পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের মানচিত্রে যার শরীর সবুজ পাহাড়ে আঁকা, নদীর বাঁকে বাঁকে যার স্মৃতি, আর মানুষের মুখে মুখে যার ইতিহাস। সেই পাহাড়ের বুকে শান্তির যে স্বপ্ন একদিন অশ্রু, রক্ত ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছিল, তার নাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সেই চুক্তি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় দলিল নয়; এটি দীর্ঘ সংঘাতের পর দুই পক্ষের মধ্যে স্থাপিত একটি রাজনৈতিক সেতু। সেই সেতুর ওপারে ছিল শান্তির প্রত্যাশা, আর এপারে ছিল পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ভূমির প্রশ্ন, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং রাজনৈতিক অধিকারের আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু আজ, প্রায় তিন দশক পরে, সরকার যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন করে তিনটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যে চুক্তির মাধ্যমে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথ নির্ধারিত হয়েছিল, সেই পথের কতটুকু আমরা হেঁটেছি? আর কতটুকুই বা বাকি রয়ে গেছে?
১০ সেপ্টেম্বর রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকার সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, আইন ও বিধি পর্যালোচনা এবং জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের কথা বলেছে। উদ্দেশ্য হিসেবে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এসবই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব। কিন্তু পাহাড়ের মানুষকে শুধু নিরাপত্তার চোখে দেখলে পাহাড়কে দেখা হয় না; দেখা হয় কেবল তার অন্ধকারকে। অথচ পাহাড়েরও একটি দীর্ঘ স্মৃতি আছে, একটি রাজনৈতিক ইতিহাস আছে, একটি ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে, ভূমির সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা আছে।
পাহাড়ের সমস্যা কেবল বন্দুকের শব্দে জন্ম নেয়নি; তাই বন্দুকের নীরবতাই তার একমাত্র সমাধান হতে পারে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনে যে ইতিহাস, তার কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক প্রশ্ন। ফলে আজ যদি সেই সমস্যার সমাধানকে প্রধানত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলার কাঠামোয় আবদ্ধ করা হয়, তবে সংকটের শিকড়ের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
নতুন নির্বাহী কমিটিতে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বড় উপস্থিতি রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি সেখানে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন রয়েছে, তাদের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে তাদের কণ্ঠ কতটা জোরে শোনা যাবে?
কারণ পাহাড়ের মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু শুধু নিরাপত্তা চায় না। তারা এমন এক নিরাপত্তা চায়, যেখানে ঘরের মাটির নিচে তার ভূমির অধিকার থাকবে; সন্তানের বিদ্যালয়ে তার ভাষার অস্তিত্ব থাকবে; তার সংস্কৃতি থাকবে মর্যাদার সঙ্গে; তার নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান থাকবে কার্যকর; এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকবে অবিশ্বাসের নয়, আস্থার।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম তাৎপর্য এখানেই। চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি বিশেষ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর স্বীকৃতি দিয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, এসব প্রতিষ্ঠান নিছক দপ্তর নয়; এগুলো পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নির্মিত প্রতিষ্ঠান।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কথা ছিল, সেগুলোকে পূর্ণ ক্ষমতা ও কার্যকর এখতিয়ার না দিয়ে নতুন নতুন কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন কেন?
একটি ঘরের ভিত্তি দুর্বল রেখে তার ওপর নতুন বারান্দা বানালে ঘর সুন্দর দেখাতে পারে, কিন্তু নিরাপদ হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন রেখে নতুন কর্মকৌশল যতই আকর্ষণীয় হোক, তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
আর পাহাড়ের সবচেয়ে জটিল ক্ষত, ভূমি। ভূমি সেখানে কেবল মাটি নয়। ভূমি মানে ঘর, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, জুমের ধোঁয়া, শ্মশান, বৌদ্ধবিহার, পাহাড়ি ঝিরি, ফলের বাগান, একটি মানুষের অস্তিত্বের দীর্ঘ ইতিহাস। তাই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ছাড়া পাহাড়ে শান্তির কথা বলা অনেকটা নদীর উৎস বন্ধ রেখে মোহনায় জল খোঁজার মতো।
এ কারণেই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যকর ভূমিকা এবং প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনকে জাতীয় কর্মকৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। নিরাপত্তা দিয়ে কোনো মানুষের হারানো ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না; আইনশৃঙ্খলা দিয়ে কোনো পরিবারের উচ্ছেদের ক্ষত মুছে ফেলা যায় না।
আরও একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে, পাহাড়ের উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি? রাস্তা হয়েছে, ব্রিজ হয়েছে, ভবন হয়েছে, এসব উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন। কিন্তু উন্নয়ন যদি মানুষের আত্মপরিচয়কে দুর্বল করে, তার ভাষাকে প্রান্তে ঠেলে দেয়, তার রাজনৈতিক অধিকারকে সংকুচিত করে, তার ভূমির নিরাপত্তা অনিশ্চিত রাখে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা মানুষের উন্নয়ন?
মানুষকে বাদ দিয়ে মানুষের জন্য উন্নয়ন করা যায় না। সরকারের নতুন কমিটিগুলো তাই চাইলে একটি ঐতিহাসিক সুযোগে পরিণত হতে পারে। তারা চাইলে পাহাড়ের ওপর আরেকটি প্রশাসনিক ছায়া ফেলতে পারে; আবার চাইলে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোকে সত্যিকার অর্থে সমাধানের টেবিলে আনতে পারে।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রতিটি ধারার বাস্তবায়ন কতদূর হয়েছে, কোথায় বাধা, কেন বাধা এবং কীভাবে তা দূর করা যায়, তার একটি স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য মূল্যায়ন।
এরপর প্রয়োজন আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদকে কার্যকর করা, ভূমি বিরোধের দ্রুত ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি, প্রত্যাগত শরণার্থী ও উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন এবং পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
নতুন আইন প্রয়োজন হলে আইন হোক। সংস্কার প্রয়োজন হলে সংস্কার হোক। কিন্তু সেই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য যেন চুক্তিকে দুর্বল করা না হয়; বরং চুক্তির অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব জীবনে পৌঁছে দেওয়া হয়।
কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সেনাশক্তিতে নয়; তার অঙ্গীকার রক্ষার সক্ষমতায়ও। আজ পাহাড়ের মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো শ্লোগান নয়, নতুন কোনো কমিটি নয়, নতুন কোনো কাগুজে প্রতিশ্রুতিও নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যেখানে পাহাড়ের মানুষ অনুভব করবে, তাদের কথা শোনা হচ্ছে, তাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করা হচ্ছে না, তাদের অধিকারকে নিরাপত্তার নামে সংকুচিত করা হচ্ছে না।
আমরা সন্ত্রাস চাই না। আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদ চাই না। আমরা সীমান্তের অরক্ষিত অবস্থা চাই না। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা এমন শান্তিও চাই না, যার নিচে চাপা পড়ে থাকে মানুষের অধিকার, ভূমির বেদনা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
পাহাড়ের শান্তি যদি সত্যিই চাই, তবে পাহাড়ের মানুষের আস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেই আস্থার দরজা খোলার চাবি নতুন কোনো প্রজ্ঞাপনে নয়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে।
তাই আজ প্রশ্নটি সরকারের প্রতি নয়, রাষ্ট্রের বিবেকের প্রতিও—
পাহাড়কে কি আমরা কেবল নিরাপত্তার মানচিত্রে দেখব, নাকি মানুষের ইতিহাসের মানচিত্রেও দেখব?
পাহাড়কে যদি শুধু একটি সীমান্তভূমি হিসেবে দেখা হয়, সেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু পাহাড়কে যদি মানুষসহ একটি জীবন্ত ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হয়, তবেই সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
কারণ পাহাড়ের শান্তি পাহাড়ের মানুষের হৃদয় জয়ের মধ্য দিয়েই আসে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে সামনে রেখেই হোক পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন পথচলা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন