শিশুর হাতে রাজনীতির নামে বিদ্বেষ তুলে দিচ্ছি না তো? - ইনজেব চাঙমা

 

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গুইমারার রামেসু বাজারসংলগ্ন এলাকায় ২০২৫ সালের একই দিনে নিহত আক্রই, আথুই ও থৈইচিং মারমার স্মরণে স্মরণসভা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের ওই ঘটনার স্মৃতি স্মরণ এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিই ছিল কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। স্মরণসভা শেষে প্রতিবাদী নাট্য পরিবেশন করা হয়। পরে অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্রের সদস্যদের অংশগ্রহণে সন্তু লারমা ও অন্যদের প্রতিকৃতি/কুশপুত্তলিকা নিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ ও তা পোড়ানোর ঘটনা ঘটে।
 
ঘটনার এই প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি। কারণ এটি সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল না; বরং একটি পুরোনো ঘটনার স্মরণ, বিচার দাবি এবং প্রতিবাদী কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ঘটনাটি ঘটেছে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, রাজনৈতিক প্রতিবাদের এমন কর্মসূচিতে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ কতটা যুক্তিসঙ্গত?
 
রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে। নেতৃত্বের সমালোচনাও থাকবে। চাঙমা কধায়, আমার আমার (দাঙরউনর) যে অভ ওক। কিন্তু শিশুদের দিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রতীকীভাবে অপমান বা আক্রমণের সংস্কৃতি তুলে ধরা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। শিশুর হাতে বই, কলম ও যুক্তি থাকার কথা, রাজনৈতিক বিরোধের প্রতীক নয়।
 
শুরু সন্তু লারমা নয় যে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। তাঁর সিদ্ধান্ত, সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। কিন্তু সমালোচনা যেন বিদ্বেষে পরিণত না হয়, বিশেষ করে শিশুদের রাজনৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সতর্কতা আরও জরুরি। 
 

“যে শান্তির জন্য রক্ত দিয়েছি, যে শান্তির জন্য শান্তিবাহিনী গঠন হয়েছিল, যে শান্তির জন্য অস্ত্র জমা দিয়েছিলাম, সে শান্তি আর পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকবে না।” ২৩ জুন ২০২৬। বান্দরবানের লামা উপজেলার নাজিরাম ত্রিপুরাপাড়ায় পাহাড়িদের ভূমি বেদখল, হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে দাঁড়িয়ে জুম্ম তরুণদের প্রতিনিধি জন ত্রিপুরার কণ্ঠে উচ্চারিত এই কথাগুলো শুধু একজন তরুণের ক্ষোভ নয়; এগুলো পাহাড়ের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক হতাশার একটি গভীর প্রতিধ্বনি। তাঁর বক্তব্যের মূল সতর্কতা ছিল, সন্তু লারমার জীবদ্দশাতেই পাহাড়ে স্থায়ী শান্তির রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
 
জন ত্রিপুরা আরও সতর্ক করে বলেছিলেন, সন্তু লারমা যদি একদিন না থাকেন, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা আজ অনুমান করা কঠিন। অন্যদিকে গোলাম মোর্তাজাও সন্তু লারমার রাজনৈতিক গুরুত্ব তাঁর জীবদ্দশাতেই উপলব্ধি করার কথা বলেছেন।
 
এরই মধ্যেই একটি সাধারণ প্রশ্ন আছে, পাহাড়ের রাজনৈতিক মতভেদ কি সংলাপ, যুক্তি ও ঐক্যের পথে যাবে, নাকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিভাজন বীজ রোপন আরও গভীর হবে?
 
শিশুদের রাজনৈতিক সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। কিন্তু সেই শিক্ষার ভিত্তি হওয়া উচিত ইতিহাস, যুক্তি, মানবিকতা ও মতের প্রতি শ্রদ্ধা। তাদের হাতে থাকুক বই, কলম ও যুক্তি, রাজনীতির নামে বিদ্বেষ নয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা