শান্তি প্রিয় চাকমা: ভাষা, সাহিত্য ও সমাজচেতনায় একজন মানুষ- ইনজেব চাঙমা
১৯৮২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার জুরাছড়ি উপজেলার ৪ নম্বর দুমদুম্যা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ডানে তেছড়ি গ্রামে শান্তি প্রিয় চাঙমার জন্ম। তাঁর পিতা স্নেহ রঞ্জন চাঙমা এবং মাতা বিনতা চাঙমা। ছয় ভাই ও এক বোনের পরিবারে তিনি তৃতীয় সন্তান। শৈশব থেকেই পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা তাঁর জীবনবোধ গঠনে ভূমিকা রেখেছে। জন্মভূমির প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্য তাঁর চিন্তা ও আগ্রহের জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে বলে অনুমান করা যায়।
তিনি ২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) শিক্ষা সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে তিনি রাঙামাটি সদর উপজেলার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাঙাপানি এলাকায় লুম্বিনী গেটসংলগ্ন স্থানে বসবাস করেন।
ব্যক্তিজীবনে শান্তি প্রিয় চাকমা পরিবারপ্রেমী মানুষ। তাঁর স্ত্রী অর্চনা চাকমা একজন শিক্ষক। তাঁদের একমাত্র ছেলে সৌগত চাকমা। পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তিনি জীবন অতিবাহিত করছেন।
শান্তি প্রিয় চাঙমার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুরাছড়ি উপজেলা সদর বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্য, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সম্পাদক এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে সংগঠনটির নাম উল্লেখ না থাকায় তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকার পূর্ণ পরিচয় এখানে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন তাঁর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।
সমাজের শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামষ্টিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০০৫–২০০৬ সালে তিনি বর কলক বেসরকারি জুনিয়র হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ভূমিকা রাখেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে, তিনি যক্ষাবাজার বহুমুখী সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততা স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহের পরিচায়ক।
এ ছাড়া, জুরাছড়ি উপজেলার গুইছড়িতে অবস্থিত আর্যচুগ ধুতাঙ্গ বিমুক্ত বিহারের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও তাঁর নাম উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা, সমবায় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা থেকে বোঝা যায়, তাঁর কর্মপরিসর কেবল ব্যক্তিগত জীবিকা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন পরিসরে অবদান রাখার আকাঙ্ক্ষাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
শান্তি প্রিয় চাকমার সাহিত্যিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি তাঁর মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ। ২০২৩ সালে চাঙমা ভাষায় বাংলা অক্ষরে রচিত তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘নকভাচ্’ প্রকাশিত হয়। বইটি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত স্মার্ট প্রিন্টার্স থেকে মুদ্রিত হয়। মাতৃভাষায় কবিতার বই প্রকাশ তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
একটি ভাষার সাহিত্য কেবল শব্দ ও বাক্যের সমষ্টি নয়; এর মধ্যে ধারণ করা থাকে একটি জনগোষ্ঠীর অনুভূতি, জীবনদর্শন, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সে বিবেচনায়, চাকমা ভাষায় সাহিত্যচর্চা ভাষাটির লিখিত সাহিত্যভান্ডার সমৃদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা। বাংলা অক্ষর ব্যবহার করে চাঙমা ভাষায় কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ভাবনা ও অনুভূতিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।
তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও গবেষণা। পাশাপাশি ভ্রমণের প্রতিও তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে। ভ্রমণ মানুষকে নতুন ভূপ্রকৃতি, জীবনধারা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহের সঙ্গে ভ্রমণপ্রবণতা যুক্ত হলে তা একজন মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। তবে তাঁর গবেষণামূলক কাজের নির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া না যাওয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
শান্তি প্রিয় চাঙমার জীবনকে ব্যবসা, সমাজকর্ম ও সাহিত্যচর্চার সমন্বিত পরিসরে দেখা যায়। একদিকে জীবিকার তাগিদে ব্যবসা পরিচালনা, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমবায় সমিতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, তাঁর বহুমুখী কর্মজীবনের পরিচয় বহন করে। এর পাশাপাশি মাতৃভাষায় কবিতার বই প্রকাশ তাঁর সাহিত্যপ্রীতি ও সাংস্কৃতিক অনুরাগের প্রকাশ।
ভাষা ও সংস্কৃতি কোনো জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করা মানে নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে নিজস্ব ভাষিক পরিসরে ধরে রাখার চেষ্টা। শান্তি প্রিয় চাকমার ‘নকভাচ্’ প্রকাশনা সেই প্রচেষ্টার একটি স্মরণীয় অধ্যায়। ভবিষ্যতে তাঁর সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত হোক, চাকমা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর আগ্রহ নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুক, এ প্রত্যাশা রইল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন