চাকমা ভাষা: স্বাতন্ত্র্য, আত্মপরিচয় ও আত্মবিস্মৃতির সংকট - ইনজেব চাঙমা
ভাষা কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক। ভাষার মধ্যেই বেঁচে থাকে একটি জাতির অতীত, তার জীবনবোধ ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। তাই নিজের ভাষাকে অবহেলা করা মানে কেবল কয়েকটি শব্দ বা বর্ণকে হারিয়ে ফেলা নয়, বরং নিজের ইতিহাস ও পরিচয়ের একটি অংশকে বিস্মৃত হওয়া।
চাঙমা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা মত ও বিতর্ক চলে আসছে। মোঃ আবদুল আউয়ান বলেছেন, “চাকমা উপভাষা নয়, একটি পৃথক ভাষা বটে।” ড. অশোক বিশ্বাসের বক্তব্যেও চাকমা ভাষার স্বতন্ত্র সত্তার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, চাকমা ভাষা ইন্দো-আর্য ও মঙ্গোলীয়-ভোটো-বর্মী ভাষার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ভাষা।
চাকমা বর্ণমালা বা অঝাপাতের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়েও গবেষকদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। ড. গ্রিয়ারসনের বক্তব্য অনুযায়ী, চাঙমা ও শান বর্ণমালা একই উৎস থেকে বিকশিত হয়েছে। অন্যদিকে, বঙ্কিম চন্দ্র চাঙমার মতে, চাকমা বর্ণমালায় একসময় ৩৩টি বর্ণ ছিল; পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে আরও কিছু বর্ণ যুক্ত হয়েছে।
ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। ভাষা ও বর্ণমালা আছে বিধায় এটি থাকা স্বাভাবিক। তবে আমর প্রশ্ন জাগে, যে ভাষার স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এত কথা বলি, সেই ভাষা ও তার ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিজেরা কতটা সচেতন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের চারপাশের স্থাননাম ও প্রতিষ্ঠানের নামগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খাগড়াছড়ি থেকে পানছড়ির পথে দেখা যায় ‘ভাইবোনছড়া’ নামটি। প্রশ্ন হলো, স্থানটির আদি নাম কি সত্যিই ‘ভাইবোনছড়া’ ছিল? একইভাবে রয়েছে ‘নালকাটা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামটি, অথচ স্থানীয় ভাষায় প্রচলিত নাম ‘নালকাবা’ হলে সেই নামের মূল রূপ সংরক্ষণের দায় কি আমাদের নেই?
এগুলো কেবল নামের পার্থক্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ভাষা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। একটি স্থাননামের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া পরিচয়, কোনো জনপদের ইতিহাস কিংবা স্থানীয় ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। সেই নাম পরিবর্তিত হলে তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ।
সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বৌদ্ধবিহারের নাম বাংলা ভাষায় লেখা। বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা; এর প্রতি শ্রদ্ধা ও মর্যাদা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে গিয়ে নিজেদের ভাষার নাম ও ঐতিহ্যকে আড়াল করে রাখা কি জরুরি? এটির অবহেলার কারণ হওয়া উচিত নয়।
এ অবস্থার জন্য কি কেবল সরকারকে দায়ী করা যায়? আমার মতে, না। কারণ, সব ক্ষেত্রে স্থানীয় নাম পরিবর্তনের জন্য সরকার আমাদের বাধ্য করেনি। অনেক সময় আমরাই নিজেদের উদ্যোগে স্থানীয় নামের পরিবর্তে বাংলা নাম গ্রহণ করেছি। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, অথচ চাকমা-অধ্যুষিত অঞ্চলেও সেসব প্রতিষ্ঠানের নামকরণে নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন কতটা ঘটছে, তা ভেবে দেখা দরকার। অতএব, এই আত্মবিস্মৃতির দায় কেবল অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও বৈষম্যহীন সমাজের প্রত্যাশা জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশার আলোকে সব জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। বৃহত্তর সমাজব্যবস্থার প্রভাবের পাশাপাশি আমরাও অনেক সময় প্রচলিত ধারার অনুসারী হয়ে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রয়োজন ভুলে যাই। অথচ নিজের পরিচয় টিকিয়ে রাখতে হলে আগে নিজের পরিচয়ের প্রতি সচেতন হতে হয়।
চাঙমা ভাষা সংরক্ষণের জন্য তাই শুধু স্বীকৃতির দাবি জানালেই চলবে না; প্রয়োজন এর নিয়মিত চর্চা, সাহিত্য প্রকাশ, বর্ণমালার ব্যবহার এবং স্থানীয় নামের যথাযথ সংরক্ষণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বৌদ্ধবিহার ও জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থানে চাঙমা বা স্থানীয় ভাষায় নাম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
যে জাতি নিজের ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি উদাসীন, সে একসময় নিজের পরিচয় নিয়েই সংকটে পড়ে। তাই চাকমা ভাষার স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি কেবল একটি ভাষার স্বীকৃতির প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। নিজের ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা, আর নিজের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে নিজেদের পরিচয়ের প্রদীপ তুলে দেওয়া।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন