রূপায়ন দেওয়ান রাঙা: পাহাড়ের সুরে শেকড়ের স্বর – ইজেব চাঙমা


শিল্পী: রুপায়ন দেওয়ান রাঙা                                                                               ছবি: সংগৃহীত

 

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সংগীতের ইতিহাসে রূপায়ন দেওয়ান রাঙা একটি স্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, কিবোর্ডবাদক সংগীতসংগঠক। চাকমা গানের ঐতিহ্যবাহী সুরধারাকে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সংগীতের বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত করে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর গানের বিষয়বস্তুতেও প্রতিফলিত হয়েছে পাহাড়ের মানুষ, জুমজীবন, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি সামাজিক বাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ।

রূপায়ন দেওয়ান রাঙা ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পাহাড়ের প্রকৃতি চাকমা সমাজের সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা তাঁর পরবর্তী শিল্পীজীবনের ভিত তৈরি করে। ছোটবেলা থেকেই নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর যে পরিচয় গড়ে উঠেছিল, পরবর্তী সময়ে সংগীতচর্চায় তারই প্রতিফলন দেখা যায়।

তাঁর যৌবনের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগীতচর্চার পরিসর ছিল সীমিত। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও তখন খুব বেশি বিস্তৃত হয়নি। সেই সময়েই রাঙা সংগীতের আধুনিক উপকরণের দিকে এগিয়ে যান। পাহাড়ের প্রথম দিককার কিবোর্ডবাদকদের একজন হিসেবে তিনি আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে চাকমা গানের সুর আবহের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেন।

রূপায়ন দেওয়ানের সংগীতজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গেংখুলী শিল্পীগোষ্ঠী। আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পীগোষ্ঠীর তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ছিলেন এর সভাপতি।

গেংখুলীর মাধ্যমে চাকমা গান সংস্কৃতির চর্চা একটি সংগঠিত সাংস্কৃতিক পরিসর লাভ করে। রাঙা এখানে শুধু কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নয়, একজন সংগঠক হিসেবেও কাজ করেন। শিল্পীদের একত্রিত করা, গান চর্চা পরিবেশনার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

চাকমা গান সংরক্ষণ প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হুয়াং ছেরে চাকমা গীত নামের একটি চাকমা গানের সংকলনের সম্পাদনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার উল্লেখ রয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ চাকমা সমাজের মৌখিক সংগীত ঐতিহ্যকে লিখিতভাবে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

রূপায়ন দেওয়ানের সংগীতচর্চার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ঐতিহ্য আধুনিকতার সমন্বয়। তিনি আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করলেও চাকমা গানের নিজস্ব সুর, ভাষা আবহকে তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেননি।

তাঁর সুরে আধুনিক সংগীতের বিন্যাস থাকলেও তার ভিত ছিল পাহাড়ের নিজস্ব সংগীত-ঐতিহ্য। তিনি প্রচলিত ধারাকে কেবল পুনরাবৃত্তি করেননি; বরং তার ভেতর থেকে নতুন সুরের সম্ভাবনা খুঁজেছেন। কারণেই তাঁর সংগীত একদিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে, অন্যদিকে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ধরে রেখেছে।

তাঁর শিল্পীসত্তার এই শেকড়মুখী বৈশিষ্ট্যই তাঁকে স্বতন্ত্র করে। আধুনিকতার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল, কিন্তু সেই আধুনিকতা কখনো শেকড়বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠেনি।

রূপায়ন দেওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়গুলোর একটি হলো তাঁর সৃষ্টিশীলতা। তিনি শুধু অন্যের লেখা সুরে গান পরিবেশন করেননি; নিজেও গানের কথা লিখেছেন এবং সুর সৃষ্টি করেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গান সুরসৃষ্টির মধ্যে রয়েছে, মা কোচপানা সান সংসারত কিচ্ছু নেই”, “ওই আগাঝর বার্গী পেইক অদং”, “যুদি চোক তুলচ দুয়ারান খুলচ”, “গদা আন অবার পরেন্দি”, “আজার বঝর ধুরি ইধু আঘং”, “মনান যেদ চায় সিধু এবং মর মরানার পর প্রভৃতি।

এই গানগুলোর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিসর বোঝা যায়। প্রেম, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা, বেদনা ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি তাঁর গানে উঠে এসেছে পাহাড়ের মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক।

জুমিয়া জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। জুমের শ্রম, পাহাড়ি প্রকৃতি, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সুখ-দুঃখ জীবনসংগ্রাম তাঁর গানের কথায় সুরে নানা রূপে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে তাঁর গান শুধু ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ নয়; তার মধ্যে একটি সমাজের জীবনযাপনেরও ছাপ রয়েছে।

রূপায়ন দেওয়ানের শিল্পীজীবনকে শুধু গায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত একজন সংগঠকও। গেংখুলীর প্রতিষ্ঠাকালীন দায়িত্ব তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

এছাড়া একসময় রাজদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক জীবনেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

তাঁর সমকালীনদের মূল্যায়নে, পার্বত্য চট্টগ্রামের শিল্পী হিসেবে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশেষত কথা সুর রচনায় তাঁর নিজস্বতা এবং চাকমা সংগীতের ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা পরিচয় দেয়।

রূপায়ন দেওয়ান (রাঙা) ছিলেন প্রণব কুমার দেওয়ান ও মিনতি দেওয়ান দম্পতির সন্তান। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়- ইরা দেওয়ান, উদয়ন দেওয়ান, রূপায়ন দেওয়ান, সঞ্চয়ন দেওয়ান, নিরা দেওয়ান ও সুনয়ন দেওয়ান। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের জনক ১.অতুল্যদেব দেওয়ান অতুল্য ২.পৃসতী শ্রেয়া দেওয়ান মিলু ৩.বিবেক দেওয়ান তাতুল)। তাঁর স্ত্রী পুষ্পিতা চাকমা মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস আগে প্রয়াত হন। জীবনের শেষ সময়ে এই শোক তাঁর ব্যক্তিজীবনে গভীর বেদনার ছাপ রেখে যায়।

জীবনের শেষ কয়েক বছর রূপায়ন দেওয়ান কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর বড় ভাই উদয়ন দেওয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় তিন বছর ধরে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতেন।

অবশেষে ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।

তাঁর মৃত্যুসংবাদে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়। শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচিতজনেরা তাঁর সংগীত সাংস্কৃতিক অবদানের কথা স্মরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চাকমা সংগীতের একটি প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী সংগঠকের জীবনাবসান ঘটে।

রূপায়ন দেওয়ান রাঙার শিল্পীজীবনের মূল্য তাঁর রেখে যাওয়া গান, সুর এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিহিত। তিনি এমন এক সময়ে কাজ করেছেন, যখন চাকমা সংগীত ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতার দিকে নতুন পথ খুঁজছিল। সেই পরিবর্তনের ভেতর তিনি নিজের সাংস্কৃতিক শেকড়কে অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক সংগীতের ভাষা গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর সৃষ্টিতে পাহাড় কেবল একটি ভূদৃশ্য নয়; তা মানুষের জীবন অনুভূতির অংশ। জুমিয়া সমাজের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি জীবনসংগ্রাম তাঁর গানকে দিয়েছে নিজস্ব মাটি। আর আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সুরের ব্যবহার সেই অভিজ্ঞতাকে দিয়েছে নতুন প্রকাশভঙ্গি।

এই দিক থেকে রূপায়ন দেওয়ান রাঙার জীবনকে শুধু একজন জনপ্রিয় চাকমা গানের শিল্পীর জীবন হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সময়ের শিল্পী, যিনি ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিকতার দিকে এগিয়েছেন এবং নিজের ভাষা সমাজের জীবনকে সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

মানুষের জীবন একদিন থেমে যায়, কণ্ঠও নীরব হয়। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর সৃষ্টি সময়ের সঙ্গে নতুন অর্থ পেতে থাকে। রূপায়ন দেওয়ান রাঙার ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর রেখে যাওয়া গান সুর চাকমা সংগীতের স্মৃতিতে তাঁর উপস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করবে। পাহাড়ের যে জীবনকে তিনি সুরে ধারণ করেছিলেন, সেই জীবনের স্মৃতির সঙ্গে তাঁর নামও থেকে যাবে, একজন শিল্পী হিসেবে, একজন স্রষ্টা হিসেবে এবং নিজের শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধ এক সাংস্কৃতিক মানুষ হিসেবে।

তথ্যসূত্র: আইপিনিউজ বিডি, ঢাকা মেইল, সুজন দেওয়ান গুরিং। সহযোগিতায়: সুব্রত চাঙমা, চাঙমা রাজবাড়ি।  

বি.দ্র.: লেখাটিতে তথ্যগত অসংগতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। কোনো কোনো বক্তব্য আপনার জানা তথ্য বা মতের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তাই লেখাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে, নিজস্ব জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ রইল।   

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা