পার্বত্য চুক্তির ছায়াতলে পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস: মুক্তি না মুক্তিপণ? - ইনজেব চাঙমা
পার্বত্য চুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইবে বলে স্বপ্ন দেখেছিল জুম্ম জনগণ। মনে হয়েছিল, দীর্ঘ দশকের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় শেষে এবার বুঝি ফিরবে নিজ ভূমিতে অধিকার, জুমে ফলবে সোনালি ফসল। কিন্তু স্বপ্নের আয়ু বড় ক্ষণস্থায়ী। চুক্তির কাগজের কালি শুকোতে না শুকোতেই পাহাড় দেখল এক নতুন অন্ধকার।
চাকমা প্রবাদে বলে - “এ্যারা খেইয়ে বাঘ দরে ধেই, চিত খেইয়্যা বাক লাঘত পায়” - অর্থাৎ এক বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে না পেতেই আরও ভয়াবহ বিপদে জড়িয়ে পড়া। আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জীবনের নির্মম সত্য যেন এই প্রবাদটিই।
একদিকে চুক্তি মোতাবেক বেদখল হওয়া জায়গা-জমি আজও ফেরত মেলেনি। ভূমি কমিশন কাগজে-কলমে আছে, বাস্তবে নেই। অন্যদিকে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের আগুনে পুড়ছে পাহাড়। আধিপত্যের লড়াই, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ঝনঝনানি, আর প্রতিনিয়ত অপহরণের আতঙ্কে পাহাড়ি মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। যে চুক্তি মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল, সেই চুক্তির পরেই যেন দুর্দশা আরও নতুন করে বেড়ে গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অপহরণ নতুন কোনো শব্দ নয়। কিন্তু কিছু অপহরণ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব বিবেককে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আর অগণিত ঘটনা রয়ে গেছে পাহাড়ের নীরব কান্না হয়ে।
২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। রাঙামাটির নানিয়ারচরের নির্জন পথে উন্নয়নের রূপরেখা আঁকতে এসেছিলেন ডেনমার্কের উন্নয়ন সংস্থা ড্যানিডার তিন প্রকৌশলী- ডেনমার্কের টারবেন মিকেলসন ও নিলস হুলগার্ড এবং ইংল্যান্ডের টিম সেলবি। রাঙামাটি-মহালছড়ি সড়ক প্রশস্ত করার কাজে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন তারা।
হঠাৎ তারা হারিয়ে গেলেন পাহাড়ের গহীনে। খবর ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুৎ গতিতে। ৯ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি উঠল। দুই দেশের রাষ্ট্রদূত ছুটে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দরজায়। সরকার দায়ী করল চুক্তি-বিরোধী নবগঠিত দল ইউপিডিএফকে। সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার সাংবাদিকদের দেখালেন অপহৃত মিকেলসনের হাতে লেখা চিরকুট, যেখানে তিনি স্ত্রীকে লিখেছেন- "ভালো আছি"। সেই চিরকুট পড়তে পড়তে ইংল্যান্ড থেকে সন্তান কোলে রাঙামাটি ছুটে এসেছিলেন উৎকণ্ঠিত স্ত্রী ডিভিনা।
অবশেষে ১৭ মার্চ, কাউখালীর দুর্গম অরণ্য থেকে মুক্তি মিলল তাদের। রাষ্ট্র বলল, "প্রচণ্ড গোলাগুলির পর উদ্ধার"। কিন্তু মুক্ত মানুষগুলো ঢাকায় এসে বললেন ভিন্ন কথা- "কোনো গোলাগুলি হয়নি, শুধু দু-একটি গুলির শব্দ শুনেছি।" সত্য-মিথ্যার এই ধোঁয়াশা আজও রয়ে গেছে।
সংখ্যার বিচারে এটিই সবচেয়ে বড়। ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। লংগদুর কাট্টলীবিলের শান্ত জলে একটি নৌকা ভাসছিল। নৌকা ভর্তি জেএসএসের ৭০ জন নেতা-কর্মী চলেছেন রাঙামাটিতে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা মুখগুলো জানত না, সামনেই ওঁৎ পেতে আছে ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র দল।
নৌকাটি জিম্মি করা হলো। ৭০টি প্রাণ একসাথে হারিয়ে গেল অজানায়। মুক্তিপণ দাবি করা হলো। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলল। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য মতে, প্রায় এক বছর ধরে কিস্তিতে কিস্তিতে মুক্তিপণ দিয়ে একে একে ফিরে এসেছিলেন তারা। এটি ছিল শুধু অপহরণ নয়, একটি জনগোষ্ঠীর উৎসবের ওপর হামলা।
একই বছরের ৮ জুলাই, বাঘাইছড়ির পাহাড়ে যারা আলো পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন, তারাই অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন। রাষ্ট্রীয় মোবাইল সেবা টেলিটকের পাঁচ কর্মী অপহৃত হলেন।
১৭ দিন পর দীঘিনালা থেকে যখন তারা ফিরলেন, তাদের মুখে ছিল বন্দিদশার করুণ কাহিনী। কর্মী আখতারুজ্জামান বলেছিলেন, "তিন দিন আমাদের একটি মাটির ঘরে সশস্ত্র পাহারায় রাখা হয়েছিল, তারপর পাহাড় থেকে পাহাড়ে ঘোরানো হয়েছে।" উন্নয়নের কর্মীরা সেদিন বুঝেছিলেন, পাহাড়ে উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়া কতটা কঠিন। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
২০১৮ সালের ১৮ মার্চ, কুতুকছড়ির পথ থেকে দিনের আলোতে অস্ত্রের মুখে তুলে নেওয়া হলো দুই নারী নেত্রীকে - হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা ও জেলা সম্পাদক দয়া সোনা চাকমাকে।
যে পাহাড় নারীকে দেবীর আসনে বসায়, সেই পাহাড়েই নারীর কণ্ঠরোধ করা হলো। প্রতিবাদে স্তব্ধ হয়ে গেল খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি সড়ক অবরোধ, নৌপথ অবরোধ। ৩১ দিন পর মধুপুরের নির্জনতায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হলো। এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, পাহাড়ের সংঘাত এখন আর শুধু পুরুষের নয়, নারীকেও টেনে নিচ্ছে তার রক্তাক্ত গহ্বরে। এই ঘটনার ইউপিডিএফ দায়ী করে গণতান্ত্রীক ইউপিডিএফকে।
২০২২ সালে বম জনগোষ্ঠীর কিছু তরুণের হাত ধরে আত্মপ্রকাশ করা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ), তাদের কর্মকাণ্ড বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচিতে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল রাত ৯টায় তারা হামলা চালাল রুমা বাজারের সোনালী ব্যাংকে। পুলিশ ও আনসারদের জিম্মি করে ১৪টি অস্ত্র লুট করল। ভল্ট ভেঙে টাকা লুটে ব্যর্থ হয়ে তারা তুলে নিয়ে গেল ব্যাংকের ব্যবস্থাপক নেজাম উদ্দিনকে। ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি। ৪৮ ঘণ্টার উদ্বেগ শেষে তিনি ফিরলেন বটে, কিন্তু রেখে গেলেন এক ভয়াবহ বার্তা - পাহাড়ে এখন ব্যাংকও নিরাপদ নয়।
আর সবশেষে, ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল। খাগড়াছড়ির কুকিছড়া থেকে অটোরিকশায় করে সদরে ফিরছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ তরুণ - রিশন চাকমা, মৈত্রীময় চাকমা, দিব্যি চাকমা, লংঙি ম্রো ও অলড্রিন ত্রিপুরা। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থীরা চারুকলা, নাট্যকলা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগে পড়েন। গিরিফুল নামক জায়গায় তাদের পথ আটকানো হলো।
যারা বিঝুর উৎসব শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলেন, তাদের ঠাঁই হলো অজ্ঞাত আস্তানায়। আবারও সেই পুরনো অভিযোগ-অস্বীকারের পালা। পিসিপি দায়ী করল ইউপিডিএফকে।
এগুলো তো কেবল সেইসব ঘটনা, যা সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় এসেছে, টক-শোতে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এর আড়ালে যে অগণিত জুম্ম অপহরণের ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই কোনো খাতায়।
কত জুম চাষি, কত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কত স্কুলপড়ুয়া ছাত্রকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নীরবে। কেউ জমি-বাড়ি বিক্রি করে, গরু-ছাগল বেচে, সুদের ওপর টাকা নিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছে নিঃস্ব হয়ে। আর কেউ ফিরেই আসেনি। মুক্তিপণ দিয়েও তার লাশটিও খুঁজে পায়নি পরিবার। সেইসব নামহীন, শিরোনামহীন কান্না পাহাড়ের কুয়াশার মতোই মিলিয়ে যায়।
পার্বত্য চুক্তি এসেছিল শান্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু আজ পাহাড়ি মানুষের মনে প্রশ্ন একটাই- এই কি সেই শান্তি? যেখানে নিজের ভিটেতে থাকার অধিকার নেই, যেখানে সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায় না, যেখানে রাত হলেই অপহরণের আতঙ্কে কাঁপতে হয়?
এইসব গল্প বলার কারণ একটাই - আর কতদিন এভাবে দিন কাটিয়ে দেব? আর কতকাল আমরা ভয়ে ভয়ে পথ চলব? আর কতকাল মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকবে সে ফিরবে কি না? আর কতকাল মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে আমাদের জমি-বাড়ি, গরু-ছাগল বিক্রি করতে হবে? আর কতকাল আমরা এক ভাই আরেক ভাইয়ের রক্তে পাহাড়ের মাটি ভেজাব?
পার্বত্য চুক্তি বিরোধিতা করে আমাদের মুক্তি দেয়নি, দিয়েছে এক নতুন শৃঙ্খল। সেই শৃঙ্খল ভাঙার সময় এসেছে। জাগো প্রজন্ম, জাগো!
হে তরুণ, হে নতুন প্রজন্ম, তোমাদের ঘুমিয়ে থাকার সময় আর নেই। যে পাহাড় আমাদের পূর্বপুরুষেরা রক্ত দিয়ে আগলে রেখেছেন, যে জুমে আমাদের শেকড়, সেই পাহাড় আজ ভালো নেই। তোমাদের জাগতে হবে। আসো, আমরা হিংসা, বিভেদ আর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পথ ছেড়ে এক হই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনে। অস্ত্র নয়, শিক্ষা হোক আমাদের হাতিয়ার। প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসা হোক আমাদের ভাষা।
চলো, আমরা এমন একটি পাহাড় গড়ি, যেখানে অপহরণের আতঙ্ক থাকবে না, চাঁদাবাজির ভয় থাকবে না। যেখানে জুম্ম, বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম - সকলে মিলে মানুষ হিসেবে বাঁচবে। নতুন প্রজন্মকে সুন্দর, স্বাধীন একটি দেশ উপহার দিই।
এই দেশটা কোনো দলের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয় , এই দেশটা আমাদের জুম্ম সন্তানদের। তাদের জন্য আমরা রেখে যাব না আর কোনো ভয়ের গল্প, রেখে যাব না মুক্তিপণের রসিদ। আমরা রেখে যাব একটি সবুজ পাহাড়, যেখানে ভোরের পাখি নির্ভয়ে গান গাইবে, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে স্কুলে যাবে, যেখানে জুমের ধানে হাসবে সোনালি আলো। স্কুল-কলেজে যেতে প্রজম্ম প্রাণ খুলে গাইবে, রেং দেবে “ন’ চাং যেবার জাগান ছারি ইধু আঘং জনমান গরি”। এইসব গল্প আজ বললাম, যাতে কাল আর এমন কোনো গল্প বলতে না হয়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন