কিছু
মানুষের জীবন কেবল নিজের
জন্য বয়ে চলে না।
তাঁদের জীবন যেন একটি
নদী,
নিজের পথ অতিক্রম করতে
করতে যার জল ছুঁয়ে
যায় বহু মানুষের জীবন,
বহু ঘরের উঠোন,
বহু
প্রার্থনার প্রদীপ। তাঁদের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে পাওয়া
যায় অন্যের মুখের হাসিতে,
সমাজের কল্যাণে এবং মানুষের জন্য
রেখে যাওয়া কিছু নির্মল স্মৃতিতে।
সুলোক
শশী চাকমা তেমনই একজন মানুষ। তাঁর
জীবনকে যদি একটি বাক্যে
প্রকাশ করতে হয়, তবে
বলা যায়- কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষকে ভালোবাসা এবং ধর্মের মধ্য দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে নেওয়া এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ পথচলা।
সার্টিফিকেট
অনুযায়ী সুলোক শশী চাকমার জন্ম
২৯ জুন ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে,
উদাল বাগানে। পিতা কিনাচান চাকমা
এবং মাতা রসিক মালা
চাকমা। এক ভাই ও
তিন বোনের সংসারে তিনি জ্যেষ্ঠ সন্তান।
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে শৈশব থেকেই জীবনের
অভাব-অনটন, সংগ্রাম ও বাস্তবতার সঙ্গে
তাঁর পরিচয় ঘটে।
জীবনের
সেই শুরুর দিনগুলো হয়তো তাঁকে খুব
বেশি কিছু দিতে পারেনি,
কিন্তু দিয়েছিল একটি অমূল্য শিক্ষা-
মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে হৃদয় বড় হতে হয়, সম্পদ বড় হওয়া জরুরি নয়।
আজ
তাঁর স্থায়ী ঠিকানা স্মৃতি ভাবনা পাড়া (থানা পাড়া), দীঘিনালা,
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। কর্মজীবনের পথ তাঁকে জন্মভূমি
থেকে দূরে নিয়ে গেলেও
শেকড়ের প্রতি তাঁর টান কখনো
আলগা হয়নি।
১৯৮২
সালের ৭ জুলাই, ২২
আষাঢ় ১৩৮৯ বাংলা, বুধবার
মিজ চম্পা দেবী চাকমার সঙ্গে
তাঁর বিবাহবন্ধন সম্পন্ন হয়। জীবনের দীর্ঘ
পথচলায় সহধর্মিণী হয়ে তিনি পাশে
থেকেছেন।
তাঁদের
সংসারে দুই কন্যা- মণিষী
চাকমা ও শ্যামলী চাকমা
এবং এক পুত্র- সুমন
প্রিয় চাকমা। সন্তানরা নিজ নিজ কর্মজীবনে
প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের ঘরেও এসেছে নতুন
প্রজন্ম, নাতি-নাতনিরা।
সন্তানদের
সাফল্য তাঁর কাছে কেবল
পারিবারিক আনন্দ নয়; এটি জীবনের
দীর্ঘ পরিশ্রমের এক নীরব পুরস্কার।
তাঁদের জন্য তাঁর প্রার্থনা
খুব সরল- সবাই যেন
নীরোগ থাকে, নিরাপদে থাকে, জীবনে উন্নতি লাভ করে এবং
মানুষের মতো মানুষ হয়ে
বেড়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবনে
তিনি এইচএসসি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। চাকরিতে প্রবেশের সময় তাঁর শিক্ষাগত
যোগ্যতা ছিল এসএসসি; পরবর্তীতে
এইচএসসি সম্পন্ন করে তা চাকরির
নথিতে সংযুক্ত করেন।
স্বাস্থ্য
বিভাগে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা।
পরে পদোন্নতি পেয়ে সহস্বাস্থ্য পরিদর্শক
হন। এভাবেই মানুষের সেবার সঙ্গে তাঁর জীবনের দীর্ঘ
অধ্যায় যুক্ত হয়ে যায়।
সময়কে
সংখ্যায় প্রকাশ করা যায়, কিন্তু
দায়িত্বের ভার, মানুষের প্রতি
দায়বদ্ধতা আর কর্মজীবনের স্মৃতিকে
সংখ্যায় মাপা যায় না।
দীর্ঘ এই কর্মজীবনের শেষে
৩০ জুন ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে
তিনি সসম্মানে অবসর গ্রহণ করেন।
চাকরি
তাঁর কাছে শুধু জীবিকা
ছিল না; মানুষের কাছে
পৌঁছানোর একটি সুযোগও ছিল।
কর্মস্থল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, কিন্তু মানুষের জন্য কিছু করার
তাগিদ বদলায়নি।
মানুষের
জীবনে কিছু অভাব থাকে,
যার নাম দেওয়া যায়
না। সুলোক শশী চাকমার জীবনে
তেমনই একটি অভাব ছিল—বিহারের অভাব।
স্মৃতি
ভাবনা পাড়ায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। চাকমা, হিন্দু, বড়ুয়া, মুসলমান, ত্রিপুরা—বৈচিত্র্যের এই বসতিতে মানুষের
মধ্যে সহাবস্থান থাকলেও ছিল না একটি
বৌদ্ধবিহার। বিহারহীন সেই পরিবেশ তাঁকে
যেন ভেতর থেকে অস্থির
করে তুলত।
তাঁর
মনে হতো, মানুষের বসতির
মধ্যে একটি ধর্মীয় আশ্রয়
থাকা দরকার—যেখানে সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসবে ধর্মদেশনার
শব্দ, যেখানে মানুষ কিছু সময়ের জন্য
জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে
নিজের অন্তরের সঙ্গে কথা বলতে পারবে।
এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তাঁর
এক দীর্ঘ স্বপ্নের যাত্রা।
এলাকার
বয়োজ্যেষ্ঠ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় স্মৃতিমোহন
(ঠাগুজ্যে) চাকমার কাছে একদিন বিহার
প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উত্থাপন
করেন। স্মৃতিমোহন চাকমা বিষয়টি হৃদয়ে ধারণ করলেন। পরদিন
নিজের সন্তান, কন্যা ও উপযুক্ত নাতিদের
নিয়ে ঘরোয়া পরামর্শ সভা ডাকলেন। সেখানে
তিনি নিজের কষ্টার্জিত জায়গার একটি অংশ ধর্মীয়
কাজে দান করার মহৎ
সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
একজন
মানুষের জীবনে জমি হয়তো সম্পদ;
কিন্তু কোনো কোনো মানুষের
কাছে সেই সম্পদ হয়ে
ওঠে পরমার্থের সেতু। স্মৃতিমোহন চাকমার সেই দান ছিল
তেমনই এক সেতু- এই
পৃথিবীর মাটির সঙ্গে মানুষের পরপারের পুণ্যকামনার এক অদৃশ্য যোগসূত্র।
পরিবারের সদস্যরাও তাঁর মহৎ সিদ্ধান্তে
সম্মতি দেন। সুলোক শশী
চাকমার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা যেন সেদিন বাস্তবের
প্রথম আলো দেখতে পেল।
আলোচনা
থেকে সিদ্ধান্ত, আর সিদ্ধান্ত থেকে
বাস্তবায়ন- সবকিছু যেন দ্রুত এগিয়ে
চলল। ১৯৯০ সালের ১৪
মার্চ, বুধবার স্মৃতি ভাবনা বৌদ্ধবিহারের শুভ আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ
করে। বিহারের নামকরণ করেন পূজনীয় সাধন
মিত্র ভিক্ষু- যিনি সবার কাছে
‘গোপাল ভান্তে’ নামে পরিচিত ছিলেন।
প্রথম পরিচালনা কাঠামোয় সভাপতি নির্বাচিত হন রুচা সেন
কার্বারী, সাধারণ সম্পাদক সুলোক শশী চাকমা এবং
কোষাধ্যক্ষ অশ্বিনী কুমার দেওয়ান।
বিহার
প্রতিষ্ঠার সেই দিনগুলো ছিল
শ্রম, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের দিন।
অর্থের চেয়ে মানুষের ইচ্ছাই
ছিল বড়। একজন দিলেন
বাঁশ, কেউ দিলেন কাঠ,
কেউ শ্রম, কেউ সময়; আর
কেউ দিলেন নিজের হৃদয়ের বিশ্বাস। এইভাবেই একটি বিহার শুধু
ইট-কাঠ-বাঁশের স্থাপনা
হয়ে ওঠেনি—এটি হয়ে উঠেছিল
বহু মানুষের সম্মিলিত পুণ্যকর্মের প্রতীক।
সেই
সময় এক প্রবীণ ভিক্ষুর
আগমন যেন এই গল্পে
এক অলৌকিক অধ্যায় যোগ করে। কোনো
আনুষ্ঠানিক আহ্বান ছাড়াই পূজনীয় সাধন মিত্র ভিক্ষু
সেখানে এসে অবস্থান নেন।
পরে তিনি নিজেই জানান,
বিনা আহ্বানে কোনো ভিক্ষুর কোনো
স্থানে অবস্থান করা ভিক্ষুসংঘের বিনয়ের
সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু তাঁদের
ক্ষেত্রে ঘটনাটি যেন অন্য কোনো
অদৃশ্য নিয়তির ইশারা হয়ে এসেছিল।
সুলোক
শশী চাকমার ভাষায়, সেই ভান্তের আগমন
ছিল তাঁদের জন্য ‘মণিকাঞ্চন যোগ’। গোপাল
ভান্তে ছিলেন শীলচর্চায় কঠোর ও ধর্মীয়
অনুশাসনে যত্নশীল। এলাকার দায়ক-দায়িকাদের শীল
পালনে উৎসাহিত করতেন। বিহারের প্রতি তাঁর ছিল গভীর
মমতা। আজ তিনি নেই।
সময়ের স্রোত তাঁকে দূরে নিয়ে গেছে।
কিন্তু তাঁর স্মৃতি রয়ে
গেছে বিহারের প্রার্থনায়, মানুষের শ্রদ্ধায় এবং সুলোক শশী
চাকমার হৃদয়ের গভীরে।
১৯৯১
সালের ২৬ জুলাই, শুক্রবার।
এক সভায় বিহার অধ্যক্ষ
সাধন মিত্র ভিক্ষু, মহাদাতা স্মৃতিমোহন চাকমা, পরিচালনা কমিটির সভাপতি রুচা সেন কার্বারী
এবং উপস্থিত দায়ক-দায়িকাদের সর্বসম্মতিক্রমে
সুলোক শশী চাকমাকে ‘বিহার প্রতিষ্ঠাতা’
হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেদিনের সেই
স্বীকৃতি তাঁর কাছে কোনো
পদমর্যাদা নয়; বরং একটি
দায়িত্ব।
সময়ের
সঙ্গে পদবীটি তাঁর নামের পাশে
থেকে গেছে। কিন্তু তিনি আজও মনে
করেন, এই সম্মান তাঁর
একার নয়। এর পেছনে
রয়েছে মহাদাতার দান, ভিক্ষুসংঘের আশীর্বাদ,
স্থানীয় মানুষের শ্রম এবং অসংখ্য
দায়ক-দায়িকার ভালোবাসা।
জীবনের
গল্প এখানেই শেষ হয়নি। চাকরির
প্রয়োজনে সহস্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে লক্ষ্মীছড়িতে পোস্টিং হলে তাঁর চোখে
আবার ধরা পড়ল সেই
পুরোনো শূন্যতা, বৌদ্ধবিহারের অভাব। স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার, হেডম্যান, কার্বারী, শিক্ষিত ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের
সঙ্গে দেখা হলেই তিনি
বিহার প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। একসময়
সংসদ সদস্য কল্প রঞ্জন চাকমার
কাছে আবেদন করা হলো। আবেদনের
বিষয় ছিল, এলাকায় একটি
কেন্দ্রীয় বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া
হলো। পাওয়া গেল ২০ হাজার
টাকা।
টাকা
হয়তো একটি বড় স্থাপনা
নির্মাণের জন্য যথেষ্ট ছিল
না। কিন্তু মানুষের ইচ্ছাশক্তির মূল্য কি টাকায় মাপা
যায়?
তারপর
শুরু হলো স্বেচ্ছাশ্রম। কে
বাঁশ দেবেন? কে কাঠ দেবেন?
কে ডগা দেবেন? কে
মাটি কাটবেন? কে প্রতিদিন শ্রম
দেবেন? প্রশ্নগুলো উঠল, আর একে
একে তার উত্তরও পাওয়া
গেল। মানুষ এগিয়ে এল। শ্রম দিল।
সময় দিল। ভালোবাসা দিল।
এভাবেই গড়ে উঠল বিহার।
সন্ধ্যা
নামলে সেখানে ধর্মদেশনা হতো। কর্মচারীরা কাজ
শেষে ধর্মীয় আলোচনা শুনতে সমবেত হতেন। অল্প আলোয়, দিনের
ক্লান্তি পেরিয়ে, ধর্মের কথাগুলো যেন মানুষের মনে
অন্য এক শান্তির দরজা
খুলে দিত।
আজও
সেই বিহার কেন্দ্রীয় বিহার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই কুশীনগর
বনবিহার- যেখানে ভিক্ষুসংঘের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে মানুষ পুণ্যসঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
ধর্মীয়
আয়োজন ছিল তাঁর জীবনের
আরেকটি বড় অধ্যায়। স্থানীয়
মুরুব্বিদের সম্মতি নিয়ে সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ
উপলক্ষে সারারাতব্যাপী বুদ্ধকীর্তনের আয়োজন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বহু ভান্তের
সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাঁদের ধর্মদেশনা ও উপদেশ থেকে
অর্জন করেছেন ধর্মজ্ঞান। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫
সাল পর্যন্ত ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততার
সময়টি আজ তাঁর স্মৃতির
পাতায় এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
সেই
সময়ের মানুষের ভালোবাসা তাঁর কাছে আজও
অমূল্য। তিনি মনে করেন,
তিনি তাঁদের জন্য যতটুকু করেছেন,
তার চেয়ে বহুগুণ বেশি
পেয়েছেন তাঁদের কাছ থেকে- স্নেহ,
বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আপন করে
নেওয়ার উষ্ণতা।
মানুষ
যখন জীবনের এক অধ্যায় শেষ
করতে যায়, তখন বাইরের
মানুষের চেয়ে নিজের ভেতরের
মানুষের সঙ্গে তার কথোপকথনই বেশি
জরুরি হয়ে ওঠে। অবসরের
আগে সুলোক শশী চাকমাও বহুবার
নিজেকে প্রশ্ন করেছেন- “সুলোক শশী, এরপর কী করবে?”
নিজের
কাছে তিনি প্রার্থনা করেছেন—এমন একটি পথ
যেন বেছে নিতে পারেন,
যে পথে তাঁর নিজের
দুঃখ না আসে, অন্যেরও
দুঃখ না হয়; মানুষের
কল্যাণ হয় এবং নিজেরও
কল্যাণ সাধিত হয়।
এই
আত্মজিজ্ঞাসা তাঁকে ধর্ম ও সমাজসেবার
আরও কাছে নিয়ে আসে।
তিনি অস্থায়ী শ্রমণ হওয়ার কথা ভাবেন, সুযোগ
পেলে অষ্টশীল গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করেন। তাঁর
ভাবনার কেন্দ্রে ছিল একটি নির্মল
আকাঙ্ক্ষা—নিরাপদ জীবন, সুস্বাস্থ্য, সম্মানজনক জীবনযাপন এবং কারও ক্ষতির
কারণ না হওয়া।
চাকমা
সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের
সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার আরেকটি
উল্লেখযোগ্য দিক হলো চাকমা
সম্প্রদায়ের বিবাহ অনুষ্ঠান- চুঙলং/জধন পরিচালনা করা। এপর্যন্ত
তাঁর হাতে ১৪২ জোড়া বিবাহ সম্পন্ন
হয়। এই ব্যতিক্রমী সামাজিক
উদ্যোগ বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলের
দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
গণমাধ্যমে
প্রচারের ফলে তাঁর কাজ
আরও বিস্তৃত মানুষের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু
তিনি এই পরিচিতিকেও নিজের
কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন না। বরং দর্শক,
শুভাকাঙ্ক্ষী, সাংবাদিক ও সহযোগীদের প্রতি
কৃতজ্ঞতা জানান। কারণ তিনি জানেন-
একজন মানুষের কাজ তখনই পূর্ণতা
পায়, যখন সমাজ তাকে
গ্রহণ করে।
জীবনের
নানা কর্মব্যস্ততার মাঝেও তাঁর অন্তরে সাহিত্যবোধের
একটি নীরব প্রদীপ জ্বলেছে।
নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত
যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পুগবেল’-এ তাঁর ১০টি
কবিতা স্থান পেয়েছে। এছাড়া ‘তট্টে মুই’ নামে তাঁর একটি
বইও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি চাঙমা সাহিত্য
একাডেমির একজন সক্রিয় সদস্য।
সাহিত্য তাঁর কাছে শুধু
শব্দের বিন্যাস নয়; বরং নিজের
সমাজ, সংস্কৃতি, অনুভূতি ও জীবনকে ধরে
রাখার একটি মাধ্যম।
একদিকে
ধর্মের প্রতি তাঁর অনুরাগ, অন্যদিকে
সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি
দায়বদ্ধতা—এই দুইয়ের মাঝখানে
সাহিত্য যেন তাঁর মনের
আরেকটি জানালা।
সুলোক
শশী চাকমার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে
দেখা যায়- এখানে বড়
হওয়ার কোনো অহংকার নেই;
আছে মানুষের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠার
চেষ্টা।
একজন
স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে দীর্ঘ ৩৭ বছর ৫
মাস ১৩ দিনের কর্মজীবন।
একজন পরিবারের মানুষ হিসেবে দীর্ঘ সংসারজীবন। একজন ধর্মানুরাগী হিসেবে
বিহার প্রতিষ্ঠার সাধনা। একজন সমাজকর্মী হিসেবে
মানুষের পাশে থাকার প্রয়াস।
একজন সংস্কৃতিপ্রেমী হিসেবে চাকমা সমাজের ঐতিহ্য রক্ষার আকাঙ্ক্ষা। আর একজন সাহিত্যপ্রেমী
হিসেবে শব্দের ভেতর নিজের সময়কে
ধরে রাখার চেষ্টা। এই সবকিছু মিলিয়ে
তাঁর জীবন যেন পাহাড়ি
ঝরনার মতো- ছোট ছোট
স্রোত মিলিয়ে যার জল একসময়
নদী হয়ে ওঠে।
তিনি
হয়তো ইতিহাসের বিশাল মঞ্চের কোনো আলোচিত চরিত্র
নন। কিন্তু একটি পাড়ার মানুষের
স্মৃতিতে, একটি বিহারের প্রার্থনায়,
একটি পরিবারের ভালোবাসায়, একটি সমাজের সাংস্কৃতিক
চর্চায় এবং কয়েকটি কবিতার
পাতায় তিনি নিজের জন্য
যে জায়গাটি নির্মাণ করেছেন- সেটিই তাঁর জীবনের প্রকৃত
অর্জন। তাঁর প্রার্থনা তাই
খুব বড় কিছু নয়—
“আমি যতদিন বেঁচে থাকি, ততদিন যেন নিষ্পাপ মনে মানুষের উপকার করতে পারি। আমার পরিবার, স্বজন ও সমাজের সকল মানুষ যেন নীরোগ, নিরাপদ ও সুখে থাকে। ধর্ম, সত্য ও কল্যাণের পথে যেন জীবন কাটাতে পারি।”
একজন
মানুষের জীবনের শেষ প্রার্থনা যদি
মানুষের মঙ্গল হয়ে থাকে, তবে
তার জীবনকে নিছক ব্যক্তিজীবন বলা
যায় না।
সুলোক
শশী চাকমার জীবন তাই এক
মানুষের গল্প হয়েও বহু
মানুষের গল্প- মাটি, মানুষ, ধর্ম ও ভালোবাসায় নির্মিত এক নীরব অথচ দীপ্ত জীবনকথা।