“সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” আসলে কী? - ইনজেব চাঙমা

আজ এই প্রশ্নটি আমার মনে খুব বেশি দোলা দিচ্ছে, “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” আসলে কী? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সারাদেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও গ্রাফিতি অঙ্কনের মাধ্যমে প্রতিবাদ শুরু হয়। বিভিন্ন স্থানে গ্রাফিতি অঙ্কনের উদ্যোগ শুরু হয়। তবে একটি বিষয় শুরুতেই বলে রাখা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্রাফিতি অঙ্কনের চিন্তা ২০২৪ সালের পর থেকেই শুরু হয়েছিল, বিষয়টি এমন নয়। এরও আগে আমাদের সংগঠ “চাঙমা সাহিত্য একাডেমি” তখন নাম ছিল “নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ” মধ্যে একটি আলোচনা হয়েছিল- বিহার, স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালে অঝাপাত বা চাঙমা বর্ণমালা অঙ্কন করা হবে। উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালাকে শিক্ষার্থীদের সামনে দৃশ্যমান করে তোলা। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তখন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালের পর যখন সারাদেশে গ্রাফিতি অঙ্কনের একটি নতুন জোয়ার সৃষ্টি হলো, তখন মনে হলো, এবার হয়তো সবার কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যাবে। সেই চিন্তা থেকেই ১৫ জুলাই ২০২৪ আমি ফেসবুকে দীঘিনালায় গ্রাফিতি অঙ্কনের জন্য পোস্ট দিই।

১০ আগস্ট ২০২৪, শনিবার, আমি বাবুছড়া মুখ হাই স্কুলে চাঙমা ভাষা-বর্ণমালা কোর্স ও বই পড়ানোর কাজে যাই। যাওয়ার আগে দীপালক্ষ দাকে ফোন করেছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম, সেদিন তাঁর বাড়িতে দুপুরের খাবার খাব। কারণ বিকেলে উদালবাগান হাই স্কুলে চাঙমা ভাষা কোর্স ও বই পড়ানোর কর্মসূচি ছিল। তাঁর বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করলে সময়ের সমস্যা হবে, এই চিন্তা থেকেই দুপুরের খাবার তাঁর বাড়িতে খাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে একটি নতুন খবর শুনলাম। জানতে পারলাম, তার আগের দিন, ৯ আগস্ট ২০২৪, শুক্রবার দীঘিনালা বড়াদম হাই স্কুলে একটি আলোচনা সভা হয়েছে। আঞ্চলিক দলগুলোকে “এগত্তর” করার জন্য এই আলোচনা সভা হয়েছিল বলে জানতে পারি।

পরে দেখি, তিনটি মোটরসাইকেলে ৫–৬ জন লোক এলাকায় ঘোরাফেরা করছেন। তাঁরা তখনও আমাকে “এগত্তর”-এর গল্প শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কয়েকদিন পর বড় ধরনের একটি সমাবেশ করা হবে। সেখানে আমার সহযোগিতা চাই। তাঁদের মধ্যে দুজনের নাম আমি জানতাম-দীপন চাঙমা ও বার্জেস চাঙমা। তখন আমি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিইনি।

১১ আগস্ট ২০২৪ বিকেলে দীঘিনালা কলেজে আমরা কয়েকজন গ্রাফিতি অঙ্কনের বিষয়ে আলোচনা করার জন্য মিলিত হলাম। যতদুর মনে পরে জেনিট, কেলেন, দীপ্ত, নভেল, দিঘীনালা পিসিপি পক্ষ থেকে রনেল সহ বেচ ১০/১৫ জন (সবার নাম স্মরণ না থাকার দুঃখ প্রকাশ করছি)। আমরা তখন গ্রাফিতি অঙ্কনের বাজেট, দায়িত্ব ও কাজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঠিক তখনই তাঁরাও সেখানে উপস্থিত হলেন।

তাঁদের দেখে তাঁরা খুবই উৎফুল্ল, উৎসাহ মনে হলো। কিন্তু আমরা যে বিষয়ে আলোচনা করছিলাম, সেটি শেষ হওয়ার আগেই তাঁরা তাঁদের আলোচনার বিষয়টি সামনে আনতে শুরু করলেন। তখন আমি বললাম-  “আচ্ছা, আগে আমরা যে বিষয়ে আলোচনা করছি, তা শেষ করি। এরপর আপনাদের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারো।”

আমরা প্রথমে গ্রাফিতির বাজেট ঠিক করলাম। প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হলো জেনিট চাঙমাকে। আমার চাঙমা সাহিত্য একাডেমির পক্ষ থেকে ২,০০০ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। দীঘিনালা পিসিপি, জেএসএস (লারমা গ্রুপ), গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ -এর পক্ষ থেকেও সহযোগিতা নিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজটি শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর তাঁরা “এগত্তর” প্রসঙ্গ শুরু করলেন।

তখন আমি আমার বক্তব্য খুব স্পষ্ট করে বলেছিলাম- “এগত্তর” হচ্ছে চাঙমা শব্দ। বাংলায় এর সঠিক অর্থ কী হবে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। তবে তাঁরা শব্দটিকে ঐক্য অর্থে ব্যবহার করছিলেন। সেখানেই আমার প্রশ্ন ছিল-  এগত্তর বা ঐক্য আমি কোথায় হবো? আমাদের তো দুটি দাবি রয়েছে- ১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। ২. পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন।

এখন প্রশ্ন হলো- এই দুটি দাবির মধ্যে কোথায় আমাদের “এগত্তর” বা ঐক্য হবে? তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম আমি জানতাম, সেই দীপন দা ও বার্জেস চাঙমা এবং অন্যদের কাছে আমি জানতে চাইলাম, ঐক্যের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভিত্তি কী? তাঁরা বললেন, আমরা গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কমিটি করব। আলোচনা করব। এরপর রাজপথে নামব। তাঁদের কথা শুনে আমি আর দেরি না করে দীপন দাকে প্রশ্ন করলাম- “কত কোটি টাকা ফান্ড আছে?” আমার প্রশ্নের কারণ ছিল খুব বাস্তব। আন্দোলন করব, মিটিং করব, কিন্তু আন্দোলনে অনেকে গ্রেপ্তার হতে পারে, জেল-হাজতে যেতে পারে, অপহরণ হতে পারে, অনেকে হয়রানির শিকার হতে পারে। তাঁদের পরিবার-পরিজনের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও তো ভাবতে হবে। আমি সেই প্রশ্নই করেছিলাম।

কিন্তু তাঁরা আমার প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দেননি; বরং বিষয়টি এড়িয়ে যান। আমার এই কথা মনে হয় তাঁদের ভালো লাগেনি। মূলত তাঁরা পরদিন একটি আলোচনা সভা আয়োজন করেছিলেন। আমাদের মিটিংয়ে তাঁরা এসেছিলেন সেই বিষয়ে অবগত করার জন্যও।

সেদিন তাঁরা আরও বলেছিলেন, তাঁরা নাকি দীঘিনালা জেএসএস-গণতান্ত্রিক ও সুশীল সমাজের সঙ্গে “এগত্তর” বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং সেখান থেকে সাড়াও পেয়েছেন। আমি বিষয়টিকে তখন ভালো উদ্যোগ হিসেবেই দেখেছিলাম।

এরপর ১২ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত দীঘিনালায় গ্রাফিতি অঙ্কন হয়। এর মধ্যেই খবর আসে, খাগড়াছড়িতে গ্রাফিতি অঙ্কনের সময় বাধা দেওয়া হচ্ছে। খাগড়াছড়িতে গ্রাফিতি অঙ্কনে বাধা দেওয়ার খবর আমাদের মধ্যে আরও আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি করে। এরপর আমরা হিমু চাঙমা আহ্বানে একটি পিআপ গাড়ি নিয়ে ১৮ আগস্ট ২০২৪ লংগদুতে গ্রাফিতি অঙ্কন করতে যাই।

আগস্টের শেষ সপ্তাহে আমাকে খবর দেওয়া হলো- কেন্দ্র থেকে ছাত্ররা আসবে এবং একটি মিটিং হবে নারিকেলবাগান গ্রামে। আমার খুব আগ্রহ কে এই ছাত্ররা। আমি যথাসময়ে সেই মিটিংয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, হিরো চাঙমা নামে বাবুছড়ার একজন ছেলে এসেছে। তাঁর সঙ্গে সেটিই ছিল আমার প্রথম দেখা। মিটিংয়ে আমরা প্রায় ৮–১০ জন ছিলাম। জুনান, দীপ্ত, কেলেন, জয় (সবার নাম মনে পড়ছেনা) সহ আরো অনেকে।  সেদিনও আমি “এগত্তর” সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাই।

আমি স্পষ্ট করে বলেছিলাম,  এগত্তর বা ঐক্য হতে হলে আমাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গা প্রয়োজন। সেটি হতে পারে,  পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, অথবা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। আমি আমার অবস্থানও পরিষ্কার করে বলেছিলাম, আমার কাছে প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।

সেই সময় খাগড়াছড়ির কিছু কর্মসূচির স্লোগান নিয়েও আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। যেমন- সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক স্লোগান কিংবা “এ মুহূর্তে পাহাড় ছাড়” ধরনের ……….। আমার যুক্তি ছিল, আমরা ধনে-জনে হীন। আমাদের শক্তি সীমিত। তাই আবেগের পাশাপাশি কৌশলও প্রয়োজন।

আমরা ওই ধরনের স্লোগান না দিয়ে বলতে পারি- “অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।” কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির কথা বললে বা চুক্তি বাস্তবায়ন হলে তার ভেতরে অনেক বিষয়ই চলে আসে। চুক্তির সঙ্গে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার, ভূমি কমিশন, স্থানীয়দের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। সেকারণে কাউকে সরাসরি আক্রমণ বা অপমান না করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবিকে সামনে আনাই আমার কাছে বেশি কৌশলগত মনে হয়েছিল।

এরপর খাগড়াছড়িতে গ্রাফিতি অঙ্কনের সময় বাধা দেওয়ার ঘটনা আন্দোলনকে আরও জোরালো করে তোলে। এদিকে দীপন দাকে আর কোথাও খুঁজে পেলাম না। কিন্তু “এগত্তর” স্লোগান চলতে থাকল। আন্দোলনও চলতে থাকল।

এরপর এলো ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর ঘটনা। খাগড়াছড়িতে “১৪ মামলার আসামি” মো. মামুন মোটরসাইকেল চুরি করতে গিয়ে পালানোর সময় এক ব্যক্তি একটি খাম্বার সঙ্গে ধাক্কা খায়। পরে সে হাসপাতালে মারা যায়। সে ছিল একজন বাঙালি যুবক। খবর ছড়িয়ে পড়ে- চাঙমারা বাঙালি হত্যা করেছে। এরপর বাঙালিরা মিছিল শুরু করে। সেদিন আমি সোনাইসহ মাতৃভাষার কাজে পানছড়িতে গিয়েছিলাম।

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ দীঘিনালায় সকালে মিছিল হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিকেলে মিছিল হয়। সেই মিছিল থেকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নিপুয়্যা চাঙমার উদ্দেশে ইট নিক্ষেপ করা হয় বলে আমি জানতে পারি। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। দীঘিনালায় চাঙমাদের প্রাণ কেন্দ্র বটতলা বাজার পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সেই রাতেই খাগড়াছড়ি সদরে  দীঘিনালায় চাঙমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া এবং ধন রঞ্জন চাঙমার মৃত্যুর প্রতিবাদে মিছিল করে। এরপর মিছিলে সেনাবাহিনী গুলি চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। জুনান চাঙমা ও রুবেল ত্রিপুরা নিগত হন। অনেক মানুষ আহত হয়। পাহাড়ের পরিস্থিতি এক ভয়াবহ মোড়ে পৌঁছে যায়।

পরদিন, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, রাঙামাটিতে “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” মিছিল করে। মিছিলে উপর বাঙ্গালিরা আক্রমন করে। বাঙ্গালিরা সেদিন রাঙামাটি আঞ্চলিক পরিষদে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অনিক চাঙমা নিহত হন। খুব জঘন্য ভাবে হত্যা করা হয়।

একদিকে দীঘিনালা, অন্যদিকে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি- মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পাহাড় যেন আগুন ও আতঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” ৮ দফা দাবি উত্থাপন করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়। তাদের দাবির মধ্যে ছিল- “পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিহত করুন”। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, রাষ্ট্র সংস্কারে আদিবাসীদের মূল্যায়ন, অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, স্ব স্ব জাতিসত্তার স্বীকৃতিসহ আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং ৮ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। এর পাশাপাশি মব কিলিংয়ের বিচার, জুনান, রুবেল, ধন রঞ্জন ও অনিকসহ নিহত ব্যক্তিদের হত্যার বিচার, আহত-নিহতদের পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের ক্ষতিপূরণ, পার্বত্য চট্টগ্রামকে “পানিশমেন্ট জোন” না করা, আদিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ও গুজব না ছড়ানো এবং শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করা হয়।

এরপর আর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি ছিল, তিন পার্বত্য জেলার সকল সেটেলার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ৪ অক্টোবর বয়কট করার আহ্বান। এরপর ৬/৭ অক্টোবর (সঠিক তারিখটি আমার জানা নেই), কৃপায়ণ ত্রিপুরা এসে পাবলাখালী শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাজার বয়কটের বিষয়ে আলোচনা করেন।

এভাবে (২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫) আগুন, গুলি, গণধর্ষন, সড়ক অবরোধ, মিছিল, মিটিং, সমাবেষের মধ্য দিয়ে বিদায় নিলো বছরটি।

তাহলে “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” আসলে কী? এই প্রশ্নটিই আজ আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপরের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, প্রথমে ছিল গ্রাফিতি। তারপর এল “এগত্তর” বা ঐক্যের কথা। এরপর আন্দোলন, মিছিল, সংঘাত। এরপর নিহত মানুষের বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি- ৮ দফা। এরপর বাজার বয়কট।

এই পুরো সময় আমি খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি- এই আন্দোলনের পেছনে কোনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নটি বারবার সামনে এসেছে। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে আমার মনে হয়েছে, “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” একটি ছাত্র প্ল্যাটফর্ম হলেও এর সঙ্গে কোনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্টতা ছিল। আমি এটিকে তাই শুধু একটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখিনি। বিশেষ করে চাপের মুখে হোক বা কোনো কারণে যখন ছাত্রদের আন্দোলনের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আদিবাসী দাবিগুলো জোরালো হয়ে উঠল, তখন পরবর্তী সময়ে ইউপিডিএফের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড নিয়েও আমার মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। সে সময় ৭ অক্টোবর ২০২৪ ইউপিডিএফ এর খাগড়াছড়ি সংগঠক অগ্য মারমা যমুনা টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিল, আদিবাসী শব্দটা এনজিও দেওয়া একটি টার্ম।

তাই আমার পর্যবেক্ষণে একটি বিষয় ছিল, এ বছর (২০২৬) লারমার জন্মবার্ষিকী কিংবা আদিবাসী দিবসের মতো বিষয়গুলোতে তাদের পেজে কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য বা কর্মসূচি চোখে পড়েনি।  এ কারণেও আমার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, এই আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিমুখ আসলে কোথায়?

আমি এই লেখায় কোনো দূরের দর্শক হিসেবে কথা বলছি না। আমি সেই সময়ের ঘটনাগুলোর একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী ও পর্যবেক্ষক। আমি গ্রাফিতি অঙ্কনের সঙ্গে ছিলাম। আমি দীঘিনালা কলেজের সেই বৈঠকে ছিলাম। আমি “এগত্তর” নিয়ে প্রশ্ন করেছি। আমি অর্থের উৎস জানতে চেয়েছি। আমি নারিকেলবাগানের বৈঠকে ছিলাম। কৃপায়ন ত্রিপুরা যখন দিঘীনালাতে এসেছিল, তাঁকে নিয়ে জেএসএস (এমএন লারমা গ্রুফ) ও গণতান্ত্রিক কাছে যাওয়া সহযোগিতা করেছিলাম। আমি স্লোগান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছি। আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে ঐক্যের ভিত্তি করার কথা বলেছি। এরপর চোখের সামনে পরিস্থিতি বদলে যেতে দেখেছি। দেখা পাচ্ছি না সেই হিরো চাঙমা আর সেই কৃপায়ন ত্রিপুরাকে।

তাই আজ আমার প্রশ্ন, “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” আসলে কী? এটি কি শুধুই ২০২৪-এর পর জন্ম নেওয়া ছাত্র আন্দোলন?  এটি কি কেবল গ্রাফিতির দেয়াল থেকে উঠে আসা একটি প্রতিবাদী তরুণসমাজ? নাকি এর সঙ্গে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল? “এগত্তর” কি সত্যিই একটি সর্বজনীন ঐক্যের ডাক ছিল? যদি হয়ে থাকে, সেই ঐক্যের রাজনৈতিক ভিত্তি কী ছিল? আর যদি রাজনৈতিক ভিত্তি থাকে, তবে সেটি কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো একদিন আরও পরিষ্কার হবে।

কিন্তু আমার কাছে একটি বিষয় আজও পরিষ্কার- আন্দোলন যত বড়ই হোক, তার আগে প্রয়োজন লক্ষ্য নির্ধারণ। স্লোগান যত শক্তিশালীই হোক, তার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক কৌশল।

কারণ ইতিহাস শুধু মিছিলের হিসাব রাখে না। ইতিহাস হিসাব রাখে-  কে কোথায় দাঁড়িয়েছিল, কেন দাঁড়িয়েছিল, কী দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, কাদের নেতৃত্বে দাঁড়িয়েছিল, এবং সেই দাঁড়িয়ে থাকার মূল্য হিসেবে কত মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও সংসার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই হিসাবই একদিন বলে দেবে- “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন” আসলে কী ছিল।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা