সংস্কৃতির অবক্ষয়, বিভক্ত সমাজ ও হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা - ইনজেব চাঙমা

নৃত্যুশিল্পী রাশিয়া চাঙমা ও ছাত্রী ঝর্ণা চাঙমা
মানুষই মানুষকে গড়ে তোলে, আবার মানুষের হাতেই মানুষের স্বপ্ন ভেঙে যায়। একটি জাতির সভ্যতার পরিচয় কেবল তার ভাষা, ঐতিহ্য কিংবা উৎসবে নয়; প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, ন্যায়বিচার ও দুর্বলের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়। অথচ আমাদের চাঙমা সমাজে সেই মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে কি না, তা আজ গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

সম্প্রতি দুজন কিশোরীকে ঘিরে কিছু ঘটনা আমার মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ১৯ অক্টোবর ২০২৬ মাচালং উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ঝর্ণা চাঙমাকে নিয়ে একটি বক্তব্য সামনে আসে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী তাকে খুঁজছে। ১১ অক্টোবর সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলাকালে সে সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলেছিল। এর পর জ্ঞানকীর্তি চাঙমার ফেসবুক পোস্টে রাশিয়া চাঙমা নামের আরেক কিশোরীকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পোস্টে দাবি করা হয়েছে, তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর রাশিয়ার বিয়ের খবর পাওয়া গেছে। তার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি এবং বিয়েতে অভিভাবকের সম্মতি ছিল না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার কথাও জানানো হয়েছে।

 প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ, মানবিক ও সম্ভাবনাময় সমাজ গড়ে তুলতে পারছি? তাদের স্বপ্নের ডানা মেলার আগেই যদি অনিশ্চয়তা তাদের পথ রুদ্ধ করে, তবে আগামী দিনের আলো জ্বালাবে কারা?

শান্তিবাহিনী আমলে আমাদের সমাজে নিজস্ব সামাজিক নেতৃত্ব ও বিরোধ মীমাংসার একটি কাঠামো ছিল। সময়ের পরিবর্তনে, বিশেষত পার্বত্য চুক্তির পর, ইউপিডিএফ গঠন হওয়ার আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নানা রূপান্তর ঘটেছে। আজ জেএসএস, জেএসএস (এনএন লারমা), ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের (বন ও পার্বত্য) মধ্যে মতপার্থক্য ও বিভাজন রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, রাজা-কারবারি ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান। মতের ভিন্নতা স্বাভাবিক; কিন্তু সেই ভিন্নতা যদি সমাজের প্রতি অভিন্ন দায়িত্ববোধকে আড়াল করে, তবে তা আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।

আলোচিত ঘটনাগুলো ইউপিডিএফ-প্রভাবিত এলাকায় ঘটেছে। তাই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের উচিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। আমি কে জেএসএস, কে ইউপিডিএফ সেই পরিচয়ের হিসাব কষতে চাই না। আমার কাছে বড় হয়ে ওঠে অন্য একটি প্রশ্ন, কে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে বা অধিকার প্রতিষ্ঠার ভূমিকা রাখছে? অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যদি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বপ্নকে সুরক্ষা দিতে না পারে, তবে সেই সংগ্রামের পূর্ণতা কোথায়?

আজকের কিশোরী ও তরুণীরাই আগামী দিনের শিল্পী, শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা সমাজের পথপ্রদর্শক। একটি কুঁড়ি যেমন একদিন প্রস্ফুটিত হয়ে চারদিকে সুবাস ছড়ায়, তেমনি একটি শিশুর প্রতিভাও একদিন জাতির গৌরব হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু অবহেলা, অনিশ্চয়তা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেই সম্ভাবনা ঝরে গেলে ক্ষতি শুধু একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; শূন্যতা তৈরি হয় সমগ্র জাতির ভবিষ্যতে।

তাই যারা জাতির অধিকার ও মুক্তির কথা বলি, তাদের আত্মজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন, আমরা কি নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন রক্ষায় যথেষ্ট আন্তরিক? রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, মর্যাদা ও স্বাধীন বিকাশ নিশ্চিত করতে পারছি কি?

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে নির্মিত হয় না; নির্মিত হয় তার সন্তানদের নিরাপদ শৈশব, বিকশিত প্রতিভা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিতের ওপর। সেই ভিত দুর্বল হয়ে পড়লে অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও একদিন অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।

আজ তাই সময়ের দাবি, বিভেদের দেয়াল পেরিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সংস্কৃতির মানবিক ভিত্তিকে শক্ত করা এবং আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সযত্নে রক্ষা করা। কারণ, একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম; তাদের হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে নিজের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের হাতে সমর্পণ করা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা