মিঙিনি নদীর তীরে এক রক্তাক্ত ইতিহাস - ইনজেব চাঙমা

এই তো সেদিন। চৌদ্দই অক্টোবর। মিঙিনি নদীর কূলে শরতের সিক্ত বাতাসে জ্বলে উঠেছিল চিতার লেলিহান শিখা। সেই আগুনে ধীরে ধীরে ভস্মীভূত হয়েছিল এক নিরন্ন, নিরীহ মানুষের দেহ। আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। সারা বেলা ঝরেছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। প্রকৃতি যেন নিজেও সেদিন শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। তবু নিভে যায়নি চিতার আগুন। কারণ, সে আগুন কেবল কাঠের স্তূপে জ্বলেনি; জ্বলে উঠেছিল মানুষের বুকে, শোকাতুর জনতার হৃদয়ে, অধিকারবঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।

যাঁর দেহ সেদিন মিঙিনি নদীর তীরে আগুনের লেলিহান শিখায় ছাই হয়ে গিয়েছিল, তাঁর নাম শহীদ ভরদাস মনি চাঙমা। বয়স ষাট বছর। পিতা প্রয়াত কুমুদ্যা চাকমা। নিবাস বানছড়া, ৫১ নং দিঘীনালা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।

তিনি কোনো যুদ্ধজয়ী সেনাপতি ছিলেন না, ছিলেন না অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা কোনো যোদ্ধা। তিনি ছিলেন পাহাড়ের মাটিতে শিকড় গেড়ে বেঁচে থাকা এক সাধারণ মানুষ, একজন জুম্ম কৃষক। জুমের ধান, বনের আলু আর নাতি-নাতনিদের মুখের হাসিতেই ছিল তাঁর জীবনের সুখ। মাটির সঙ্গে ছিল তাঁর নাড়ির সম্পর্ক; ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলানো আর পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াই ছিল তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রাম।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ডাকে, নিজের ন্যায্য অধিকারের কথা শুনতে, গণসমাবেশে যোগ দিতে তিনি এসেছিলেন মিঙিনি নদীর তীরে। হয়তো তাঁর মনে ছিল না কোনো রাজনৈতিক হিসাব, ছিল না ক্ষমতার কোনো আকাঙ্ক্ষা। ছিল কেবল মানুষের মতো বাঁচার স্বপ্ন, নিজের অধিকারের কথা জানার প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার পথ ধরে তাঁকে ফিরতে হলো নিথর দেহ হয়ে।

একজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো একটি জনপদের ইতিহাসে অসাধারণ তাৎপর্য বহন করে। ভরদাস মনি চাঙমার মৃত্যুও তেমনই এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। তাঁর রক্তাক্ত পরিণতি জুম্মদের মনে শোক, ক্ষোভ ও অধিকারসচেতনতার যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি। বরং সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য শহীদ মিনার, যার ভিত্তি মানুষের অশ্রু, আর যার শিখরে জ্বলছে ন্যায় ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা।

ইতিহাস কখনো শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। প্রতিটি বড় ঘটনার পেছনে থাকে কিছু দৃশ্যমান প্রস্তুতি, কিছু অদৃশ্য তৎপরতা, কিছু সিদ্ধান্ত এবং কিছু মানুষের ভূমিকা। ১৯৯২ সালের ১৩ অক্টোবর দিঘীনালায় ঘটে যাওয়া রক্তাক্ত ঘটনাপ্রবাহের পেছনেও এমনই এক প্রস্তুতি ছিল। এই সময় দিঘীনালা সেনানিবাসে স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলো ছিল পৃথক, পরিবেশ ছিল নিভৃত; কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পূর্বনির্ধারিত গণসমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করা। তখনকার অভিযোগে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁরা হলেন- ১. লেঃ কর্নেল ফরিদ (জোন কমান্ডার, দিঘীনালা জোন), ২. মেজর হায়দার (সেকেন্ড ইন কমান্ড), ৩. জনাব আব্দুল হাই (সেকেন্ড অফিসার (এস.ও.), দিঘীনালা থানা), ৪. জনাব জাফর আহমেদ (সভাপতি, বিএনপি, দিঘীনালা শাখা), ৫. জনাব মাসুদ রানা (সাধারণ সম্পাদক, বিএনপি ও শাপলা স্টুডিওর স্বত্বাধিকারী),  ৬. জনাব মো. ইলিয়াস চৌধুরী (সভাপতি, ছাত্রলীগ, দিঘীনালা),  ৭. জনাব জাহাঙ্গীর আলম (বার্তাবাহক, পাক্ষিক মাইনী),  ৮. জনাব সোনা মিয়া (চেয়ারম্যান, ১ নং মেরুং ইউনিয়ন পরিষদ), ৯. শ্রী তরুণ বিশ্বাস ও শ্রী খনি রঞ্জন ত্রিপুরা (সহযোগী চক্রের সদস্য)।  এই তৎপরতার মধ্য দিয়ে ‘একক বাংলা ত্রিপুরা গণ-পরিষদ’ নামে একটি সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে।  

১২ অক্টোবর বিএনপির পক্ষ থেকে আকস্মিকভাবে ১৩ অক্টোবর হরতাল আহ্বান করা হয় এবং মিছিল বের করা হয়। চারদিকে তখন অনিশ্চয়তার ছায়া। সাধারণ মানুষের মনে জমতে থাকে আশঙ্কা। পরদিন কী ঘটতে চলেছে, তা হয়তো কেউই সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। কিন্তু দিঘীনালার আকাশে যে অশান্তির কালো মেঘ জমছিল, তার পূর্বাভাস ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।

১৩ অক্টোবর সকাল। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। শরতের বৃষ্টি কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো থেমে থেমে ঝরছে।দিঘীনালা থানা বাজারের হাটবার হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আনাগোনা থাকার কথা। কিন্তু সেদিন বাজারের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়েছিল। জনপদজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা।

সেদিন সকাল থেকেই ফেরিঘাট বন্ধ রাখা হয়। মিঙিনি নদীর পূর্ব পাড়ে প্রায় তিন হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু আটকা পড়েন। বাবুছড়া থেকে থানা বাজারে আসার পথে বিভিন্ন সেনা চেকপোস্টে জুম্ম আদিবাসীদের আটকে দেওয়া হয়। মাঠে কাজ করতে যাওয়া বাঙালিদের কাজ বন্ধ রেখে লাঠিসোঁটা হাতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। বাসচালকদের হুমকি দিয়ে যানবাহন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়।

ভাঙা বিল্ডিং এলাকার সেনা চেকপোস্টের কাছে বিপুলসংখ্যক বাঙ্গালি দা, খন্তা, বল্লম, লাঠি ও সাইকেলের চেইন নিয়ে অবস্থান করছিলেন। পরিস্থিতি ক্রমেই বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠছিল। খবর পেয়ে সুপ্রিয় চাঙমা (সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, দিঘীনালা শাখা) ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ছুটে যান থানায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে আগত অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) এবং বিশেষ পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।

এএসপি দ্রুত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও থানা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (টিএনও) ঘটনাস্থলে পাঠান। টিএনও উত্তেজিত জনতার সামনে গিয়ে হাতজোড় করে বোঝানোর চেষ্টা করেন, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কোনো শান্তিবাহিনী নয়; তারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি সমাবেশ করতে এসেছে। অতএব, তাদের শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে দেওয়া উচিত।  মেজর হায়দারও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন। এতে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু সে শান্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী।

সমাবেশে যোগ দিতে আসা পাহাড়িদের একটি মিছিল মিঙিনি সেতু অতিক্রম করামাত্র রাস্তা আটকে দেওয়া হয়। অন্যদিকে জাকির আহমেদ, ফটোগ্রাফার তরুণ, ইলিয়াসসহ কয়েকজন বাঙালি নেতা পাহাড়িদের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লেঃ কর্নেল ফরিদ আক্রমণের ঠিক আগে চোখের ইশারায় মেজর হায়দারকে অন্যত্র সরে যাওয়ার সংকেত দেন। তারপরই বেজে ওঠে একটি হুইসেল।

একটি তীক্ষ্ণ শব্দ বিদীর্ণ করে দেয় চারপাশের নিস্তব্ধতা। সেনা পোস্টের দিক থেকে ভেসে আসা সেই হুইসেলের পরপরই শুরু হয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল হয়ে ওঠে পরিবেশ। ‘মারো, ধরো’ ধ্বনিতে একদল বাঙ্গালিরা জুম্মদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

প্রথমে জুম্মরা নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন টিএনও পুলিশের সদস্যদের ফাঁকা গুলি ছোড়ার নির্দেশ দেন। পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ার পর গুলির শব্দে মানুষ দিগ্‌বিদিক ছুটতে শুরু করেন। আর সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই হামলা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

মাত্র বিশ মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। যারা কিছুক্ষণ আগেও নিজেদের অধিকারের কথা বলতে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকে তখন আহত অবস্থায় ধানখেতে পড়ে ছিলেন। কারও শরীরে ক্ষত, কারও চোখে আতঙ্ক, কারও কণ্ঠে আর্তনাদ। সেই দৃশ্য যেন মুহূর্তের মধ্যে দিঘীনালার পরিচিত জনপদকে বদলে দিয়েছিল এক বেদনাবিধুর প্রান্তরে। আহতের সংখ্যা ৪০। রাত গভীর হলে আরও একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, একজন আর বেঁচে নেই। তিনি ভরদাস মনি চাঙমা।

একটি পরিবারের আশ্রয়, একজন স্ত্রীর জীবনসঙ্গী, নাতি-নাতনিদের প্রিয় মানুষ, সব পরিচয় ছাপিয়ে সেদিন তাঁর নাম জড়িয়ে গেল এক রক্তাক্ত ইতিহাসের সঙ্গে।

দিঘীনালার সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহ শুধু থানা বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই দিনে দিঘীনালা-খাগড়াছড়ি সড়কের জামতলীও আরেকটি সংঘাতের ঘটনা ঘটে । খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে পাঁচ শতাধিক পাহাড়ি ছাত্রছাত্রী পদযাত্রা করে দিঘীনালার দিকে আসছিলেন।  কিন্তু জামতলার আনসার চেকপোস্টের সামনে পৌঁছানোর পর তাঁরা বাধার মুখে পড়েন। সেখানে আগে থেকেই ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। গাড়ি পৌঁছানোর পর গাড়ির কাচ ভাঙা হয় এবং ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলে আনসার বাহিনীর সদস্যরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন।

এদৃশ্যের বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সংঘাতের অল্পক্ষণ পরেই ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ডজনখানেক মানুষ ‘একক বাংলা ত্রিপুরা গণ-পরিষদ’-এর ব্যানার নিয়ে মিছিল করে থানার দিকে এগিয়ে আসেন। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন মেজর হায়দার। অন্যদিকে কয়েকজন ফটোগ্রাফার মিছিলের ছবি তুলছিলেন। মিছিল শেষে ভাঙা বিল্ডিং এলাকার চেকপোস্টে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে বিতরণ করা হয়।

এখানে মনে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। সংঘাতের পরপরই এমন মিছিল কেন? অর্থ বিতরণের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল? ঘটনাগুলোর অন্তরালে কী ধরনের সম্পর্ক কাজ করেছিল? প্র

১৩ অক্টোবর গভীর রাত। দিঘীনালা সেনানিবাসের সিএমএইচ, কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল থেকে জলপাই রঙের একটি পিকআপে করে ভরদাস মনি চাকমার মৃতদেহ থানায় আনা হয়। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে মিঙিনি নদীর তীরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

মিঙিনি নদী তখনও বয়ে চলেছে তার চিরচেনা গতিতে। নদীর জল থেমে থাকেনি, আকাশের মেঘও চিরস্থায়ী হয়নি। কিন্তু নদীর তীরে সেদিন যে শোকের জন্ম হয়েছিল, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। একটি সাধারণ মানুষের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো অনেকেই অনুভব করেছিলেন, মানুষের জীবন কত অসহায়, আর ইতিহাসের নির্মম পরিহাস কত গভীর হতে পারে! যিনি সারাজীবন মাটির বুকে বীজ বুনেছেন, যিনি ফসলের আশায় আকাশের দিকে তাকিয়েছেন, সেই মানুষটির নিজের জীবনের প্রদীপই নিভে গেল এক অনিশ্চিত সংঘাতের অন্ধকারে।

সেদিনের আহতদের তালিকায় ছিলেন নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও প্রবীণ মানুষ। এদের মধ্যে  উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন, শ্রীমতি চিত্রালতা চাকমা, স্বামী লারে চন্দ্র, পাবলাখালী। বীরেন্দ্র চাকমা (৬৮), পাবলাখালী, যিনি লাঠিতে ভর দিয়ে চলতেন। শিশু পুণ্যস্মৃতি চাকমা (১২) ও সুকৃতি চাকমা (৮), রাঙাপানিছড়ার দুই ভাই, যাঁরা বইখাতা ফেলে সমাবেশ দেখতে এসেছিল। কিশোরী চম্পা চাকমা (১৪), চন্দা চাকমা (১৫) ও সেফালি চাকমা (১৪)। বৃদ্ধা চিত্রাঙ্গদা চাকমা (৮০), স্বামী লারুচন্দ্র, পাবলাখালী (যাঁর চোখে তখনও ছানি ছিল)। সূর্য মোহন চাকমা (৭৫), যামিনী কুমার চাকমা (৬৬), মোহন্যা চাকমা (৮৫)।

তাঁদের প্রত্যেকের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি করে পরিবার, একটি করে জীবনের গল্প। কেউ বৃদ্ধ বয়সে শান্তিতে বেঁচে থাকার প্রত্যাশা করেছিলেন, কেউ কৈশোরের স্বপ্ন নিয়ে পৃথিবীকে চিনতে শুরু করেছিলেন, কেউ বা শিশু বয়সেই বুঝতে পেরেছিলেন সংঘাতের নির্মমতা।

সেদিনের ঘটনায় সামরিক যানবাহন আহতদের উদ্ধারে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই দৃশ্যের মধ্যে ছিল এক গভীর বৈপরীত্য, একদিকে মানুষের আহত হওয়ার স্মৃতি, অন্যদিকে তাদের উদ্ধারের তৎপরতা। ইতিহাসের কোনো ঘটনাকে বুঝতে হলে এই জটিল বাস্তবতাকেও পাশাপাশি বিবেচনা করতে হয়।

১৩ অক্টোবর বেলা প্রায় দুইটা। ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল মাহবুব হাসান দ্রুত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিল, সমাবেশের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না। তাঁরা পাল্টা প্রশ্ন করেন, নাগরিকের গণতান্ত্রিক সমাবেশের অধিকার কোথায়? সংবিধানের কোন বিধানে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের জন্য এমন অনুমতির বাধ্যবাধকতা রয়েছে? তাঁরা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার অধিকারের কথা তুলে ধরেন।

কর্নেল মাহবুব হাসান এরপর একজন বাঙালি যুবককে গুলি করার প্রসঙ্গ তোলেন। জবাবে তাঁরা টিএনওর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, তিনিই গুলি ছোড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। টিএনও পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। এরপর কর্নেল সাহেব আর কথা বাড়াননি। “তামাশা তো শেষ। এবার কী করবেন করেন।”

হ্যাঁ, সেদিনের তামাশা হয়তো শেষ হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের যাত্রা সেদিনই যেন নতুন করে শুরু হয়েছিল। যে মৃত্যু একটি জনপদকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, সেই মৃত্যুকে ঘিরেই জন্ম নিতে থাকে প্রতিবাদ, সংগঠিত হতে থাকে মানুষের কণ্ঠস্বর।

১৫ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাবুছড়া, উদলবাগান, বড়াদাম, বুদ্ধপাড়া ও পোবাং পাড়ায় পাঁচটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় মানুষের আবেগ, ক্ষোভ ও দাবির প্রতিফলন ঘটেছিল। সেই সময় জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,  ১. বানছড়া গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শহীদ ভরদাস মনি গ্রাম’। ২. মাইনী ব্রিজের নামকরণ করা হয় ‘শহীদ ভরদাস মনি সেতু’।

একটি গ্রামের নাম, একটি সেতুর নাম বাইরে থেকে দেখলে হয়তো সামান্য পরিবর্তন। কিন্তু কোনো জনপদের মানুষের কাছে এই নামকরণ হয়ে উঠতে পারে স্মৃতির সংরক্ষণ, শোকের স্বীকৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধার প্রকাশ। ১৭ অক্টোবর সভা শেষে ফেরার পথে সেকেন্ড অফিসার আব্দুল হাই সুপ্রিয় চাঙমাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই প্রতিবাদে বের হয় একটি বিক্ষোভ মিছিল। সেটিই ছিল দিঘীনালার ইতিহাসে প্রথম বিক্ষোভ মিছিল।

বিক্ষোভকারীরা ঘোষণা করেন, পরদিনের মধ্যে নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে সমগ্র পার্বত্য এলাকায় হরতাল পালন করা হবে। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ওই রাতেই প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। পরদিন জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সহযোদ্ধারা ফুলের মালা পরিয়ে তাঁদের বরণ করে নেন। সেই মালা ছিল কেবল অভ্যর্থনার উপকরণ নয়; প্রতিকূলতার মধ্যে সংহতি, সাহস ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতীক। এই কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে শোক ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রতিবাদে, আর ব্যক্তিগত বেদনা যুক্ত হয় একটি বৃহত্তর সামাজিক স্মৃতির সঙ্গে।

বন্ধুগণ, গতকাল ১৩ অক্টোবর। শহীদ ভরদাস মনি চাকমার মৃত্যুর ৩৪ বছর পূর্ণ হলো। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে প্রজন্ম, বদলে গেছে জনপদের বহু পরিচিত দৃশ্য। তবু মিঙিনি নদীর তীরে সেই অক্টোবরের স্মৃতি আজও ফিরে আসে, কখনো ইতিহাসের পাতায়, কখনো প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণে, কখনো বা নতুন প্রজন্মের প্রশ্নের মধ্যে।

চোখ বুজে ভাবলে আজও যেন দেখা যায় সেই মেঘলা আকাশ, ভেজা মাটি, নদীর কূল আর চিতার লেলিহান শিখা। মনে হয়, আগুনের সেই ফুলিঙ্গ কেবল একটি দেহকে ভস্ম করেনি; তা রেখে গেছে এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর সময়ের কাছে আজও দাবি করা যায়।

কেন একজন সাধারণ কৃষককে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হলো? কেন একটি গণসমাবেশের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রইল রক্তপাতের বেদনা? কেন পাহাড়ের মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন বারবার ইতিহাসের কঠিন অধ্যায় হয়ে ফিরে আসে?

শহীদ ভরদাস মনি চাকমা ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। তাঁর স্বপ্ন হয়তো ছিল খুবই সাধারণ, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, জুমের ফসল ঘরে তোলা, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিদের স্নেহে জীবন কাটানো। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর স্মৃতি তাঁকে আজ একটি বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ করে তুলেছে।

তাঁর বিধবা স্ত্রী, পরিবার, স্বজন এবং সেই দিনের আহত মানুষের বেদনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনার কেন্দ্রে থাকে রক্তমাংসের মানুষ, তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার অধিকার। 

একটি জীবন থেমে যেতে পারে, কিন্তু সেই জীবনকে ঘিরে জন্ম নেওয়া প্রশ্ন থেমে থাকে না। একটি দেহ আগুনে ভস্মীভূত হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে সহজে ছাই করে দেওয়া যায় না।

মিঙিনি নদী আজও বয়ে চলে। তার জল বহন করে নিয়ে যায় সময়ের পলি, তবু নদীর তীরের ইতিহাস মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়। শহীদ ভরদাস মনি চাকমার স্মৃতিও তেমনি থেকে যাক, প্রতিশোধের আহ্বান হয়ে নয়, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রেরণা হয়ে। আসুন, অতীতের শোককে ধারণ করি, ইতিহাসের সত্যকে অনুসন্ধান করি এবং এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করতে হবেনা আর কোনো মানুষ মূল্য দিতে হবে না।

শহীদ ভরদাস মনি চাকমার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। জুম্ম জনতার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। শহীদ ভরদাস মনি অমর রহে।

তথ্যসূত্র: জুম্ম কণ্ঠ, ১ম সংখ্যা, ২০ নভেম্বর ১৯৯২ ইং।  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা