পর্যটনের আড়ালে সাজেকের সংকট: সহিংসতা, অবরোধ, জীবিকার অনিশ্চয়তা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অপরিহার্যতা - ইনজেব চাঙমা


পাহাড়ের বুকে মেঘের ভেলা, দিগন্তজোড়া সবুজ অরণ্য, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা সাজেক। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এই জনপদ পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর। কিন্তু পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে বসবাসকারী জুম্ম জনগোষ্ঠীর জীবন যে কতটা সংগ্রামময়, তা বাইরে থেকে সব সময় বোঝা যায় না। এখানে প্রকৃতি কখনো জীবিকার আশীর্বাদ, আবার কখনো নির্মম দুর্যোগের কারণ। অন্যদিকে মানুষের সৃষ্ট বিরোধ, সহিংসতা, অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বহুবার সাধারণ মানুষের জীবনকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তার দিকে।

সাজেকের সংকট আজকের নয়। অতীতের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ২০২৫ সালের ইঁদুর বন্যায় জুমের ফসলহানি, বিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের নিরাপত্তা ও যোগাযোগসংক্রান্ত অস্থিরতা, সব মিলিয়ে এই জনপদের মানুষের জীবনসংগ্রাম দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক।

২০২৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ সাজেকের সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ১ অক্টোবর উজোবাজারে মিছিল, ১১ অক্টোবর থেকে সড়ক অবরোধ, ২৬ অক্টোবর দুই সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক, ১ নভেম্বরের পাল্টাপাল্টি অবরোধ এবং পরবর্তী সময়ে যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়, সবকিছু মিলিয়ে সাজেকের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে।

তাই সাজেককে শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়। সাজেকের প্রকৃত পরিচয় বুঝতে হলে জানতে হবে এখানকার মানুষের ইতিহাস, বেদনা, বেঁচে থাকার লড়াই এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের প্রত্যাশার কথা।

২০১০ সালের সহিংসতা: সাজেকের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়

সাজেকের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০১০ সালের ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর অধ্যায়। ওই দুই দিনে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট বাজার এলাকায় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে চাঙমাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বহু মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন এবং ৩ জন নিহত হন।

একটি বসতভিটা মানুষের কাছে কেবল মাথা গোঁজার আশ্রয় নয়; সেখানে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের স্মৃতি, পারিবারিক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সহিংসতায় যখন মানুষের ঘরবাড়ি পুড়ে যায়, তখন তারা শুধু সম্পদ হারায় না, হারায় পরিচিত পরিবেশ, নিরাপত্তাবোধ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তাও।

২০১০ সালের সেই ঘটনা তাই সাজেকের ইতিহাসে শুধু অতীতের একটি তারিখ নয়; এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ভূমি ও বসতি নিয়ে বিরোধ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তার ঘাটতি কীভাবে একটি জনপদের জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে।

২০২৫ সালের ইঁদুর বন্যা: জুমচাষির জীবিকায় বিপর্যয়

সাজেকের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জুমচাষের সম্পর্ক বহু প্রজন্মের। পাহাড়ের ঢালে জুমের ফসল শুধু কৃষকের পরিশ্রমের ফল নয়; তা পরিবারের খাদ্য, জীবিকা ও আগামী দিনের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।

কিন্তু ২০২৫ সালে ইঁদুরের ব্যাপক উপদ্রব সেই অবলম্বনকে বিপন্ন করে তোলে। শিয়ালদাই পাড়া, কাইচ্যা পাড়া, জাম পাড়া, অরুণ পাড়া, লুংঠিয়ান পাড়া ও বেটলিংসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়েন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পাড়াপ্রধানদের তথ্যের ভিত্তিতে দেড় হাজারের বেশি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশিত হয়।

এই বিপর্যয়ের অভিঘাত ছিল বহুমাত্রিক। জুমের ফসল নষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু একটি মৌসুমের কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া নয়; এর অর্থ পরিবারের খাদ্য জোগাড়, পরবর্তী চাষের ব্যয় এবং দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।

প্রকৃতির দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও সময়মতো খাদ্যসহায়তা, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ জরিপ, কৃষকদের পুনর্বাসন এবং ফসল সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতি কমানো সম্ভব।

শিক্ষা: পাহাড়ের শিশুদের অপূর্ণ স্বপ্ন

একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শিশুদের শিক্ষার মধ্য দিয়ে। অথচ সাজেকের দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিদ্যালয়ের স্বল্পতা, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর কষ্ট, শিক্ষক উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ এবং শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মতো সমস্যা এখানকার শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে আসে।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত সাজেকের প্রাথমিক শিক্ষাবিষয়ক একটি প্রতিবেদনে মাত্র আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই সময় বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ৩৭১ জন। বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী শিশুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্যে উঠে এসেছিল।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মাজলং এলাকার এগোজ্যাছড়িতে স্থানীয় জনগণের অর্থায়নে নির্মাণাধীন একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সাজেকের প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তাদের মৌলিক অধিকার।

২০২৬ সালের অক্টোবর: অবরোধের রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা

সাজেকের সাম্প্রতিক সংকট বুঝতে হলে ২০২৬ সালের অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। ১ অক্টোবর উজোবাজারে ইউপিডিএফ-সমর্থিত হিসেবে পরিচিত একটি পক্ষের মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলের সামনে ছিল সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি। স্লোগান, মাইকিং এবং প্রতিপক্ষের উদ্দেশে হুমকি-ধমকির অভিযোগও ওঠে। এই মিছিলের মধ্য দিয়ে সাজেকের বিরোধ প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির রূপ নিতে শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেয়। ১১ অক্টোবর ভোর থেকে বাঘাইহাট-সাজেক সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পর্যটকের গাড়ি আটকে পড়ে, স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতও ব্যাহত হয়।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় জেএসএসের সদস্যদের উপস্থিতি প্রত্যাহার। তাদের অভিযোগ, চিল্যাতলী, ব্রিজপাড়া, নোয়াপাড়া, মাচালং, তালখুমো ও ভুইয়োছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

১১ অক্টোবর অবরোধ চলাকালে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবি তুলে ধরেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অবরোধ ৪৮ ঘন্টার জন্য স্থগিত করা হয়।

এদিকে ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেকে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে ১৫ অক্টোবর পর্যটনকেন্দ্র পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু বিরোধের মূল বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসেনি।

দুই সংসদ সদস্যের সঙ্গে বৈঠক: পাঁচ দফা দাবিতে চারটিতে সমঝোতা, একটি প্রশ্নে অচলাবস্থা

সাজেকের চলমান সংকট নিরসনে ২৬ অক্টোবর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেদিন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেন।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের উজোবাজারে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই সংসদ সদস্যের পাশাপাশি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে আলোচনা চলে।

বৈঠকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি লিখিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২২ অক্টোবরের ঘটনায় আন্দোলনকারীদের ওপর কথিত হামলার বিচার, অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট মামলা প্রত্যাহার, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ এবং সাজেক থেকে জেএসএসের সদস্যদের প্রত্যাহারের বিষয়গুলো দাবির মধ্যে ছিল।

বৈঠক শেষে এমপিরা জানান, পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সরকারপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়, সাজেক থেকে জেএসএসের সদস্যদের প্রত্যাহার নিয়ে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সরকারপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছিল। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা পাঁচ দিনের মধ্যে জেএসএস সদস্যদের প্রত্যাহারের দাবি জানান। সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের এই মতপার্থক্যই বৈঠকের সমঝোতার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রায় আড়াই ঘণ্টার আলোচনা শেষে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয় এবং অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা আসে। 

এখানে কয়েকটি বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার। প্রথমত, দুই সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়া নিঃসন্দেহে সংকট নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু চারটি দাবিতে সমঝোতা হলেও একটি দাবিতে অচলাবস্থা থেকে যাওয়া প্রমাণ করে, সমস্যার গভীরতা কেবল প্রশাসনিক আশ্বাসে দূর করা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, জেএসএস সদস্যদের উপস্থিতি নিয়ে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তবে অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও অবস্থান এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের অভিযোগকে তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।

তৃতীয়ত, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সপ্তাহ সময় চাওয়া এবং আন্দোলনকারীদের পাঁচ দিনের মধ্যে সমাধান দাবি করার মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে কার্যকর মধ্যস্থতা দরকার ছিল। একটি জনপদের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ রেখে কোনো বিরোধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এখানে প্রশ্ন হলো, দুই সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে আলোচনা যদি এতদূর এগিয়েও চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে পরবর্তী উদ্যোগ কোথায়? জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব শুধু বৈঠকে উপস্থিত থাকা নয়; বরং আলোচনার অগ্রগতি তদারক করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে সহায়তা করা।

১ নভেম্বর: অবরোধ শিথিলের দিনেও পাল্টা কর্মসূচি

অক্টোবরের শেষ দিকে টানা অবরোধে স্থানীয় মানুষের খাদ্যসংকট ও জীবিকার সমস্যা বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ১ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরোধ শিথিল রাখার ঘোষণা দেয়। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়া।

কিন্তু ৩১ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি একই দিনে পৃথক ১২ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের অভিযোগ ছিল, সাজেকে সশস্ত্র তৎপরতা, ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা ঘটছে। এসবের প্রতিবাদেই তারা পাল্টা অবরোধের ডাক দেয়।

এর সঙ্গে পার্বত্য যানবাহন মালিক ও শ্রমিকদের যান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যুক্ত হওয়ায় এক পক্ষের অবরোধ শিথিলের ঘোষণার পরও স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ফিরে আসেনি।

এখানে প্রশ্ন উঠছে, একটি পক্ষের কর্মসূচি শিথিলের দিনেই আরেক পক্ষের পাল্টা অবরোধ কতটা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট? কোনো পক্ষের দাবির সঙ্গে দ্বিমত থাকলে প্রতিবাদের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের পদ্ধতি যদি সাধারণ মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও চলাচলের অধিকারকে বিপন্ন করে, তাহলে তার নৈতিক ও মানবিক দায়ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিতে হবে।

নভেম্বরের অবরোধ: বিপর্যস্ত কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ

নভেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অবরোধের চতুর্থ পর্যায়ে সাজেকের যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারছিলেন না, ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় পণ্য আনতে পারছিলেন না এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা কর্মহীন হয়ে পড়ছিলেন।

৩ নভেম্বর সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ বৈঠকের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। ৪ নভেম্বর থেকে কৃষিপণ্যবাহী যানবাহন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহনকে অবরোধের আওতামুক্ত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও সংবাদকর্মীদের যানবাহনও চলাচলের সুযোগ পাবে বলে জানানো হয়।

তবে পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। অর্থাৎ কিছু জরুরি চলাচলে ছাড় দেওয়া হলেও সামগ্রিক অচলাবস্থার অবসান ঘটেনি। ৪ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদে সাজেকে টানা অবরোধের কারণে খাদ্য সরবরাহ, কৃষিপণ্য পরিবহন, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাবের কথা উঠে আসে।

যে কৃষককে বাজারে যেতে হয়, যে শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়, যে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার জন্য বাইরে নিতে হয়, তাদের কাছে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু পর্যটন ব্যবসা নয়, পুরো জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। মানুষের সৃষ্ট সংকটের সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, এর অভিঘাত অনেক সময় সেই মানুষদেরই বহন করতে হয়, যারা বিরোধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন: সংকট উত্তরণের রাজনৈতিক পথ

সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ, নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রশাসনিক জটিলতা এবং জনগণের অধিকারসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান কোথায়?

আমার বিশ্বাস, এর অন্যতম প্রধান পথ হলো ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কেবল একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল নয়; এটি দীর্ঘ সংঘাতের অবসান, পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা, ভূমি সমস্যার সমাধান, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং পাহাড়ের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তি।

চুক্তিতে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতায়ন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান ছাড়া পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।

সাজেকের বর্তমান সংকটের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ভূমি ও বসতি নিয়ে বিরোধ, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ, এসব সমস্যার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক পথ শক্তিশালী হবে, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ পাবে এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে। এর ফলে রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনাও বাড়বে।

তবে শুধু চুক্তি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমন সরলীকৃত ধারণা পোষণ করি না। চুক্তির প্রতিটি ধারা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সদিচ্ছা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক আস্থা অপরিহার্য। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যেন চুক্তির লক্ষ্য ও চেতনার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আমার বিশ্বাস, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ভূমিসংক্রান্ত সংকট নিরসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। এর মাধ্যমে সাজেকসহ পুরো পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

সাজেকের উন্নয়ন মানে শুধু পর্যটনের বিকাশ নয়

সাজেকের পরিচিতি আজ দেশজুড়ে বিস্তৃত। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ দেখতে পর্যটকেরা আসেন। গড়ে উঠেছে রিসোর্ট, কটেজ, খাবারের দোকান ও পরিবহন ব্যবসা। পর্যটনকে ঘিরে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রের বিকাশ আর স্থানীয় মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ এক বিষয় নয়।

একদিকে পর্যটকেরা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, অন্যদিকে একই পাহাড়ের কোনো কৃষক ফসল হারিয়ে খাদ্যসংকটের আশঙ্কায় দিন কাটান। পর্যটনকেন্দ্রে আধুনিক আবাসন গড়ে উঠলেও দুর্গম পাড়ার শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এখন আবার রাজনৈতিক বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি অবরোধের কারণে পর্যটন ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হচ্ছে।

সাজেকের উন্নয়নকে শুধু পর্যটকের সংখ্যা, রিসোর্টের বিস্তার কিংবা ব্যবসায়িক আয়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে স্থানীয় মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার বাস্তব অবস্থা। পর্যটনের সুফল যেন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় এবং তাদের সংস্কৃতি, পরিবেশ ও অধিকার সুরক্ষিত থাকে, সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

সাজেক কোনো নির্জন পর্যটনদৃশ্য নয়; এটি মানুষের বসতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবিকার ক্ষেত্র। এই সত্যকে সামনে রেখেই উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে।

শেষ কথা: সাজেককে বাঁচাতে হলে পাহাড়ের মানুষকে বাঁচাতে হবে

সাজেকের পাহাড় এখনো সবুজ। মেঘ এখনো পাহাড়ের চূড়ায় এসে ভিড় করে। প্রকৃতি এখনো তার অপরূপ সৌন্দর্যে মানুষকে মুগ্ধ করে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে যদি থাকে ফসলহানির বেদনা, শিক্ষার অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তার উদ্বেগ, রাজনৈতিক বিরোধ এবং জীবিকার সংকট, তবে সাজেকের বাস্তবতাকে শুধু পর্যটনের গল্প দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

২০১০ সালের ১৯–২০ ফেব্রুয়ারির সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ২০২৫ সালের ইঁদুর বন্যায় জুমের ফসলহানি, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ২০২৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের অবরোধ ও পাল্টা অবরোধ, সবকিছু মিলিয়ে সাজেকের মানুষের জীবনসংগ্রাম এক গভীর মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

২৬ অক্টোবর দুই সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়েছে, পাঁচ দফা দাবির চারটি নিয়ে সমঝোতা হয়েছে, কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে অচলাবস্থা রয়ে গেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, সাজেকের সংকট নিরসনে বিচ্ছিন্ন আশ্বাস কিংবা সাময়িক সমঝোতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর সমাধান।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার: সাজেকের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে তাদের জীবনকে অবরুদ্ধ করা যায় না। নিরাপত্তা ও স্বাধীন চলাচল পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং একটি শান্তিপূর্ণ জনপদের জন্য দুটিই অপরিহার্য। সাজেকের মানুষ কারও রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের উপকরণ হতে পারে না। তাদের বসতভিটা, ভূমি, সংস্কৃতি, জীবিকা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার অধিকার কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে ছোট নয়।

আমার বিশ্বাস, পাহাড়ের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। চুক্তির প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভূমি সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান, আঞ্চলিক স্বশাসন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক পক্ষকে সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে আসতে হবে।

সাজেকের প্রয়োজন আরেকটি অবরোধ নয়; প্রয়োজন নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। পাহাড়ের মানুষের জীবনকে রাজনৈতিক বিরোধের জিম্মি করে রেখে কোনো স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।

প্রকৃতি সাজেককে সৌন্দর্য দিয়েছে। সেই সৌন্দর্যের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমাদের সবার। পাহাড়কে বাঁচাতে হলে জুম্ম জাতিকে বাঁচাতে হবে। আর পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধান তথ্যসূত্র- দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডর্ড, জাগো নিউজ, দ্যা ডেইল স্টার ও ঢাকা ট্রিবিউন। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা