সোনার চাকচিক্যে অন্ধ বিবেক, অন্ধকারে তরুণের ভবিষ্যৎ - ইনজেব চাঙমা
![]() |
| শিক্ষার্থী - ঝর্ণা চাঙমা |
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারার রামেসু বাজারসংলগ্ন এলাকায় নিহত আক্রই, আথুই ও থৈইচিং মারমার স্মরণে ২০২৬ সালের একই দিনে শোক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ স্মৃতি সংসদ ও ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা হয়। সংগঠন দুটি ইউপিডিএফের পরিচালনাধীন বলে পরিচিত।
নিহতদের স্মরণ ও ন্যায়বিচারের দাবি মানবিক। কিন্তু সেই কর্মসূচিতে সন্তু লারমার কুশপুত্তলিকা পোড়ানো এবং মিছিলের সামনের সারিতে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি আমাকে ভাবিয়েছে। প্রতিবাদ মানুষের অধিকার; কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা যদি শিশুদের মনে ঘৃণার বীজ বপন করে, তবে তার পরিণতি কী হবে? যে শিশুর হাতে বই-কলম থাকার কথা, তার হাতে বিদ্বেষের মশাল তুলে দিয়ে আমরা কেমন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছি?
গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ ঝর্ণা চাকমার একটি ভিডিও দেখলাম। মাচালং হাইস্কুলের এই শিক্ষার্থী ২০২৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। ভিডিওতে সে অভিযোগ করেছে, সেনাবাহিনী তাকে খুঁজছে। ১১ অক্টোবর সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলাকালে সে সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলেছিল।
আহা, ঝর্ণা! যে বয়সে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার, কলেজে পড়ার স্বপ্ন দেখার কথা, সে বয়সে নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হলে তা শুধু একজন কিশোরীর দুর্ভাগ্য নয়, আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। আমার প্রশ্ন ঝর্ণার বিরুদ্ধে নয়; বরং সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, যা পাহাড়ের মিঠুন, বিপুলসহ অসংখ্য তরুণের সম্ভাবনাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। জাতির মুক্তির নামে আর কত তরুণের স্বপ্ন ক্ষতবিক্ষত হবে? অতীতের আত্মত্যাগকে সম্মান করেও কি আমরা বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলতে পারি না?
তৎকালীন ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে শুনেছি, ১৯৯২ সাল থেকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন দৃশ্যমান হতে থাকে। প্রসীত খীসা ও পাম্পু গ্রুপের মধ্যে নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিরোধ ছিল বলে তাঁদের বর্ণনায় জেনেছি। সে সময় মতভিন্ন ব্যক্তিদের ‘দালাল’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতার কথাও শুনেছি।
মতের অমিল হলেই কাউকে ‘দালাল’ তকমা দিয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় ও অবদান অস্বীকার করা, এ কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি? তিন দশকে পাহাড়ের প্রকৃতি ও প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু অপবাদ দেওয়ার প্রবণতা কি বদলেছে?
যাঁরা একসময় জীবন-যৌবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন, যাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন, তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু মতভিন্নতার জবাব যদি যুক্তির বদলে অপমান ও ঘৃণায় দেওয়া হয়, তাহলে রাজনৈতিক আদর্শের নৈতিক ভিত্তি কোথায় থাকে?
একই রাজনৈতিক সময়ের আরেকটি চিত্রও মনে পড়ে। আমার চাচাতো ভাই সুবর্ণ চাঙমা (সেকেন্ড লেফটেনেন্ট)সহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে শুনেছি, প্রসীত খীসা পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি থাকাকালে দলীয় বৈঠকে যাওয়ার সময় তাঁর যাতায়াতের পথ ও নিরাপত্তা নিয়ে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তাঁর আগমন ঘিরে বিশেষ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বর্ণনাও শুনেছি।
একসময় যে প্রসীত খীসার আগমনে পথ সাজানো হতো, ফুল ছিটিয়ে বরণ করা হতো, আজ তাঁর পক্ষের কর্মসূচিতে সন্তু লারমার কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হচ্ছে। সময়ের এই বৈপরীত্য প্রশ্ন তোলে, রাজনৈতিক আনুগত্য বদলালে কি শ্রদ্ধার মানদণ্ডও বদলে যায়? মতভিন্নতার জবাব কি যুক্তি ও আলোচনা দিয়ে দেওয়া যায় না?
চাঙমা ভাষার একটি প্রবাদ মনে পড়ে, “নোনিয়্যা পুঅ ছা ভালেত নেই।” অর্থাৎ মোহের আড়ালে বাস্তবতা হারিয়ে ফেলার একটি সতর্কতা রয়েছে।
মুক্তি ও পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের আকর্ষণীয় স্লোগানে মুগ্ধ হয়ে আমরা কি কখনো দেখতে ভুলে যাই, কোনো শিশু কখন ভিন্নমতকে শত্রু ভাবতে শিখছে, কখন তরুণের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, কখন রাজনৈতিক বিরোধ মানবিক মর্যাদাকে গ্রাস করছে?
রাজনৈতিক সচেতনতা আর বিদ্বেষ এক নয়। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি; অন্যের অধিকার অস্বীকার করা নয়। ইতিহাস জানা প্রয়োজন; ইতিহাসের ক্ষতকে উত্তরাধিকারসূত্রে ঘৃণার অস্ত্র বানানো নয়।
আমরা এমন একটি পাহাড় চাই, যেখানে শিশুরা নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাস শিখবে; তরুণেরা মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক করবে, কিন্তু রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হবে না। মুক্তির অর্থ হবে মানুষের সম্ভাবনার বিকাশ- ভয়, প্রতিহিংসা ও অনিশ্চয়তার বিস্তার নয়।
স্মরণসভা থাকুক, ন্যায়বিচারের দাবি থাকুক, প্রতিবাদও থাকুক। কিন্তু শিশুদের হাতে বিদ্বেষের মশাল তুলে দেওয়ার আগে ভাবতে হবে, সেই আগুন শেষ পর্যন্ত কার ভবিষ্যৎ পুড়িয়ে দেবে?
সোনার চাকচিক্যে চোখ ধাঁধিয়ে গেলে সত্য আড়াল হয়। রাজনৈতিক আদর্শের মোহে যদি আমরা তরুণদের হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা ও শিশুদের মনে জন্ম নেওয়া বিদ্বেষ দেখতে না পাই, তবে সেই অন্ধত্বের দায় আমাদেরও নিতে হবে।
শিশুর হাতে আগুন নয়, বই-কলম তুলে দিই; বিদ্বেষ নয়, বিবেকের আলো জ্বালাই। কারণ যে প্রজন্মকে আমরা ঘৃণা শেখাই, তার কাছ থেকে সম্প্রীতি ও মুক্তির প্রত্যাশা করা আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয় যে মুক্তির স্বপ্ন, তার পথ ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন