চাঙমা সাহিত্য ও ভাষা নিয়ে নন্দলাল শর্মার এই কথাগুলো আজও আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর বক্তব্যের সময় থেকে বর্তমান সময়ের মধ্যে প্রযুক্তির পৃথিবী আমূল বদলে গেছে। বদলেছে লেখার মাধ্যম, প্রকাশনার ধরন, যোগাযোগের পথ। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, সুযোগ যত বেড়েছে, আমাদের অনেক কবি-সাহিত্যিকের চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় যেন ততটা বাড়েনি।
একসময় চাঙমা বর্ণমালায় লেখা ছিল কঠিন। হাতে লিখতে হতো, ছাপার অক্ষর সহজলভ্য ছিল না, বই প্রকাশের সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে একজন লেখক চাঙমা ভাষায় লিখতে চাইলেও নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতেন। কিন্তু আজ সেই বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে।
আজ চাঙমা বর্ণমালা কম্পিউটার ও অনলাইন মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কীবোর্ডে লেখা যায়, এক লিপি থেকে অন্য লিপিতে রূপান্তরের জন্য কনভার্টার ব্যবহার করা যায়, ডিজিটাল মাধ্যমে লেখা সংরক্ষণ করা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। অর্থাৎ প্রযুক্তি আজ আমাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। যে অজুহাতগুলো একসময় বাস্তব ছিল, তার অনেকগুলোই এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সেই সুযোগটি গ্রহণ করছি?
আজকের একজন চাঙমা কবি বাংলা ভাষায় কবিতা লিখছেন, একজন সাহিত্যিক বাংলায় গল্প-প্রবন্ধ লিখছেন, গবেষক বাংলায় নিজের ভাবনা প্রকাশ করছেন। বাংলা ভাষায় লেখার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বাংলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু নিজের ভাষা ও নিজের বর্ণমালার জায়গাটি কি তার ফলে হারিয়ে যাবে?
একজন লেখক যদি নিজের মাতৃভাষার সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন, অথচ সেই ভাষার নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে তাঁর পরিচয় না থাকে, তাহলে সেখানে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। ভাষাকে ভালোবাসা শুধু ভাষায় কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভাষার লিখিত রূপকেও নিজের করে নেওয়া তারই অংশ।
চাঙমা বর্ণমালা কেবল কিছু অক্ষরের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাস, স্মৃতি, সাহিত্য, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। পূর্বপুরুষেরা যে অক্ষরে নিজেদের কথা লিখে গেছেন, সেই অক্ষর যদি পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষিত সমাজের কাছেই অপরিচিত হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু একটি লিপির সংকট নয়—এটি উত্তরাধিকার হারানোরও সংকেত।
সবচেয়ে বেশি ভাবায় আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের অবস্থান। যাঁরা ভাষা ও সংস্কৃতির কথা লেখেন, যাঁরা চাঙমা জাতিসত্তা ও ঐতিহ্য নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন, তাঁদের কাছেই যদি চাঙমা বর্ণমালা অপরিচিত থাকে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে তৈরি হবে?
অবশ্যই কাউকে বাংলা বা ইংরেজিতে লেখার জন্য দোষারোপ করার প্রশ্ন নেই। বহু ভাষায় লেখালেখি করা বরং একজন লেখকের শক্তি। কিন্তু নিজের ভাষার সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নিজের লিপির প্রতিও ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। কারণ অন্যের ভাষা শেখা আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে, আর নিজের ভাষা ও লিপিকে ধারণ করা আমাদের শিকড়কে শক্ত করে।
আজ প্রয়োজন চাঙমা বর্ণমালাকে কেবল অতীতের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের লেখার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা। কবিতা লেখা হোক চাঙমা বর্ণমালায়, গল্প লেখা হোক, শিশুদের বই প্রকাশিত হোক, অনলাইন পত্রিকা ও ওয়েবসাইটে লেখা প্রকাশিত হোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত চাঙমা বর্ণমালার ব্যবহার বাড়ানো হোক। তরুণ প্রজন্মের হাতে মোবাইল ফোন আছে, কম্পিউটার আছে, ইন্টারনেট আছে—এখন প্রয়োজন শুধু আগ্রহ ও উদ্যোগ।
নন্দলাল শর্মা যখন লিখেছিলেন, তখন চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের সামনে প্রধান বাধাগুলোর একটি ছিল সুযোগের সীমাবদ্ধতা। আজ সেই সীমাবদ্ধতার অনেকটাই প্রযুক্তি দূর করে দিয়েছে। তাই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন “সুযোগ আছে কি না” নয়; বরং “আমরা সুযোগটি ব্যবহার করছি কি না।”
চাঙমা বর্ণমালার ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার ব্যবহারকারীর ওপর। একজন কবি যখন নিজের কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি চাঙমা বর্ণমালায় লেখেন, একজন লেখক যখন নিজের গল্প নিজের লিপিতে প্রকাশ করেন, একজন শিক্ষক যখন নতুন প্রজন্মকে সেই অক্ষর শেখান, তখনই একটি লিপি বেঁচে থাকার নতুন শক্তি পায়।
আমাদের সামনে আজ এক বিরল সুযোগ এসেছে। অতীতের উত্তরাধিকার এবং বর্তমানের প্রযুক্তি, দুটিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ। এই সুযোগ হারানো মানে শুধু কয়েকটি অক্ষর হারানো নয়; হারানো মানে নিজের সাহিত্যিক স্মৃতির একটি দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া।
তাই এখন সময় এসেছে নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর। চাঙমা বর্ণমালাকে শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, কবিতার খাতায়, বইয়ের পাতায়, মোবাইলের পর্দায় এবং অনলাইনের প্রতিটি সম্ভাব্য জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
কারণ একটি ভাষা তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন তার মানুষ সেই ভাষায় কথা বলে, লেখে, পড়ে এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়।
সুযোগ আজ আমাদের সামনে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি সেই সুযোগকে ইতিহাসে পরিণত করব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবন্ত উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাব?

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন