এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক বিপদে সাজেকবাসী - ইনজেব চাঙমা

 

২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন কমান্ডো অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। ইতিহাসের সেই লাদেনের সঙ্গে সাজেকের লাদেন চাকমার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু একই নামের আড়ালে আজ সাজেকের এক সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে, যা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, মুক্তির সংগ্রামে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
গত ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার সকাল ১০টার দিকে গঙ্গারাম সুরুং নালার বাসিন্দা মৃত চন্দ্র চাকমার ছেলে লাদেন চাকমার (৩৫) ওপর সেনাবাহিনীর সদস্যদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে। সাজেক হিল (ফেসবুক আইডি) অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর সাজেক উজোবাজারে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সড়ক অবরোধ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর লাঠিচার্জে লাদেন চাকমা গুরুতর আহত হন। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে অটোরিকশায় করে দীঘিনালায় নেওয়ার পথে তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আবারও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
 
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, বাঘাইহাট জোনের এক সেনা কর্মকর্তা তাঁকে হুমকি দিয়ে বলেন, সেনাবাহিনী মারধর করেছে, এ কথা কাউকে জানালে গুলি করে হত্যা করা হবে। বরং কেউ জানতে চাইলে ইউপিডিএফ মারধর করেছে, এমনটাই বলতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে দিয়ে এ বক্তব্যের একটি ভিডিও ধারণও করা হয়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে সত্য উদ্‌ঘাটিত হয় এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।
 
চাঙমা সমাজে একটি প্রবাদ আছে, “এরা খিয়্যা বাঘ দরে ধেলে চিত খেইয়্যা বাঘ লাঘত পায়।” অর্থাৎ, এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক বড় বিপদের মুখে পড়া। আজ সাজেকবাসীর পরিস্থিতি যেন সেই প্রবাদেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
 
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অভিযোগও চোখে পড়েছে যে, অবরোধে অংশ না নিলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা ও দশটি বেত বা লাঠির আঘাতের শাস্তি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ মানুষের অধিকার; কিন্তু ভয়, জরিমানা কিংবা শারীরিক শাস্তির মাধ্যমে কাউকে অংশ নিতে বাধ্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্যদিকে, কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনীর লাঠিচার্জে আহত হওয়ার অভিযোগও সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়।
 
এখানেই আমার প্রশ্ন, যাঁরা নিজেদের জুম্ম জাতির মুক্তির সংগ্রামের অগ্রসৈনিক বলে দাবি করেন, তাঁদের কাছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কি সেই মুক্তিরই অংশ নয়?
 
ধরে নিলাম, তোমাদের উদ্দেশ্য মহৎ। জুম্ম জাতিকে বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত করাই তোমাদের শপথ। কিন্তু যে সরকার বা বাহিনীর বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ, সেই ব্যবস্থার মধ্যেই সাধারণ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে অন্য রাজনৈতিক পক্ষকে সরানোর কৌশল কতটা বাস্তবসম্মত? অবরোধের মতো কর্মসূচির পরিণতি যদি সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তা ডেকে আনে, তবে সেই কৌশলের কার্যকারিতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
 
মুক্তির নামে মানুষের কষ্ট বাড়ানো মুক্তির পথ হতে পারে না। যে আন্দোলন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে, সেই আন্দোলনকেই আগে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষকে একদিকে রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের আশঙ্কার মধ্যে রেখে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
 
তাই সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশনের বা ইউপিডিএফের প্রতি আমার আহ্বান, নিরীহ মানুষকে ভয় দেখিয়ে কর্মসূচিতে বাধ্য করবেন না। প্রয়োজনের তোমার যোগ্যতা দিয়ে তাঁদেরকে তাড়িয়ে দাও। আর নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিও আহ্বান, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়; অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।
 
মুক্তির সংগ্রাম যদি মানুষের জন্যই হয়, তবে সেই সংগ্রামে অযুক্তি দাবতে মানুষকেই কেন বারবার মূল্য দিতে হবে? সাধারণ মানুষকে এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দেওয়ার সদিচ্ছা ও সক্ষমতা যদি না থাকে, তবে অন্তত তাদের জীবনকে আরও বিপন্ন করে তুলবেন না। প্রয়োজনে সেই পথ থেকে সরে এসে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে অধিকতর দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। হাত উভো করো। 
 
কারণ, মানুষের মুক্তি মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে নয়, মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই অর্জিত হতে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা