পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত কীভাবে শুরু হল- ইনজেব চাঙমা
গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম, “জুম্মদের দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ : বিভেদের শেকড় কোথায়?” তখন প্রশ্নটি তুলেছিলাম, কিন্তু প্রশ্নের গভীরে যাওয়া হয়নি। আজ সেই শেকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর চেষ্টা করছি-
এ ফিরে দেখা কোনো পক্ষকে একতরফাভাবে অভিযুক্ত করা কিংবা কোনো পক্ষকে নির্দোষ প্রমাণ করার প্রয়াস নয়। বরং একটি দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাসের বাঁকগুলো সামনে আনার চেষ্টা, যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে, কীভাবে একই স্বপ্ন, একই জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ও একই অধিকারবোধে উদ্বুদ্ধ মানুষ একসময় পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠল।
প্রায় তিন দশকের এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত জুম্ম সমাজকে কী দিয়েছে, আর কী কেড়ে নিয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব হয়তো এখনো হয়নি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। মানুষ হারিয়ে গেলে কোনো রাজনৈতিক অর্জনই শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না।
পাহাড়ের এই যুদ্ধ একদিনে ভাইয়ে-ভাইয়ে যুদ্ধ হয়ে ওঠেনি। যুদ্ধের আগে এসেছিল মতভেদ, মতভেদের আগে তর্ক, তর্কের আগে অবিশ্বাস। যে মানুষগুলো একসময় একই হোস্টেলের একই টেবিলে বসে আন্দোলনের স্বপ্ন এঁকেছিল, সময়ের নির্মমতায় তাদেরই কেউ কেউ একদিন পরস্পরের পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে। সেই দীর্ঘ পথের প্রতিটি বাঁকে আছে কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু বিতর্ক, কিছু ভুল, কিছু ক্ষোভ এবং শেষ পর্যন্ত কিছু রক্তের দাগ। সেই ধারাবাহিকতাই এখানে তুলে ধরা হলো।
২০ মে ১৯৯২। রাঙ্গামাটি। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান চলছে। বাইরে তখন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সংঘাতের পরিবেশ। পাহাড়িদের ঘরবাড়ি পুড়ছে। সেই সময় পিসিপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসার একটি মন্তব্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। তার নামে উদ্ধৃত বক্তব্য ছিল, “রাঙ্গামাটির লোকেরা সবাই সুবিধাবাদী, আপোষকামী, সরকারী দালাল। অনেক ঘর পুড়ে গেছে ভালো হয়েছে।” আরও একটি বক্তব্য তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রচারিত হয়, “What Khagrachari thinks today, Rangamati thinks tomorrow.”
ঘর পোড়া মানুষের সামনে তার পোড়া ঘরকে ‘ভালো হয়েছে’ বলা স্বাভাবিকভাবেই রাঙ্গামাটির সচেতন ছাত্রসমাজ ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে। বক্তব্যটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা যাই হোক, এর অভিঘাত সংগঠনের ভেতরে পড়ে। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক মানসিকতার পার্থক্যও তখন আলোচনায় আসে। তবে ১৯৯২-এর এই বিতর্ককে পরবর্তী বড় সংঘাতের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা যায় না। এর পরের বছর নানিয়ারচরের ঘটনাই পিসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দেয়।
২৭ অক্টোবর ১৯৯৩ নানিয়ারচর শাখার প্রথম কাউন্সিল সম্পন্ন করার জন্য তৎকালীন পিসিপি কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে একদল ছাত্রনেতা নানিয়ারচরে যান। ২৮ অক্টোবর কাউন্সিল শেষ করে রাঙ্গামাটি ফেরার জন্য সফরকারী দলটি যাত্রীছাউনিতে যায়। যাত্রীছাউনির একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। যাত্রী ছাউনিতে পা রেখে উপরে বসে যাওয়া নিয়ে চেকপোস্টে দায়িত্বরত সেনা সদস্যদের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন প্রসিত।
এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে সফর টীমের জন্য নির্ধারিত ট্রলারের হ্যান্ডেলটি তুলে নিয়ে যায়। ছাত্রছাত্রীদের জমায়েত করে মিছিল সহকারে প্রসিতকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় এবং প্রসিত রাঙ্গামাটি না গিয়ে মহালছড়ি হয়ে খাগড়াছড়ি চলে আসে। আসার আগে নানিয়ারচর নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দিয়ে আসে তারা যেন যাত্রী ছাউনি সেনামুক্ত করার জন্য কর্মসূচী ঘোষণা করে। পাশাপাশি সেখান থেকে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও ঢাকায় জানানো হয় যে, প্রসিতকে নানিয়ারচরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সেদিনই ২৮ অক্টোবর খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ ওঠে। ২৯ অক্টোবর ডিসি অফিস ঘেরাও করা হয়। রাতে মাইকিং করতে গেলে পুলিশ মাইক জব্দ করে এবং রিপন চাকমা ও ধর্মজ্যোতি চাকমাকে আটক করে পরে ছেড়ে দেয়।
৩০ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার খেজুরবাগান মাঠ থেকে ডিসি অফিসের সামনে অবস্থান ধর্মঘটের উদ্দেশ্যে মিছিল বের হলে আবারও সংঘর্ষ হয়। পিসিপি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কয়েকজন কর্মী আহত হন। নানিয়ারচর ও খাগড়াছড়ির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন তখন অন্য জায়গায়।
১৭ নভেম্বর নানিয়ারচরের যাত্রীছাউনি সেনামুক্ত করার কর্মসূচি নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়। এক পক্ষের যুক্তি ছিল, একটি নির্দিষ্ট যাত্রীছাউনি সেনামুক্ত করলেই তো পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম সেনামুক্ত হবে না। আন্দোলন হওয়া উচিত সামগ্রিক সেনাশাসন ও সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, ১৭ নভেম্বর নানিয়ারচরের বাজারের দিন। দূর-দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ বাজারে আসবেন। সংঘর্ষ হলে সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।
১৫ নভেম্বর নানিয়ারচর থেকে ঢাকায় জানানো হয়, পরিস্থিতি থমথমে। কর্মসূচি হলে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। কর্মসূচি বাতিল করা হবে কি না জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু প্রসিত খীসা কর্মসূচি বাতিল বিপক্ষে।১৭ নভেম্বর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ এবং পরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলির করে। বহু চাঙমা হতাহত হন, চাঙমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নানিয়ারচর ছ’কুড়িবিল থেকে লাশের পর লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ে। নানিয়ারচরের ঘটনা পাহাড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে। প্রসিত বিকাশ খীসার ভূমিকা নিয়ে সংগঠনের ভেতরেও সমালোচনা শুরু হয়।
৭ ডিসেম্বর ১৯৯৩ ঢাকায় নানিয়ারচর ঘটনার প্রতিবাদে শোক সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ৯ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তদন্ত ও বিচারের দাবিতে প্রতীক অনশন ও সমাবেশ হয়। নানিয়ারচর শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি হয়ে থাকেনি; এটি পিসিপির অভ্যন্তরেও নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
১৭ মার্চ ১৯৯৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের চায়ের দোকানের পাশে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে নানিয়ারচর গণহত্যা, সেনাবাহিনী ও সরকারের দমন-পীড়নের প্রতিবাদে বিঝু উৎসব বর্জনের প্রস্তাব করেন প্রসিত। কিন্তু সবাই এতে একমত ছিলেন না।
বিঝু পাহাড়িদের অন্যতম প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। ফলে উৎসব বর্জনের সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল লোগাং ঘটনার পর ১৩ এপ্রিল বিঝু বর্জনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু ১৯৯৪ সালে নানিয়ারচরের ঘটনার প্রায় ছয় মাস পর একই ধরনের কর্মসূচি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এর মধ্যেই ১৯৯৪ সালের বিঝু উপলক্ষে বিপ্লব চাকমা ও জিতেন চাকমার নেতৃত্বে ৩৪ জনের বেশি ছাত্রছাত্রী পুনর্মিলনী ভ্রমণে যান। তাদের নিয়ে সংগঠনের ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ তাদের ‘দালাল’ ও ‘জাতির শত্রু’ বলেও আখ্যা দেন। চম্পানন চাকমা, মনোৎপল চাকমা, জলিমং মারমা ও প্রদীপ চাকমাসহ কয়েকজনকে মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ৩০ এপ্রিল জগন্নাথ হলের টেনিস কোর্টে বিঝু-পরবর্তী পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরপর ১৩–১৫ জুন ১৯৯৪ চট্টগ্রামের ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটে পিসিপির চতুর্থ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকের তালিকা নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে চবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সুখেশ্বর চাকমা পল্টুকে কাউন্সিল হলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় কমিটির যুক্তি ছিল, পল্টু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে রাঙ্গামাটিতে বিঝু উদযাপন করেছিলেন।
চবি শাখা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। কাউন্সিলের ভেতর উত্তেজনা বাড়ে। একপর্যায়ে ‘ধর ধর’ স্লোগান ওঠে এবং রিপন চাকমা ও জ্ঞান জ্যোতি চাকমা মারধরের শিকার হন। এখানেই রাজনৈতিক মতভেদ সাংগঠনিক সংঘাতের আরও কাছাকাছি চলে আসে।
২০ মে ১৯৯৫ খাগড়াছড়ির খেজুরবাগান মাঠে পিসিপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার রাজীব চাকমা (বর্তমানে দিঘীনালা সরকারি কলেজে প্রভাষক) কে মারধরের ঘটনা ঘটে। তাকে উদ্ধারের জন্য সুগতদর্শী চাকমাসহ কয়েকজন এগিয়ে আসেন। ৩০ মে দীলিপ চাকমাকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এর পর বিভিন্ন নেতাকর্মীকে ঘিরে চাপ, হুমকি ও সাংগঠনিক বিরোধের অভিযোগ বাড়তে থাকে। বঙ্গরত্ন চাকমা, বিপ্লব চাকমা, মনোৎপল চাকমা ও বিতাংশু চাকমাসহ কয়েকজনের নাম এসব বিরোধে সামনে আসে। ১৫ জুন ১৯৯৫ দুদুকছড়ায় এক প্রকাশ্য জনসভায় জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা হঠকারী কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানান।
১৮ জুলাই নানিয়ারচরে এক সভাকে কেন্দ্র করে সন্তোষ বিকাশ খীসা, সমর বিজয় চাকমা, তোষণ চাকমা ও সতীশ চন্দ্র চাকমাসহ কয়েকজনকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী বছরগুলোতে এই সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
১৮–২০ জুন ১৯৯৬ পিসিপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ২১ জুন খাগড়াছড়ির খবংপয্যায় নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভা হয়। এর কিছুদিন আগে, ১২ জুন, ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা নিখোঁজ হন। তাকে অপহরণ করে সেনাবাহিনী। আজও তার সন্ধান মেলেনি।
২৭ জুন কল্পনা চাকমার নিখোঁজ হওয়ার প্রতিবাদে তিন পার্বত্য জেলায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি দেওয়া হয়। বাঘাইছড়ির বাবুপাড়া এলাকায় কর্মসূচি চলাকালে রূপন চাকমা নিহত হন। একই সময় সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমা নিখোঁজ হন। এ ঘটনাগুলো পাহাড়ের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
১১–১২ জুলাই কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই ঢাকায় বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটির ভেতরে পদত্যাগ, বৈধতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ চরমে ওঠে। ১০ আগস্টের সভায় সম্পাদকমণ্ডলীর কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করেন। পরে ২২–২৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায় নতুন করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় মৃগাঙ্ক খীসা, থোয়াই অং মারমা, জলিমং মারমা, ভূবন ত্রিপুরা, পলাশ খীসাসহ বিভিন্ন নেতা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নেন।
জেএসএসের নেতাদের মাধ্যমে সমঝোতার উদ্যোগও নেওয়া হয়। জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্রশেখর চাকমা ও প্রধীর তালুকদারসহ নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আলোচনার চেষ্টা করেন। কিন্তু সংগঠনের ভেতরের অবিশ্বাস তখন এতটাই গভীর যে সমঝোতার উদ্যোগ স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
১৯৯৭ সালে পিসিপির বিভাজন প্রকাশ্য রূপ নেয়। একটি অংশ ১৭ জুন খাগড়াছড়িতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। পরদিন, ১৮ জুন, বৃহত্তর অংশ চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্রাবাসে বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন করতে বাধ্য হয়। সেই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিন বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। মৃগাঙ্ক খীসা লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন থোয়াই অং মারমা, জলিমং মারমা, পলাশ খীসা ও মৃগাঙ্ক খীসা। ঘোষণা দেওয়া হয়, ৩০ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ১–২ জুলাই সপ্তম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে ১১ মে খাগড়াছড়ির নির্মাণাধীন স্টেডিয়ামে সাবেক পিসিপি নেতা উষাময় খীসাকে মারধর করা হয়। ঘটনাটির সঙ্গে প্রসিত খীসার কর্মীদের নাম আসে। উষাময় তখন তার বোনদের সঙ্গে স্টেডিয়ামে ছিলেন। একই সময়ে পিসিপির ভেতরে সাংগঠনিক বিরোধ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে পুরনো ঐক্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
তারপর আসে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭। বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। কিন্তু চুক্তির বিরোধিতা করেন প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ধারা। চুক্তির বিরোধিতায় ঢাকায় কর্মসূচি হয় এবং চুক্তির কপি পোড়ানোর ঘটনাও ঘটে। এখান থেকে বিভাজন আর কেবল ছাত্ররাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকল না। এটি পাহাড়ের মূল রাজনৈতিক ধারার দুই ভিন্ন পথের বিভাজনে পরিণত হলো।
চুক্তির পরপরই বিরোধ আরও তীব্র হয়। ১৬ জানুয়ারি ১৯৯৮ কুতুকছড়িতে চুক্তির সমর্থনে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মরত কুমার চাকমা ছিলেন অন্যতম সক্রিয় ব্যক্তি। তার ছোট ভাই অশ্বিনী কুমার চাকমাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। ১৮ জানুয়ারি মরত কুমার না পেয়ে তার ভাই অশ্বিনী কুমার চাকমাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা চুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে থাকা দুই রাজনৈতিক ধারার মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর ২৬ ডিসেম্বর ১৯৯৮ পাঁচ সদস্যের ইউপিডিএফ আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়।
এভাবেই দীর্ঘদিনের ছাত্ররাজনৈতিক বিভাজন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, মতাদর্শগত বিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য নতুন এক সশস্ত্র সংঘাতের বাস্তবতা তৈরি করে। এরপর পাহাড়ে সংঘাত আরও রক্তাক্ত হয়। বহু সম্ভাবনাময় তরুন অকালে প্রদীপ নিভে যায়।
এই সময় পাহাড়ের রাজনীতি এমন এক জায়গায় পৌঁছায় যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই অনেক সময় ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। তবু আলোচনার পথ একেবারে বন্ধ হয়নি। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০০ খাগড়াছড়ির নারারখাইয়ায় অনন্ত বিহারী খীসার বাড়িতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক হয়। জেএসএসের পক্ষে নেতৃত্ব দেন তাতিন্দ্র লাল চাকমা (মেজর পেলে)। প্রসিত চক্রের পক্ষে ছিলেন দীপ্তি শংকর চাকমা।
বৈঠকে তিনটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়-
প্রথমত, ইতিমধ্যে যারা অপহৃত হয়েছেন তাদের উদ্ধারে উভয় পক্ষ সহযোগিতা করবে।
দ্বিতীয়ত, চলাচলের সময় একে অন্যকে বাধা, ধরপাকড় বা মিছিল-মিটিংয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনার দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করা হবে।
কিন্তু এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বৈঠকের প্রায় ১২ ঘণ্টা পর সমিতির একজন সদস্য সুখেন্দু বিকাশ চাকমাকে খাগড়াছড়ির দাঁতকুপ্যা এলাকায় গুলি করে হত্যার করে। ফলে সদ্য হওয়া সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ে। এরপর জীবন প্রদীপ দেওয়ানকে অপহরণের ঘটনা নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। তাকে মুক্তির বিনিময়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব আসে। তিন পার্বত্য জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আহ্বানে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০০ আবারও সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
জেএসএসের পক্ষে ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক লক্ষ্মী প্রসাদ চাকমা ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সত্যবীর দেওয়ান। অপরপক্ষে প্রসিত চক্রের পক্ষে ছিলেন সঞ্চয় চাকমা, অভিলাষ চাকমা ও অনিমেষ চাকমা। উপস্থিত ছিলেন গৌতম দেওয়ান, মুধুরা লাল চাকমা, উপেন্দ্র লাল চাকমাসহ আরও অনেকে।
প্রসিত পক্ষ থেকে আক্রমণ না করা এবং ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলন পরিচালনার প্রস্তাব আসে। জেএসএসের পক্ষ থেকে বলা হয়, যে অস্ত্র দিয়ে হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজি করা হচ্ছে, সেগুলো তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে জমা দিতে হবে এবং জেএসএসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্র করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কোনো সমঝোতা হয়নি। আলোচনা শেষ হয় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই।
এই দীর্ঘ ইতিহাসে প্রসিত বিকাশ খীসার ভূমিকা নিয়ে নানা মত রয়েছে। তাকে কেউ জাতীয়তাবাদী ও জুম্ম অধিকার আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী হিসেবে দেখেন, আবার তার রাজনৈতিক কৌশল ও নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনাও রয়েছে।
পিসিপির প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রনেতার আপত্তি ছিল । বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে ধীরাজ চাকমা ও ধীমান চাকমা তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে সহায়তা করেন। দ্বিতীয় কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ার পর প্রসিত খীসা কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে প্রচার ও গ্রুপিংয়ে যুক্ত হন। এ সময় এডভোকেট শক্তিমান চাকমাসহ কয়েকজনের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
তৃতীয় কমিটিতে তিনি সভাপতি হন। পরবর্তীতে কাউন্সিলের আগে তিনি আর কমিটিতে থাকবেন না বলে প্রচার করলেও শেষ পর্যন্ত আবার সভাপতির পদে ফিরে আসেন। পরবর্তী সময়ে সভাপতি হিসেবে কে এস মং মারমার নাম আসে। বৃহত্তর স্বার্থে এডভোকেট শক্তিমান চাকমা তার জন্য সভাপতির পদ ছেড়ে দেন । কিন্তু কে এস মং মারমার দায়িত্বকালও দীর্ঘ হয়নি। পরে তিনি বান্দরবানে চলে যান।
অন্যদিকে পিসিপি থেকে বিদায় নেওয়ার পর প্রধীর তালুকদারকে সরিয়ে প্রসিত পাহাড়ী গণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। তার রাজনৈতিক জীবনে অর্থ সম্পাদক হিসেবে বারবার দেবাশীষ চাকমা বাবলুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই নেতৃত্বের ইতিহাস দেখায়, ব্যক্তি, সংগঠন ও রাজনৈতিক কৌশলের দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে কীভাবে একটি বৃহত্তর আন্দোলনের ভেতরে বিভাজন তৈরি করেছিল।
এই ধারাবাহিকতায় সমীরণ চাকমার ঘটনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি পাহাড়ী গণ পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকা অবস্থায় ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের দিন প্রসিতের নির্দেশে বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কিন্তু ২৬ ডিসেম্বর ১৯৯৮ পাঁচ সদস্যের ইউপিডিএফ আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হলে তাকে সেই কমিটিতে রাখা হয়নি। পরবর্তীতে তিনি সংগঠন থেকে দূরে সরে যান এবং একসময় জনসংহতি সমিতির সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হন।
এই ঘটনাটি রাজনীতির একটি কঠিন শিক্ষা সামনে আনে, কোনো আন্দোলনে ব্যক্তি যখন কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজনের অংশ হয়ে ওঠেন, তখন তার অবদান ও অবস্থান দুটিই পরিস্থিতির সঙ্গে বদলে যেতে পারে।
১৯৯২ থেকে ২০০০ এই সময়টুকু পেছনে তাকালে দেখা যায়, সংঘাত হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। প্রথমে ছিল বক্তব্য নিয়ে বিরোধ। তারপর কর্মসূচি নিয়ে মতভেদ। এরপর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব। তারপর ক্ষমতা লোভ, কাউন্সিল নিয়ে সংঘর্ষ। তারপর ব্যক্তিকে ‘শত্রু’ আখ্যা দেওয়া। তারপর হামলা। তারপর প্রতিশোধ। তারপর রাজনৈতিক সংগঠনের বিভাজন। তারপর সশস্ত্র সংঘাত। আর একসময় একই জাতির মানুষের হাতে একই জাতির মানুষের মৃত্যু।
তাই ইতিহাসের বিচার করতে হলে শুধু একজনকে দায়ী করলেই পুরো সত্য পাওয়া যাবে না। আবার ব্যক্তির সিদ্ধান্তের দায়ও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন রাজনৈতিক মতভেদকে রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যে রাখা গেল না? কেন সমালোচনা ধীরে ধীরে শত্রুতায় পরিণত হলো? কেন সাংগঠনিক বিরোধ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল? কেন আলোচনার টেবিল বারবার ব্যর্থ হলো? আর কেন একটি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ভেতরেই সেই জাতির মানুষ পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরল?
ইতিহাসের কাজ প্রতিশোধের ভাষা তৈরি করা নয়; ইতিহাসের কাজ ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ইতিহাস তাই শুধু নিহত মানুষের তালিকা নয়। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইতিহাস, সাংগঠনিক ব্যর্থতার ইতিহাস, নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের ইতিহাস এবং সবচেয়ে বড় কথা, পারস্পরিক আস্থার ভেঙে পড়ার ইতিহাস।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে। কৌশল নিয়ে বিতর্ক হবে। কেউ কোনো চুক্তির পক্ষে থাকবে, কেউ বিপক্ষে থাকবে। কিন্তু মতভেদের শেষ পরিণতি যদি সহিংসতা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই জনগণই, যাদের অধিকারের জন্য রাজনীতি করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয়, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করেছে। সেই সংগ্রামের ইতিহাসে যেমন আত্মত্যাগ আছে, তেমনি আছে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্যও। আজ তাই প্রয়োজন অতীতকে নতুন করে পড়া।
কারও রাজনৈতিক অবস্থানকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার জন্য নয়; বরং বোঝার জন্য, কোথায় মতভেদ শুরু হয়েছিল, কোথায় আস্থা ভেঙেছিল, কোথায় আলোচনার পথ বন্ধ হয়েছিল এবং কোন মুহূর্তে রাজনীতি রক্তের পথে চলে গিয়েছিল।
অতীতের ক্ষত মুছে ফেলা যাবে না। নিহতদের ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের পথ বেছে নেওয়া যায়। পাহাড়ের আগামী প্রজন্ম যেন উত্তরাধিকার হিসেবে আরেকটি সংঘাতের ইতিহাস না পায়, এ দায়িত্ব শুধু কোনো একটি সংগঠনের নয়, কোনো একটি নেতারও নয়। এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব। কারণ রাজনৈতিক বিজয়ের চেয়েও বড় হলো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা। আর একটি জাতির মুক্তির স্বপ্ন কখনো নিজের মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে পূর্ণতা পেতে পারে না।
তথ্যসূত্র-
সাবেক ছাত্রনেতাদের কথোপকোথন ও খীসা, পলাশ- জুম্ম সংবাদ বুলেটিন, বর্ষ- ১০, জানুয়ারি ২০০২ খ্রি.

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন