চাঙমা সমাজের লোকবিশ্বাস, প্রথা ও ঐতিহ্য - ইজেব চাঙমা

ভূমিকা

একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি শুধু তার ভাষা, পোশাক কিংবা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পূর্বপুরুষের বিশ্বাস, জীবনাচার ও প্রথার মধ্যেও তার ইতিহাসের পরিচয় লুকিয়ে থাকে। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সহাবস্থানে গড়ে ওঠা চাঙমা সমাজের জীবনেও রয়েছে এমন বহু লোকবিশ্বাস। পাহাড়, অরণ্য, জুমচাষ, পশুপাখির আচরণ, স্বপ্ন ও মৃত্যু, এসবকে কেন্দ্র করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রচলিত হয়েছে নানা ধারণা ও আচার। সব বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও চাঙমা সমাজের ঐতিহাসিক জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অনুধাবনে এগুলোর গুরুত্ব রয়েছে।

শুভ-অশুভ লক্ষণ ও স্বপ্নের বিশ্বাস

চাঙমা সমাজে অতীতে দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনাকে শুভ-অশুভের সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পথের ধারে ছোপ ছোপ রক্ত পড়ে থাকতে দেখলে ‘বুকিত্তর’ বা মৃত্যুর আশঙ্কা করা হতো। রাত্রিবেলা ঘরের ভেতর জোনাকি প্রবেশ করলে অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হতো। অন্যদিকে, কুকুর ঘরের চালে উঠলে, চিল-শকুন চালে বসলে কিংবা কালা উয়, কালা জামুর সাপ, কচ্ছপ ও গোসাপ ঘরে প্রবেশ করলে গৃহস্থের অমঙ্গল হতে পারে বলে বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। দিনের বেলায় শিয়ালের ডাক এবং রাতে ঘুঘু-কাকের ডাককেও অনেকে অশুভ লক্ষণ মনে করতেন। রাত্রিবেলা তোতাপাখির ঝাঁক কলরব করতে করতে উড়ে গেলে পাড়া ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করা হতো।

স্বপ্নকেও ভবিষ্যৎ ঘটনার সম্ভাব্য সংকেত হিসেবে দেখা হতো। স্বপ্নে মৃত ব্যক্তি ইশারা করে কাছে ডাকলে মৃত্যুর আশঙ্কা করা হতো। বিপদে পড়া কিংবা উঁচু স্থান থেকে নিচে পড়ে যাওয়াকে শিশুর শরীর বেড়ে ওঠার লক্ষণ বলে মনে করা হতো। স্বপ্নে কাঁকড়া দেখলে ঝগড়া-বিবাদ, লাউ দেখলে দুর্নাম এবং আঁশযুক্ত বড় মাছ দেখলে অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হতো।

প্রকৃতি ও আবহাওয়াসংক্রান্ত লোকবিশ্বাস

পাহাড়ি জীবনে আবহাওয়ার পরিবর্তন কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই আকাশ, মেঘ ও পশুপাখির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার নানা লোকবিশ্বাস চাঙমা সমাজে প্রচলিত ছিল।

বিশ্বাস করা হতো, পশ্চিম আকাশে রামধনু দেখা দিলে বন্যার আশঙ্কা থাকে, আর পূর্ব আকাশে দেখা দিলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। সারাল্যে চিল ঘুরে ঘুরে (পাক খেই খেই) ডাক দিয়ে ওপরে উঠলে বৃষ্টির মেঘ কেটে যাবে বলে মনে করা হতো। পূর্ব দিকে বানরের ডাক শোনা গেলে খরার সময় বৃষ্টি এবং বৃষ্টির সময় খরা হতে পারে, এমন ধারণাও প্রচলিত ছিল। ছড়া বা নদীর ওপর থেকে নিচের দিকে ‘ফেবো’ ডাক দিয়ে চলে গেলে গ্রামে কারও মৃত্যুর আশঙ্কা এবং নিচ থেকে ওপরে উঠে এলে আপনজনের মৃত্যুর সংকেত রয়েছে বলেও বিশ্বাস করা হতো। এসব ধারণা প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে গড়ে ওঠা লোকজ পর্যবেক্ষণ ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যার পরিচায়ক।

নবান্ন, মা-লক্ষ্মী ও কৃষিজীবন

চাঙমা সমাজের কৃষিজীবনে ধান শুধু খাদ্য নয়, জীবিকা ও সমৃদ্ধির প্রতীক। নবান্নের সময় ‘মা-লক্ষ্মী মা’-এর পূজা করলে গৃহস্থের মঙ্গল হয় বলে বিশ্বাস করা হতো। ধানের শীষে ধান ফেটে খইয়ের মতো হলে মা-লক্ষ্মী খুশি হন এবং ফসলে বরকত আসে, এমন ধারণাও প্রচলিত ছিল।

গৃহপালিত মুরগির আচরণ নিয়েও নানা বিশ্বাস ছিল। কোনো মুরগি জোড়া কুসুমযুক্ত ডিম দিলে গৃহস্থের মঙ্গল হয় বলে মনে করা হতো। বিপরীতে, ছোট ডিম, নরম খোলসের ডিম দিলে (পারিলে)  কিংবা মোরগের মতো মুরগির বা সন্ধ্যায়/রাত্রে মুরগ ডাককে সময় অমঙ্গলের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এসব বিশ্বাসে কৃষিনির্ভর মানুষের প্রাচুর্য ও পারিবারিক নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।

গৃহনির্মাণ ও জুমচাষের প্রথা

চাঙমা সমাজে গৃহনির্মাণের সময় পারিবারিক শৃঙ্খলা ও প্রচলিত বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। বয়োজ্যেষ্ঠের ঘরের পানি যেন কনিষ্ঠের উঠান মাড়িয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা হতো। দুজন জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের ঘরের মাঝখানে ছোট ভাইয়ের ঘর নির্মিত হলে সেই বিন্যাসকে ‘ভারবো’ বলা হতো বলে জানা যায়। এমন স্থানে বাড়ি নির্মাণ এড়িয়ে চলার রীতিও ছিল।

দুই পাহাড়ের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যবর্তী সরু গিরিপথকে চাঙমারা ‘কিঝিং’ বলতেন। এ পথে ভূতপ্রেত চলাচল করে বলে বিশ্বাস থাকায় সেখানে গৃহনির্মাণ করা হতো না। মূল খুঁটি স্থাপনের সময় ‘সোনারূপা’ ও ‘ঘিলা কজই’ পানি ছিটিয়ে জায়গা পবিত্র করা এবং খুঁটির ওপর তীর-ধনুক স্থাপন করে অশুভ শক্তির আগমন প্রতিরোধের প্রথাও প্রচলিত ছিল। গৃহনির্মাণ শেষ হওয়ার আগে ভূমিকম্প হলে অবশিষ্ট কাজ আর সম্পন্ন না করার বিশ্বাসও ছিল।

জুমচাষের জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কিছু স্থান এড়িয়ে চলা হতো, ‘ন-টানা’, ‘থম্বকগাত’, ‘দ্যায় দুলন’, ‘বাদলখাত’, ‘আহ্জা’ ও ‘বিয়াত্রা বিধা’ নামে কয়েকটি বিশেষ ভূমি বা স্থানের। এসব স্থানে ভূমির গঠন, স্যাঁতসেঁতে অবস্থা কিংবা লোকবিশ্বাসের কারণে জুমচাষ করা হতো না।

মৃত্যু ও মৃতের আত্মাকে ঘিরে বিশ্বাস

চাঙমা সমাজে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিশ্বাসেরও বিশেষ স্থান রয়েছে। একটি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর সাত দিন পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির আত্মা দান-দক্ষিণা পাওয়ার আশায় ঘুরে বেড়ায়। সাত দিনের অনুষ্ঠানের আগে শ্মশানের বেষ্টনী খুলে মৃতাত্মাকে অনুষ্ঠানে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো ও বজ্রপাতের সময় নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে দুই কানের পাশে চুল সাতবার ভিজিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে দুর্গতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, এমন লোকবিশ্বাসও প্রচলিত ছিল। রাত্রিবেলা, সকালে কিংবা বুধবারে মৃত ব্যক্তির সৎকার করা হতো না। 

উপসংহার

চাঙমা সমাজের লোকবিশ্বাস ও প্রথা তাদের প্রকৃতিনির্ভর জীবন, কৃষিসংস্কৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জন্ম-মৃত্যু সম্পর্কে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যগত ধারণার পরিচয় বহন করে। এসব বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে কখনো অজানার ভয়, কখনো সমৃদ্ধির প্রত্যাশা, আবার কখনো পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া জীবনবোধ।

সময়ের পরিবর্তনে অনেক প্রথা হারিয়ে যাচ্ছে, কিছু টিকে আছে প্রবীণদের স্মৃতি ও মৌখিক বর্ণনায়। তাই এগুলোকে অন্ধভাবে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা না করে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। স্থানীয় শব্দের অর্থ, প্রথার উৎপত্তি ও অঞ্চলভেদে প্রচলন যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা গেলে এই লোকঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চাঙমা সমাজের শিকড় ও পরিচয়ের মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে।

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা