পোস্টগুলি

সাজেকে বুক চিরে অবরোধ: একটি অধিকার প্রতিষ্ঠা যুদ্ধের দিনলিপি - ইনজেব চাঙমা

ছবি
পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের কথা উঠলেই অনেকে এর জন্য ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে দায়ী করেন। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিভাজনের শিকড় চুক্তির আগের রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বিশেষ করে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও রাজনৈতিক কৌশলগত দ্বন্দ্বের মধ্যেও বিস্তৃত। ফলে জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক বিভাজনকে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ফল হিসেবে দেখলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো আড়ালে থেকে যায়। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর শান্তিবাহিনীর সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই মধ্যে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ি গণপরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের একটি অংশ পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সামনে রেখে ১৯৯৮ সালে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠন করে। অন্যদিকে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবেই জুম্ম রাজনীতিতে দুটি পৃথক রাজনৈতিক ধারার বিকাশ ঘটে। চুক্তির পর অস্ত্র জমা দিয়ে যখন শান্তি বা...

সাজেকের রাজনীতি: জনগণের মুক্তি, নাকি দলীয় আধিপত্য? - ইনজেব চাঙমা

ছবি
পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফের রাজনীতি দেখে আমি লজ্জিত ও হতাশ। যে রাজনীতি জুম্ম জনগণের অধিকার ও মুক্তির স্বপ্ন দেখায়, সেই রাজনীতিই যদি মানুষকে বিভক্ত করে, প্রতিপক্ষকে বিতাড়িত করতে চায় এবং কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে সেই রাজনীতির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আজ ১১ অক্টোবর সাজেকে সড়ক অবরোধ ( সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির ডাকা  অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু), মিছিল কিংবা সমাবেশে অংশগ্রহণ না করলে ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে, এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা উদ্বেগজনক। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জনগণকেই যদি জরিমানার ভয় দেখানো হয়, তবে সেই আন্দোলনে মানুষের স্বাধীনতার মূল্য কোথায়? অবরোধের উদ্দেশ্য যদি জেএসএসকে সাজেক থেকে বিতাড়িত করা হয়, তবে প্রশ্ন জাগে, এক দলকে সরিয়ে দিয়ে কি জুম্ম জনগণের মুক্তি আসবে? এর আগে এগত্তর পন্থীদের পক্ষ থেকেও নিজ নিজ এলাকা থেকে সংগ্রাম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ দের যুগের পরও এই বিভক্ত রাজনীতি জুম্ম জনগণের ভাগ্য কতটা বদলাতে পেরেছে? বরং দলীয় বিরোধের মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।...

ক্ষতবিক্ষত পাহাড়ের বুকে সাজেক: এক আর্তনাদের নাম - ইনজেব চাঙমা

ছবি
সাজেক,  শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেঘের সমুদ্র, পাহাড়ের ঢেউ। পর্যটকের চোখে সে রাঙামাটির ছাদ, মেঘের উপত্যকা। কিন্তু যে মানুষটা সাজেকের বাঁশের মজা ঘরে রাত কাটায়, তার কাছে সাজেক কোনো ভ্রমণের গল্প নয়, সাজেক হলো শেষ আশ্রয়ের নাম। মানচিত্রে সাজেক রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার ৩৬ নং ইউনিয়ন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন, ৭০২ বর্গমাইল জুড়ে তার বিস্তার। উত্তরে ত্রিপুরা, পূর্বে মিজোরাম- দুই আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাঁটাতারে ঘেরা এক জনপদ। পশ্চিমে দীঘিনালা, দক্ষিণে লংগদু। এই উপত্যকার বুকে তিনটি পাড়া রুইলুই, হামারি আর কংলাক। রুইলুই জেগে আছে ১৭২০ ফুট উঁচুতে, ১৮৮৫ সাল থেকে। আর কংলাক - ১৮০০ ফুট উঁচুতে, আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে। এখানে আদিকাল থেকে বাস লুসাই, পাংখোয়া, ত্রিপুরা আর চাকমাদের। ২০২২ সালের গণনায় ৩১,৩৮৫ জন মানুষ। প্রতিটি মানুষেরই একটা দেশত্যাগের গল্প আছে। কেউ এসেছে দীঘিনালার পোড়া ভিটা থেকে, কেউ রাঙামাটির উচ্ছেদ হওয়া গ্রাম থেকে, কেউ বান্দরবানের গহীন থেকে। দুমুঠো ভাত আর একটু নিরাপদ ঘুমের খোঁজে তারা একদিন সাজেকের ঢালে বাঁশের ঘর তুলেছিল।  পাহাড় কখনো শান্ত থাকে না। পার...

শিশু অধিকার দিবসের গুরুত্ব কোথায়? - ইনজেব চাঙমা

ছবি
ছবি: বিডিনিউজ .২৪ শিশু অধিকার দিবস আসে প্রতি বছর। মঞ্চে উচ্চারিত হয় শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুন্দর ভবিষ্যতের কথা। শিশুর হাসিমুখে সাজানো হয় নানা আয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে আমরা অঙ্গীকার করি, প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়-   শিশুর নিজের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অধিকারটি কোথায়? প্রশ্নটি মনে এলো খাগড়াছড়ির কয়েকজন শিশুকে দেখে। আজ (৬ অক্টোবর ২০২৬) শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ির শিশুরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। পাহাড়ের একটি জেলার শিশু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছে, নিশ্চয়ই এটি আনন্দের এবং আশাব্যঞ্জক ঘটনা তবে সেই আনন্দের ছবির ভেতরেই আমার চোখে পড়ল আরেকটি অনুচ্চারিত প্রশ্ন। শিশুরা কথা বলছিল বাংলায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলায় কথা বলা স্বাভাবিক। কিন্তু যে শিশুর মাতৃভাষা চাঙমা, তার নিজের ভাষার পরিচয়টি কোথায়? সে কি জানে, তার ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে? সে কি জানে, সেই ভাষার ভেতরে তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি,...

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত কীভাবে শুরু হল- ইনজেব চাঙমা

ছবি
গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম , “ জুম্মদের দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ : বিভেদের শেকড় কোথায় ?” তখন প্রশ্নটি তুলেছিলাম , কিন্তু প্রশ্নের গভীরে যাওয়া হয়নি। আজ সেই শেকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর চেষ্টা করছি-  এ ফিরে দেখা কোনো পক্ষকে একতরফাভাবে অভিযুক্ত করা কিংবা কোনো পক্ষকে নির্দোষ প্রমাণ করার প্রয়াস নয়। বরং একটি দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাসের বাঁকগুলো সামনে আনার চেষ্টা , যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে , কীভাবে একই স্বপ্ন , একই জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ও একই অধিকারবোধে উদ্বুদ্ধ মানুষ একসময় পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠল। প্রায় তিন দশকের এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত জুম্ম সমাজকে কী দিয়েছে , আর কী কেড়ে নিয়েছে , তার পূর্ণ হিসাব হয়তো এখনো হয়নি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট : একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। মানুষ হারিয়ে গেলে কোনো রাজনৈতিক অর্জনই শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না। পাহাড়ের এই যুদ্ধ একদিনে ভাইয়ে - ভাইয়ে যুদ্ধ হয়ে ওঠেনি। যুদ্ধের আগে এসেছিল মতভেদ , মতভেদের আগে তর্ক , তর্কে...