙমা- দিঘীনালা উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান, মণিময় চাঙমা- দিঘীনালা পূর্ব কাঠালতলী, আর্য্যমিত্র চাঙমা, ঔপন্যাসিক ও কেভি দেবাশীষ চাঙমা- ঔপন্যাসিক।
- বি.দ্র.: লেখাটিতে তথ্যগত অসংগতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। কোনো কোনো বক্তব্য আপনার জানা তথ্য বা মতের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তাই লেখাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে, নিজস্ব জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ রইল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন