শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পাহাড়ের শান্তি কি আবারও বন্দুকের ছায়ায়? পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাধান কতটা সম্ভব - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের মানচিত্রে যার শরীর সবুজ পাহাড়ে আঁকা, নদীর বাঁকে বাঁকে যার স্মৃতি, আর মানুষের মুখে মুখে যার ইতিহাস। সেই পাহাড়ের বুকে শান্তির যে স্বপ্ন একদিন অশ্রু, রক্ত ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছিল, তার নাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সেই চুক্তি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় দলিল নয়; এটি দীর্ঘ সংঘাতের পর দুই পক্ষের মধ্যে স্থাপিত একটি রাজনৈতিক সেতু। সেই সেতুর ওপারে ছিল শান্তির প্রত্যাশা, আর এপারে ছিল পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ভূমির প্রশ্ন, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং রাজনৈতিক অধিকারের আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু আজ, প্রায় তিন দশক পরে, সরকার যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন করে তিনটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যে চুক্তির মাধ্যমে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথ নির্ধারিত হয়েছিল, সেই পথের কতটুকু আমরা হেঁটেছি? আর কতটুকুই বা বাকি রয়ে গেছে?

১০ সেপ্টেম্বর রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকার সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, আইন ও বিধি পর্যালোচনা এবং জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের কথা বলেছে। উদ্দেশ্য হিসেবে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এসবই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব। কিন্তু পাহাড়ের মানুষকে শুধু নিরাপত্তার চোখে দেখলে পাহাড়কে দেখা হয় না; দেখা হয় কেবল তার অন্ধকারকে। অথচ পাহাড়েরও একটি দীর্ঘ স্মৃতি আছে, একটি রাজনৈতিক ইতিহাস আছে, একটি ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে, ভূমির সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা আছে।

পাহাড়ের সমস্যা কেবল বন্দুকের শব্দে জন্ম নেয়নি; তাই বন্দুকের নীরবতাই তার একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনে যে ইতিহাস, তার কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক প্রশ্ন। ফলে আজ যদি সেই সমস্যার সমাধানকে প্রধানত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলার কাঠামোয় আবদ্ধ করা হয়, তবে সংকটের শিকড়ের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।

নতুন নির্বাহী কমিটিতে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বড় উপস্থিতি রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি সেখানে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন রয়েছে, তাদের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে তাদের কণ্ঠ কতটা জোরে শোনা যাবে?

কারণ পাহাড়ের মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু শুধু নিরাপত্তা চায় না। তারা এমন এক নিরাপত্তা চায়, যেখানে ঘরের মাটির নিচে তার ভূমির অধিকার থাকবে; সন্তানের বিদ্যালয়ে তার ভাষার অস্তিত্ব থাকবে; তার সংস্কৃতি থাকবে মর্যাদার সঙ্গে; তার নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান থাকবে কার্যকর; এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকবে অবিশ্বাসের নয়, আস্থার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম তাৎপর্য এখানেই। চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি বিশেষ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর স্বীকৃতি দিয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, এসব প্রতিষ্ঠান নিছক দপ্তর নয়; এগুলো পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নির্মিত প্রতিষ্ঠান।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কথা ছিল, সেগুলোকে পূর্ণ ক্ষমতা ও কার্যকর এখতিয়ার না দিয়ে নতুন নতুন কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন কেন?

একটি ঘরের ভিত্তি দুর্বল রেখে তার ওপর নতুন বারান্দা বানালে ঘর সুন্দর দেখাতে পারে, কিন্তু নিরাপদ হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন রেখে নতুন কর্মকৌশল যতই আকর্ষণীয় হোক, তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

আর পাহাড়ের সবচেয়ে জটিল ক্ষত, ভূমি। ভূমি সেখানে কেবল মাটি নয়। ভূমি মানে ঘর, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, জুমের ধোঁয়া, শ্মশান, বৌদ্ধবিহার, পাহাড়ি ঝিরি, ফলের বাগান, একটি মানুষের অস্তিত্বের দীর্ঘ ইতিহাস। তাই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ছাড়া পাহাড়ে শান্তির কথা বলা অনেকটা নদীর উৎস বন্ধ রেখে মোহনায় জল খোঁজার মতো।

এ কারণেই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যকর ভূমিকা এবং প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনকে জাতীয় কর্মকৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। নিরাপত্তা দিয়ে কোনো মানুষের হারানো ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না; আইনশৃঙ্খলা দিয়ে কোনো পরিবারের উচ্ছেদের ক্ষত মুছে ফেলা যায় না।

আরও একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে, পাহাড়ের উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি? রাস্তা হয়েছে, ব্রিজ হয়েছে, ভবন হয়েছে, এসব উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন। কিন্তু উন্নয়ন যদি মানুষের আত্মপরিচয়কে দুর্বল করে, তার ভাষাকে প্রান্তে ঠেলে দেয়, তার রাজনৈতিক অধিকারকে সংকুচিত করে, তার ভূমির নিরাপত্তা অনিশ্চিত রাখে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা মানুষের উন্নয়ন?

মানুষকে বাদ দিয়ে মানুষের জন্য উন্নয়ন করা যায় না। সরকারের নতুন কমিটিগুলো তাই চাইলে একটি ঐতিহাসিক সুযোগে পরিণত হতে পারে। তারা চাইলে পাহাড়ের ওপর আরেকটি প্রশাসনিক ছায়া ফেলতে পারে; আবার চাইলে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোকে সত্যিকার অর্থে সমাধানের টেবিলে আনতে পারে।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রতিটি ধারার বাস্তবায়ন কতদূর হয়েছে, কোথায় বাধা, কেন বাধা এবং কীভাবে তা দূর করা যায়, তার একটি স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য মূল্যায়ন।

এরপর প্রয়োজন আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদকে কার্যকর করা, ভূমি বিরোধের দ্রুত ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি, প্রত্যাগত শরণার্থী ও উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন এবং পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

নতুন আইন প্রয়োজন হলে আইন হোক। সংস্কার প্রয়োজন হলে সংস্কার হোক। কিন্তু সেই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য যেন চুক্তিকে দুর্বল করা না হয়; বরং চুক্তির অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব জীবনে পৌঁছে দেওয়া হয়।

কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সেনাশক্তিতে নয়; তার অঙ্গীকার রক্ষার সক্ষমতায়ও। আজ পাহাড়ের মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো শ্লোগান নয়, নতুন কোনো কমিটি নয়, নতুন কোনো কাগুজে প্রতিশ্রুতিও নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যেখানে পাহাড়ের মানুষ অনুভব করবে, তাদের কথা শোনা হচ্ছে, তাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করা হচ্ছে না, তাদের অধিকারকে নিরাপত্তার নামে সংকুচিত করা হচ্ছে না।

আমরা সন্ত্রাস চাই না। আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদ চাই না। আমরা সীমান্তের অরক্ষিত অবস্থা চাই না। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা এমন শান্তিও চাই না, যার নিচে চাপা পড়ে থাকে মানুষের অধিকার, ভূমির বেদনা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

পাহাড়ের শান্তি যদি সত্যিই চাই, তবে পাহাড়ের মানুষের আস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেই আস্থার দরজা খোলার চাবি নতুন কোনো প্রজ্ঞাপনে নয়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে।

তাই আজ প্রশ্নটি সরকারের প্রতি নয়, রাষ্ট্রের বিবেকের প্রতিও—
পাহাড়কে কি আমরা কেবল নিরাপত্তার মানচিত্রে দেখব, নাকি মানুষের ইতিহাসের মানচিত্রেও দেখব?

পাহাড়কে যদি শুধু একটি সীমান্তভূমি হিসেবে দেখা হয়, সেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু পাহাড়কে যদি মানুষসহ একটি জীবন্ত ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হয়, তবেই সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

কারণ পাহাড়ের শান্তি পাহাড়ের মানুষের হৃদয় জয়ের মধ্য দিয়েই আসে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে সামনে রেখেই হোক পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন পথচলা।

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কবি ও গবেষক সলিল রায় : পাহাড়ের স্মৃতির এক প্রহরী - ইনজেব চাঙমা

কর্ণফুলী দুলি দুলি, কুধু যেবে কনা

যেদুন চাং মুই সমারে, মরে নেযানা।

কর্ণফুলী বয়ে যায়। পাহাড়ের বুক চিরে, জনপদের স্মৃতি পেরিয়ে, কাপ্তাইয়ের জলরাশির ওপর দিয়ে তার নিরন্তর যাত্রা। অথচ এই প্রবহমানতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিস্মৃত ভূগোল, ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ি, হারিয়ে যাওয়া জনপদ, শৈশবের উঠোন আর অসংখ্য মানুষের স্মৃতি। নদী তার হিসাব রাখে না; কবি রাখেন। ইতিহাসের যে অংশ দলিলের ভাষায় ধরা পড়ে না, কবিতা কখনো কখনো তারই সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।

সলিল রায় ছিলেন সেই বিরল সাক্ষীদের একজন।

তাঁর আরেকটি গানের পঙ্ক্তি

মড়োত কি সং জাগাত

যিয়োত আমি থেদং সাত।

এই উচ্চারণের মধ্যে যেন পাহাড়ি জীবনের গভীর কোনো সুর নিহিত, প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, মানুষ এবং অস্তিত্বের অনিবার্য টান। চাঙমা ভাষার গান কবিতায় তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতিকে বৃহত্তর জনজীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। চাঙমা আধুনিক কবিতার তৃতীয় পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য রচনা হিসেবে আলোচিত দুরত যেইচ সোরি তাঁর কবিসত্তার আরেকটি স্বাক্ষর। রবীন্দ্রসংগীত চাঙমা ভাষায় অনুবাদের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা চাঙমা ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যেও নির্মাণ করেছিলেন এক সৃজনশীল সেতু।

কবি হিসেবে তাঁর পরিচয়ই সবচেয়ে উজ্জ্বল হলেও সলিল রায় ছিলেন একই সঙ্গে গবেষক, অনুবাদক, সাংবাদিক সমাজকর্মী। তাঁর জীবন সাহিত্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম; কারণ ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, সময়ের ইতিহাস এবং পাহাড়ের মানুষের জীবন তাঁর সৃষ্টিতে পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।

সলিল রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৭ জুন ১৯২৮ সালে চাকমা রাজবাড়িতে। তিনি ছিলেন চাকমা রাজকুমার রমনীমোহন রায় সরসীবালা রায়ের কনিষ্ঠ সন্তান। রাজপরিবারের উত্তরাধিকার তাঁর জন্মপরিচয়কে মর্যাদা দিলেও জীবনযাপনে তিনি ছিলেন নিরহংকার অনাড়ম্বর। বিশেষ পরিচয়ের সুবিধার চেয়ে নিজের যোগ্যতা শ্রমের ওপর তাঁর আস্থা ছিল বেশি।

শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠেন। ১৯৩৫ সালে রাণী বিনিতা রায়ের পরিচালনায় চাকমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত গৈরিকা সাহিত্যপত্র সেই পরিবেশের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এই সাহিত্যিক পরিমণ্ডল কিশোর সলিলের মননে যে বীজ বপন করেছিল, পরবর্তী জীবনের সাহিত্যচর্চায় তারই বিকাশ দেখা যায়।

রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে নবম শ্রেণির ছাত্র সলিল রায়ের প্রথম কবিতা রবীন্দ্র স্মৃতি প্রকাশিত হয় গৈরিকা-য়। ১৯৪৯ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং একই বছর সুনীতা রায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হলেও প্রায় এক বছর পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টেনে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত চাকমা রাজবাড়ির ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। ১৯৫২৫৫ সালে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-এর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক Accredited Correspondent হিসেবে কাজ করেন। পরে ইস্পাহানি কোম্পানি, ঠিকাদারি পেশা এবং ১৯৬২ সালের আগস্ট থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে ১৯৮১ সালের শুরুতে বাবু সুবিমল দেওয়ানের একান্ত সচিব নিযুক্ত হন।

১৫ জুন ১৯৮১ সালে রাঙ্গামাটির কালিন্দিপুরে নিজ বাসভবনে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

কর্মজীবনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সভাপতি, প্রকল্পনা সাহিত্যাঙ্গনের সহ-সভাপতি এবং বিভিন্ন সাহিত্য, শিল্প ফোকলোর প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে তিনি কাজ করেছেন। রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

সলিল রায়ের কবিতার শুরু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে, কিন্তু তাঁর কবিসত্তা ক্রমে নিজস্ব ভূগোলের দিকে ফিরে যায়। রবীন্দ্র স্মৃতি ছিল কিশোর কবির প্রথম প্রকাশিত কবিতা৩২ পঙ্ক্তির একটি শোকগাথা। আঠার মাত্রার পয়ার ছন্দে রচিত এই কবিতায় বয়সের আবেগের সঙ্গে ভাষা ছন্দের স্বাভাবিক দক্ষতার পরিচয় মেলে।

পঞ্চাশ ষাটের দশকের তাঁর বহু কবিতা আজ আর সহজে সন্ধানযোগ্য নয়। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রচনাগুলো থেকে তাঁর সাহিত্যিক পরিসরের একটি ধারণা পাওয়া যায়। গৈরিকা, ঝরনা, পার্বত্য বাণী, সীমান্ত, উদয়ন, নতুন সাহিত্য, বিচিত্রা, বনভূমি সমতা প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

পার্বত্য বাণী-তে তিনি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবন অনুভূতিকে কবিতার কেন্দ্রে এনেছেন। জুমিয়া মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জীবন, শ্রম অস্তিত্বের সঙ্গে তাঁর কবিসত্তার এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে দুঃস্বপ্ন- ব্যঙ্গের আশ্রয়ে সামাজিক অসঙ্গতি উন্মোচিত হয়েছে এবং বৌদ্ধ কবিতায় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নৈতিক অনুশীলনের গুরুত্ব সামনে এসেছে।

তবে তাঁর কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী উচ্চারণগুলোর একটি অলিখিত কাহিনীর একটি নায়িকা কাপ্তাই বাঁধের ফলে বাস্তুচ্যুত এক পাহাড়ি নারীর বেদনা এখানে ব্যক্তিগত কাহিনি অতিক্রম করে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। ঘর হারানো, ভূমি হারানো, পরিচিত জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যে বেদনা, কবি তাকে দিয়েছেন মানবিক মর্যাদা। কাপ্তাই বিপর্যয়ের সাহিত্যিক স্মারক হিসেবে কবিতার গুরুত্ব এখানেই।

ঝরাপাতা- প্রকৃতির রূপকের ভেতর দিয়ে শোষণ বঞ্চনার চিত্র নির্মিত হয়েছে। আর একটি শিক্ষকের কাহিনী-তে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে দেশপ্রেম দায়িত্ববোধের এক মানবিক আখ্যান নির্মাণ করেছেন। নিকুঞ্জ মোহন সাহার জীবনের ঘটনাকে কাব্যে রূপ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন- ইতিহাসের বড় ঘটনাও শেষ পর্যন্ত মানুষের ছোট ছোট ত্যাগের মধ্য দিয়েই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সলিল রায়ের সৃষ্টিশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর চাঙমা ভাষার গান অনুবাদ। তাঁর গানে কর্ণফুলী, পাহাড় মানুষের জীবন কেবল প্রকৃতির উপাদান নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে স্মৃতি পরিচয়ের প্রতীক।

রবীন্দ্রসংগীত চাঙমা ভাষায় অনুবাদের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা আলাদা হলেও অনুভূতির জগৎ অভিন্ন হতে পারে। অনুবাদ তাঁর কাছে নিছক ভাষান্তর ছিল না; ছিল এক সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির সংলাপ।

১৯৫৮ সালে প্রকাশিত পালি অনুবাদ শিক্ষা তাঁর শিক্ষামূলক গবেষণামনস্কতার পরিচয় বহন করে। সাহিত্য প্রবন্ধ রচনার জন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি পুরস্কৃতও হয়েছেন।

সলিল রায়ের সাহিত্যকে তাঁর প্রকাশিত রচনার সংখ্যায় মাপলে তাঁর গুরুত্বের পুরোটা ধরা যাবে না। কারণ তাঁর রচনায় সংরক্ষিত হয়েছে একটি সময়ের মানসিক ভূগোলপাহাড়ের প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক অসঙ্গতি, ধর্মীয় আত্মজিজ্ঞাসা, দেশপ্রেম এবং কাপ্তাইয়ের জলতলে হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি।

রাজপরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি রাজবাড়ির গণ্ডিতে আটকে থাকেননি। তাঁর সাহিত্য পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের জীবনে। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কখনো সৌন্দর্য, কখনো ইতিহাস; নদী কখনো প্রেমের প্রতীক, কখনো হারানোর সাক্ষী। এই দ্বৈত অনুভবই তাঁর কবিতাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।

১৯৮১ সালে তাঁর জীবন থেমে যায়। কিন্তু যে কবি একটি জনপদের স্মৃতি নিজের ভাষায় ধারণ করেন, তাঁর মৃত্যুতে সেই স্মৃতিরও মৃত্যু ঘটে না। কর্ণফুলী বয়ে যায়, কাপ্তাইয়ের জল নীরবে তার ইতিহাস বহন করে, পাহাড়ের বাতাসে পুরোনো গানের সুর ভেসে আসে।

তখন মনে হয়, সলিল রায় দূরে নন। তিনি আছেন সেইসব কবিতায়, যেগুলো হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা বলে; সেইসব গানে, যেখানে নদী মানুষের অনুভূতি একাকার; আর সেই স্মৃতিতে, যা কোনো জলরাশি ডুবিয়ে রাখতে পারে না।

সলিল রায় তাই চাঙমা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম, এক জন কবি, যিনি তাঁর সময়কে দেখেছেন, মানুষের বেদনা অনুভব করেছেন এবং হারিয়ে যেতে বসা এক ভূগোলকে শব্দের ভেতর বাঁচিয়ে রেখেছেন।

তথ্যসূত্র: দুঃস্বপ্ন আলোর পথ দেখালো যারা

 

 

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কবি শ্যামল তালুকদার : চাঙমা সাহিত্যের নীরব সাধক - ইনজেব চাঙমা


আধুনিক চাঙমা সাহিত্যের অভ্যুদয়ের ইতিহাস মূলত কবিতার হাত ধরেই বিকশিত হয়েছে। পাহাড়ের জীবন, মানুষের অনুভব, সমাজের টানাপোড়েন এবং জাতিসত্তার অস্তিত্বের আকাঙ্ক্ষা- সবকিছুই কবিতার ভাষায় নতুন ব্যঞ্জনা পেয়েছে। এই ধারাকে সমৃদ্ধ করে যাঁরা নিজেদের সৃজনশীল প্রতিভায় চাঙমা সাহিত্যকে উদ্ভাসিত করে চলেছেন, কবি শ্যামল তালুকদার তাঁদের অন্যতম। তিনি একদিকে যেমন মনেপ্রাণে চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের কবি, অন্যদিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও তাঁর রয়েছে স্বতন্ত্র সৃজনপরিসর। দুই ভাষার সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের কবিসত্তাকে যেমন বিকশিত করেছেন, তেমনি বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছেও চাঙমা জীবন ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ পৌঁছে দিয়েছেন।

কবি শ্যামল তালুকদারের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর কাব্যে কল্পনার সৌন্দর্যের পাশাপাশি সমকালীন সমাজবাস্তবতার নির্মোহ প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সংকট, মানুষের স্বপ্ন ও বঞ্চনা- এসব বিষয় তাঁর কবিতায় কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকের আশ্রয়ে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে তাঁর কবিতা কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ হয়ে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে সময় ও সমাজকে পাঠ করার এক সংবেদনশীল মাধ্যম।

১৯৫৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার অন্তর্গত নানিয়ারচর উপজেলার করেতেছড়ি গ্রামে কবি শ্যামল তালুকদারের জন্ম। পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা। এই পরিবেশ তাঁর সৃষ্টিশীল মনন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পাহাড়ের নৈঃশব্দ্য, সবুজের নিবিড়তা, মানুষের সহজ-সরল জীবন এবং চারপাশের সামাজিক বাস্তবতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকর্মে নানা রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।

স্কুলজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। কৈশোরেই শব্দের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ পরিণত হয় নিরন্তর সাহিত্যসাধনায়। জীবনের নানা ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি লেখাকে কখনো পরিত্যাগ করেননি। বরং নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে নিজের সৃষ্টিশীল পথ নির্মাণ করে গেছেন। তিনি প্রচারবিমুখ, স্বল্পভাষী ও নিরহংকারী মানুষ; কিন্তু তাঁর সৃষ্টির জগৎ সেই নীরবতার বিপরীত—সেখানে কথা বলে মানুষ, সমাজ, সময় ও ইতিহাস।

চাকমা ভাষায় তাঁর কবিতা বিভিন্ন সময়ে সাময়িকী, লিটল ম্যাগাজিন, সংকলন এবং স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষাতেও তিনি নিয়মিত কাব্যচর্চা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ছোঁয়াও আলো পরশ’, ‘মনটা যেন সাত সমুদ্দুর’, চাঙমা- ‘তুই এবে ভুলি’ (২০১৭) এবং চাঙমা ছড়ার বই ‘জুনিপুক’। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তার কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়; তিনি গানও রচনা করেছেন। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক বলে জানা যায়। কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের অনুভূতি, ভালোবাসা, স্মৃতি, প্রকৃতি এবং স্বদেশচেতনার নানা রূপকে প্রকাশ করেছেন।

শ্যামল তালুকদারের কবিসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্মৃতি ও শ্রদ্ধার প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। চাঙমা সাহিত্যজগতের কিংবদন্তিতুল্য কবি সুহৃদ চাঙমা এবং কবি দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমা-এর স্মরণে তাঁর লেখা স্মৃতিচারণমূলক কবিতা ‘ইধোৎ উদে তোমারে’ পাঠকমহলে বিশেষ সাড়া জাগিয়েছে। এই কবিতায় কেবল প্রয়াত দুই সাহিত্যিকের স্মৃতিই ফিরে আসে না; ফিরে আসে তাঁদের সাহিত্যিক অবদান, সৃষ্টির আলো এবং একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতিও। ব্যক্তিগত শোককে তিনি বৃহত্তর সাহিত্যিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন- এটাই কবিতাটির অন্যতম শক্তি।

শ্যামল তালুকদারের সাহিত্যচর্চাকে তাই কেবল একজন কবির ব্যক্তিগত সৃষ্টিসাধনা হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাঁর কবিতার ভেতরে একদিকে যেমন আছে ব্যক্তিমানুষের আবেগ ও অনুভূতি, অন্যদিকে আছে একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও অস্তিত্বের অনুরণন। চাকমা ভাষায় সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি মাতৃভাষার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেছেন; আর বাংলায় লেখার মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছেন।

একজন কবির প্রকৃত পরিচয় কেবল তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যায় নয়; তাঁর পরিচয় নিহিত থাকে তিনি তাঁর সময়কে কতটা অনুভব করতে পেরেছেন এবং সেই অনুভবকে কতটা শিল্পিত ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন তার মধ্যে। এই বিচারে শ্যামল তালুকদার একজন নিবেদিত সাহিত্যসাধক। তাঁর জীবনযাপন যেমন সরল ও অনাড়ম্বর, সাহিত্যচর্চাও তেমনি প্রচারবিমুখ অথচ গভীরভাবে নিষ্ঠাশীল।

চাঙমা সাহিত্যের পথ এখনো নির্মাণাধীন। এই পথকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন এমন সৃষ্টিশীল মানুষের, যাঁরা ভাষাকে ভালোবাসবেন, সংস্কৃতিকে ধারণ করবেন এবং সময়ের সত্যকে সাহিত্যে তুলে ধরবেন। কবি শ্যামল তালুকদার সেই ধারারই একজন নীরব পথিক। তাঁর কবিতা ও গান চাঙমা সাহিত্যকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি পাহাড়ের মানুষের জীবন ও অনুভূতিকে শব্দের শরীরে সংরক্ষণ করেছে।

সময়ের স্রোত অনেক কিছুই মুছে দেয়, কিন্তু আন্তরিক সৃষ্টির শব্দ সহজে হারিয়ে যায় না। মানুষের মুখে, পাঠকের স্মৃতিতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যচর্চায় তা ফিরে ফিরে আসে। কবি শ্যামল তালুকদারের সাহিত্যসাধনাও তেমনি চাঙমা সাহিত্যের চলমান অভিযাত্রায় এক নীরব অথচ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে কবিতা হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়ের ভাষা, স্মৃতির আশ্রয় এবং মানুষের জীবনের এক সংবেদনশীল দলিল।

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডা. ভগদত্ত খীসা : চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও চাঙমা লিপি সংরক্ষণের এক অগ্রপথিক - ইনজেব চাঙমা

“মামা করত গুরিনেই, বাবা কানাত চুরিনেই নানু পিদিত বুগিনেই- যিয়োং ভারদত যিয়োং ওপারত।”

কয়েকটি পংক্তি- কিন্তু তার ভেতর যেন লুকিয়ে আছে একটি জাতির দীর্ঘশ্বাস। আছে উদ্বাস্তু জীবনের দুঃসহ স্মৃতি, হারিয়ে ফেলা ঘরবাড়ির বেদনা, স্বজন-বিচ্ছেদের হাহাকার এবং আপন মাটিতে ফিরে যাওয়ার এক গভীর আকুতি। ডা. ভগদত্ত খীসার জনপ্রিয় গানগুলো শুধু সুর ও কথার সমন্বয় নয়; সেগুলো পাহাড়ের মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও সমষ্টিগত অনুভূতির একেকটি মৌখিক দলিল।

“আয় আয় ও চানান”, “ভিন পারাল্যা বো চেলে বুক জ্বলে, মর মন জ্বলে”, “ধান খেলে মুরত যা”,  এ ধরনের জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা ডা. ভগদত্ত খীসা ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভা। চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করেছেন, সাহিত্যিক হিসেবে লিখেছেন কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক ও লিমেরিক; গীতিকার হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে তাঁর গান। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন নিজের ভাষা, লিপি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণে সচেতন এক চিন্তাশীল মানুষ।

তাঁর জীবন তাই কেবল একজন চিকিৎসকের জীবনকথা নয়; এটি পাহাড়ের মানুষের জীবন, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক মননশীল মানুষের কর্মযাত্রার ইতিহাস।

১৯৩৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর (১৫ ভাদ্র) বর্তমান নান্যাচর উপজেলার সাবেক্ষ্যং গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত চাকমা পরিবারে ভগদত্ত খীসার জন্ম। তাঁর পিতা কৃষ্ণ মোহন খীসা এবং মাতা ষোড়শী বালা খীসা। পারিবারিকভাবে তিনি চাকমা সমাজের মুহলিমা গঝা ও কলাগুথি গোত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দত্ত’। সবিতা দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে তিন কন্যা ও দুই পুত্রের জন্ম।

সাবেক্ষ্যংয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে তিনি নান্যাচর মধ্য ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রামের জে. এম. সেন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আই.এস.সি. এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৫ সালে বি.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ষাটের দশকের শুরুতে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর অনেক সহপাঠী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ভগদত্ত খীসার সামনেও ছিল সেই সম্ভাবনা। কিন্তু বৃহত্তর পেশাগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে নিজের মানুষের কাছে থাকা এবং তাঁদের সেবা করাকেই তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন।

১৯৬৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটির রিজার্ভ বাজারে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। দরিদ্র ও অসহায় পাহাড়ি মানুষের জন্য তাঁর চেম্বার হয়ে উঠেছিল আস্থার ঠিকানা। চিকিৎসাকে তিনি নিছক পেশা হিসেবে দেখেননি; মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক বাস্তব অনুশীলন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু মানুষের শরীরের চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁর আরেকটি গভীর সাধনা ছিল, মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা। ছাত্রজীবন থেকেই ভগদত্ত খীসার লেখালেখির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা হলের বার্ষিকীতে তাঁর কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে চাকমা ও বাংলা ভাষায় তাঁর কবিতা, ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সাময়িকী, সংকলন ও লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি কোনো একটি সাহিত্যধারায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ, নাটক ও লিমেরিক, বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি নিজের ভাবনা প্রকাশ করেছেন। চাকমা ভাষায় লিমেরিক রচনার ক্ষেত্রেও তাঁর অগ্রণী ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় অধ্যায় সম্ভবত তাঁর গান। তাঁর গান পাহাড়ের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষত উদ্বাস্তু জীবনের স্মৃতি, স্বদেশের জন্য আকুতি, প্রেম, বিরহ ও মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতি তাঁর গানে সহজ অথচ গভীর ভাষা পেয়েছে।

ফলে তাঁর গান কেবল ব্যক্তিগত সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মানুষের সমষ্টিগত স্মৃতি ও আবেগের অংশ হয়ে উঠেছে।

ডা. ভগদত্ত খীসার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল চাঙমা সমাজের নিজস্ব জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করার প্রয়াস।

চাঙমাদের ঔষধ ও চিকিৎসাবিষয়ক ঐতিহ্যগত জ্ঞান বা তাহ্লিক শাস্ত্র চাঙমা লিপিতে সংরক্ষিত ছিল। এই জ্ঞানকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, নিজস্ব চিকিৎসাজ্ঞানকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হলে চাঙমা বর্ণমালা ও লিপির প্রশ্নটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

এই অনুসন্ধান থেকেই তাঁর মধ্যে চাঙমা লিপি নিয়ে নতুনভাবে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি যখন ‘চাঙমা তালিক চিকিৎসা’ গ্রন্থ প্রণয়নের কাজে যুক্ত হন, তখন চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও আরও গভীর হয়ে ওঠে। চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভাণ্ডার লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে তিনি আসলে ভাষা ও লিপি সংরক্ষণের বৃহত্তর প্রয়োজনটিকেই সামনে নিয়ে আসেন।

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘চাঙমা তালিক চিকিৎসা’ তাই কেবল চিকিৎসাবিষয়ক একটি গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল চাঙমা সমাজের নিজস্ব জ্ঞান, ভাষা ও লিপিকে লিখিত পরিসরে ধরে রাখার একটি সাংস্কৃতিক প্রয়াস।

চাঙমা বর্ণমালাকে ঘিরে তাঁর আগ্রহ পরবর্তীকালে আরও বিস্তৃত সামাজিক উদ্যোগে রূপ নেয়। লিপি যদি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার প্রাণশক্তি টিকে থাকে না; নতুন প্রজন্মের হাতে তাকে তুলে দিতে হয়। এই উপলব্ধি থেকেই শিশুশিক্ষার উপযোগী পাঠ্যসামগ্রী তৈরির প্রয়োজন সামনে আসে।

এই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে ডা. ভগদত্ত খীসা সম্পাদনা পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ‘চাঙমা পাত্থম পাত’ নামের একটি শিশুপাঠ্য গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেন। রাঙ্গামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের উদ্দেশ্য ছিল ছোটদের সহজভাবে চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত করে তোলা।

বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে চাঙমা লিপি শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক পরিসরে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ৪৫৮ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে চাঙমা বর্ণমালা শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। সংখ্যার বিচারে এটি হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের একটি কার্যক্রম; কিন্তু সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের বিচারে এর গুরুত্ব অনেক গভীর।

কারণ, একটি লিপির অস্তিত্ব কেবল তার বর্ণমালার অস্তিত্বে নয়, তার পাঠক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যেই তার ভবিষ্যৎ নিহিত। ডা. ভগদত্ত খীসা সেই ভবিষ্যতের কথাই ভেবেছিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থ রচনার সূত্রে যে লিপির প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল, পরবর্তীকালে সেই লিপিকেই শিশুর হাতে তুলে দেওয়ার কাজে তিনি যুক্ত হন। এ এক তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিক্রমা।

সাহিত্যের পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও তাঁর অবদান ছিল। তিনি নাটক রচনা ও অনুবাদ করেছেন। তাঁর অনূদিত ‘অয় নয় বৈদ্য’ বিভিন্ন সময়ে মঞ্চস্থ হয়েছে। নাটকের মাধ্যমে চাকমা ভাষার সাহিত্যকে অভিনয় ও মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্যিক সত্তার পরিচয় বহন করে।

তাঁর গবেষণামনস্কতার আরেকটি দিক ছিল ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাজ্ঞান অনুসন্ধান। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত একজন চিকিৎসক হয়েও তিনি নিজের জনগোষ্ঠীর প্রাচীন জ্ঞান ও লোকজ চিকিৎসাপদ্ধতিকে অবহেলা করেননি। বরং তা সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও লিখিতভাবে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন।

জীবনের শেষ পর্যায়েও সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা অটুট ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের লেখকদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

২০০১ সালের ১৫ অক্টোবর গঠিত ‘জুম্ম লেখক ফোরাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নিজ নিজ পরিসরে বিচ্ছিন্ন সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডকে বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা।

ডা. ভগদত্ত খীসার জীবনকে কয়েকটি পরিচয়ে ভাগ করে দেখা যায়, তিনি চিকিৎসক, সাহিত্যিক, গীতিকার, গবেষক, অনুবাদক, সাংস্কৃতিক সংগঠক। কিন্তু এই পরিচয়গুলো আসলে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাঁর চিকিৎসা তাঁকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছে; সাহিত্য তাঁকে মানুষের মনের কাছে পৌঁছে দিয়েছে; আর ভাষা ও লিপি নিয়ে তাঁর কাজ তাঁকে একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতির কাছে দাঁড় করিয়েছে।

তাঁর ‘চাঙমা তালিক চিকিৎসা’ থেকে ‘চাঙমা পাত্থম পাত’ এই যাত্রাপথ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমটি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাজ্ঞানকে লিখিতভাবে সংরক্ষণের প্রয়াস, আর দ্বিতীয়টি নতুন প্রজন্মকে চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত করার প্রয়াস। অর্থাৎ একদিকে তিনি অতীতের জ্ঞানকে ধরে রাখতে চেয়েছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে সেই ভাষা ও লিপির চাবিকাঠি তুলে দিতে চেয়েছেন।

এই জায়গাতেই ডা. ভগদত্ত খীসার কাজ কেবল সাহিত্যিক বা ব্যক্তিগত সৃষ্টির সীমা অতিক্রম করে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে ওঠে।

দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ডা. ভগদত্ত খীসা ২০০২ সালের ২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর কর্মের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে মানুষের স্মৃতিতে, জনপ্রিয় গানে, সাহিত্যকর্মে, গবেষণায় এবং চাঙমা ভাষা-লিপি সংরক্ষণের নানা প্রয়াসে।

২০১২ সালে রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত ‘ডা. ভগদত্ত খীসা রচনাস্মারক’ তাঁর জীবন ও কর্মকে স্মরণ করার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।

ডা. ভগদত্ত খীসা ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি মানুষের শরীরের অসুখ সারাতে চিকিৎসাবিদ্যা ব্যবহার করেছেন, আর মানুষের ইতিহাস, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়কে ধরে রাখতে ব্যবহার করেছেন তাঁর কলম। তাঁর গান উদ্বাস্তু মানুষের বেদনার ভাষা হয়েছে; তাঁর সাহিত্য পাহাড়ের মানুষের জীবনকে ধারণ করেছে; তাঁর গবেষণা ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে লিখিত রূপ দিয়েছে; আর চাঙমা লিপি শিক্ষার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে ভাষার উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

তাই তাঁকে শুধু একজন চিকিৎসক বা সাহিত্যিক হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি পূর্ণ সুবিচার হয় না। তিনি ছিলেন মানুষের চিকিৎসক, ভাষার সাধক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক নিবেদিত সংরক্ষক। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতির অস্তিত্ব কেবল তার ভূখণ্ডে নয়; তার ভাষা, লিপি, গান, সাহিত্য, স্মৃতি ও জ্ঞানভাণ্ডারের মধ্যেও তার গভীরতম পরিচয় নিহিত।

তথ্যসূত্র:
ডা. ভগদত্ত খীসা রচনাস্মারক, রাঙ্গামাটি, ২০১২ খ্রি.

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চুণীলাল দেওয়ান : পাহাড়ের শিল্প-সাহিত্যের এক অগ্রপথিক - ইনজেব চাঙমা

বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তখনও আধুনিক শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির মূল স্রোত থেকে অনেক দূরে। দুর্গম পাহাড়, অরণ্য, নদী আর বিচ্ছিন্ন জনপদের সেই সময়ে শিল্পচর্চা ছিল প্রায় অকল্পনীয় এক সাধনা। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার অপ্রতুলতা এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের সংকীর্ণতার মধ্যেও পাহাড়ের বুক থেকে উঠে এসেছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি তাঁর তুলির আঁচড়ে পাহাড়কে দেখেছিলেন নতুন চোখে, কবিতায় তাকে দিয়েছিলেন ভাষা, গানে দিয়েছিলেন সুর এবং ভাস্কর্যে দিয়েছিলেন অবয়ব। তিনি চুণীলাল দেওয়ান।

চুণীলাল দেওয়ান ছিলেন শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক ভাস্কর। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বহুমাত্রিক, কিন্তু তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটিইনিজের মাটি, নিজের মানুষ এবং নিজের চারপাশের প্রকৃতি। পাহাড়ের জীবন, নদী-নালা, অরণ্য, মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন, প্রেম, ধর্মীয় অনুভব এবং প্রকৃতির অনন্ত সৌন্দর্য তাঁর শিল্পীসত্তাকে বারবার আলোড়িত করেছে।

এই কারণেই চুণীলাল দেওয়ানের জীবনকে কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনী হিসেবে দেখলে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক শিল্প-সাহিত্যচর্চার এক অগ্রদূত এবং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

চুণীলাল দেওয়ানের পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। প্রচলিত বংশতথ্য অনুযায়ী তিনি চাকমা রাজপরিবারের ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং রাজা শের দৌলত খান তাঁর উত্তরসূরি রাজা জানবক্স খানের বংশধারার একজন উত্তরসূরি (১০ম)

এই বংশপরিচয় তাঁর জীবনের একটি ঐতিহাসিক পটভূমি হলেও চুণীলাল দেওয়ানের প্রকৃত পরিচয় শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে তাঁর নিজস্ব প্রতিভা সৃষ্টিকর্মে। উত্তরাধিকার তাঁকে একটি ইতিহাস দিয়েছিল; কিন্তু শিল্প তাঁকে দিয়েছিল নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়।

চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের পারিবারিক পরিচয়ও তাঁর জীবন কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর পিতা ছিলেন শশী কুমার দেওয়ান এবং মাতা নয়নতারা দেওয়ান। শশী কুমার দেওয়ানের প্রথম স্ত্রী নয়নতারা দেওয়ানের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন প্রতুল চন্দ্র দেওয়ান, পান্না লাল দেওয়ান চুণীলাল দেওয়ান। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর শশী কুমার দেওয়ান বিম্বলতা দেওয়ানকে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। এই দাম্পত্যে তাঁদের চার সন্তান- সরোজ কুমারী দেওয়ান, অমরাবতী দেওয়ান, হীরালাল দেওয়ান মানিক লাল দেওয়ান।

চুণীলাল দেওয়ানও পারিবারিক জীবনে দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন চারুবালা দেওয়ান। তাঁদের দাম্পত্যে জন্মগ্রহণ করেন রণজিৎ কুমার দেওয়ান তরিৎ কুমার দেওয়ান। চারুবালা দেওয়ানের মৃত্যুর পর চুণীলাল দেওয়ান গামারীঢালা নিবাসী ব্রুজমোহন দেওয়ানের সুযোগ্য কন্যা বসুন্ধরা দেওয়ানকে বিবাহ করেন।

বসুন্ধরা দেওয়ান ছিলেন কেবল চুণীলাল দেওয়ানের সহধর্মিণী নন; তিনি নিজেও ছিলেন চাঙমা সমাজের এক ব্যতিক্রমী প্রজ্ঞাবান নারী। সামাজিক নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রথম নারী হেডম্যান বাজার চৌধুরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সত্যনিষ্ঠা নির্ভীকতার জন্য পরিচিত ছিলেন। সমাজজীবনে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে চাঙমা সমাজের একজন বিদুষী সাহসী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আদিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে আদিবাসী ফোরাম, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা কর্তৃক তিনি মরণোত্তর সম্মাননা পদকে ভূষিত হন।

চুণীলাল দেওয়ান বসুন্ধরা দেওয়ানের দাম্পত্যে জন্মগ্রহণ করেন দেবী প্রসাদ দেওয়ান, সত্য প্রসাদ দেওয়ান, নীতি প্রসাদ দেওয়ান পৌরিকা দেওয়ান। ফলে চুণীলাল দেওয়ানের পারিবারিক উত্তরাধিকার একদিকে যেমন শিল্প সাহিত্যসাধনার স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে তেমনি তা পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত।

বসুন্ধরা দেওয়ানের জীবনের সঙ্গে চুণীলাল দেওয়ানের সৃষ্টিশীলতারও একটি বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে।কর্ণফুলী কন্নানামে পরিচিত বেদনামথিত সৃষ্টির মূল সূত্রধর হিসেবে বসুন্ধরা দেওয়ানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর জীবন, অভিজ্ঞতা অনুভব চুণীলাল দেওয়ানের সৃষ্টিশীল জগতে যে প্রভাব ফেলেছিল, তা তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ককে নিছক পারিবারিক পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তা শিল্প জীবনকে এক অভিন্ন অভিজ্ঞতায় যুক্ত করেছিল।

চুণীলাল দেওয়ানের জন্ম ফেব্রুয়ারি ১৯১১ সালে। তাঁর জন্ম হয়েছিল পিতার কর্মস্থল দিঘীনালায়; আর পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার চেঙ্গী বড়াদম গ্রামে। তাঁর পিতা শশী কুমার দেওয়ান তৎকালীন দিঘীনালা থানায় সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। মাতার নাম নয়নতারা দেওয়ান। শৈশবেই মাতৃহারা হন চুণীলাল। জীবনের সেই প্রারম্ভেই হয়তো নিঃসঙ্গতার সঙ্গে তাঁর যে পরিচয় তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সেটিই তাঁর স্বভাবের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। তিনি ছিলেন শান্ত, সংযমী, মিতব্যয়ী এবং অনেকটা নিভৃতচারী প্রকৃতির মানুষ।

শৈশব থেকেই তাঁর আকর্ষণ ছিল গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে। ছবি আঁকা, কবিতা লেখা, গান গাওয়া এবং বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রতি তাঁর সহজাত আগ্রহ ছিল। তাঁর ভেতরে যেন জন্ম থেকেই একজন শিল্পী নিঃশব্দে বেড়ে উঠছিলেন।

নানিয়ারচর এম.. স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি তাঁর সৃজনশীল মনকে ধরে রাখতে পারেনি। শিল্পের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় কলকাতায়।

১৯২৭ সালে তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস, চৌরঙ্গিতে প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে কলকাতা আর্টস স্কুলে অধ্যয়ন করেন। দীর্ঘ ছয় বছরের শিল্পশিক্ষা শেষে ১৯৩৪ সালে আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটসের কমার্শিয়াল বিভাগে ডিগ্রি লাভ করেন।

সেই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দুর্গম অঞ্চল থেকে কলকাতায় গিয়ে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল অসাধারণ সাহস সংকল্পের ব্যাপার। তাঁর সামনে ছিল না আজকের মতো সহজ যোগাযোগ, ছিল না আধুনিক শিক্ষার সুযোগ। তবু তিনি পাহাড় পেরিয়ে নগরে গিয়েছিলেন নিজের ভেতরের শিল্পীকে খুঁজে নিতে।

কলকাতার শিল্পপরিবেশ তাঁর শিল্পদৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি পাশ্চাত্যধর্মী চিত্রকলার প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট ছিলেন। প্রকৃতির দৃশ্য, মানুষের স্বাভাবিক অবয়ব, আলো-ছায়া বাস্তবতার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। একই সঙ্গে ভারতীয় শিল্পভাবনার সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটে।

এই সময়েই তাঁর সঙ্গে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই বন্ধুত্ব বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসেরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়ে পরিণত হয়।

চুণীলাল দেওয়ানের শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি তাঁর চারপাশের পৃথিবীকে ভালোবাসতেন। পাহাড় তাঁর কাছে শুধু ভৌগোলিক এলাকা ছিল না; ছিল এক জীবন্ত সত্তা।

তাঁর তুলিতে উঠে এসেছে পাহাড়ের ঢেউখেলানো রেখা, নদীর শান্ত প্রবাহ, অরণ্যের গভীরতা, মানুষের মুখ, পাহাড়ি জীবনের সরলতা এবং প্রকৃতির বিচিত্র রূপ। তিনি প্রকৃতিকে আঁকেননি শুধু চোখে দেখা দৃশ্য হিসেবে; বরং তার মধ্যে খুঁজেছেন মানুষের জীবন অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।

রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর ঢাকায় আয়োজিত বিভিন্ন চিত্রপ্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। তাঁর চিত্রকর্ম শিল্পরসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা তাঁর শিল্পকর্মের প্রশংসা করেছিলেন বলেও তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৫৫ সালের ঢাকার ফোক আর্টস প্রদর্শনীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনাটি তাঁর শিল্পজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তাঁর আঁকা নকশা রেখাচিত্র দেখে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন কামরুল হাসান মুগ্ধ হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন জনে লেখা তাঁর জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই পরিচয়ের সূত্রেই জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। তাঁদের যৌথভাবেজলপ্রপাতচিত্র অঙ্কনের কথাও বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ আছে। এই ঘটনাটি শুধু দুই শিল্পীর বন্ধুত্বের স্মারক নয়; বরং পাহাড়ের শিল্পভাবনা বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সংযোগের প্রতীক।

চুণীলাল দেওয়ানের ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ দিক ছিল, তিনি চিত্রকলাকে মূলত অর্থ উপার্জনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে ছবি আঁকা ছিল আত্মপ্রকাশের একটি মাধ্যম।

তিনি পাহাড়ের সৌন্দর্যকে আঁকতেন কারণ পাহাড় তাঁর আপন পৃথিবী। তাঁর শিল্পে তাই কৃত্রিমতার চেয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি। তিনি নিজের সময়ের মানুষের জীবন, প্রকৃতি সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। ফলে তাঁর শিল্পকর্ম এক অর্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও দৃশ্যমান দলিল।

শিল্পশিক্ষা শেষ করে তিনি নিজের অঞ্চলে ফিরে আসেন। ১৯৪৬ সালে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ড্রয়িং শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করেন।

শিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু নিজে ছবি আঁকেননি; নতুন প্রজন্মের কাছে চিত্রকলার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার কাজও করেছেন। তাঁর ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, আর বৃহত্তর সমাজের কাছে একজন শিল্পী।

পরবর্তী সময়ে তিনি দুটি মৌজার হেডম্যান এবং নানিয়ারচর বাজারের বাজার চৌধুরীর দায়িত্বও পালন করেন। ফলে তাঁর জীবন একদিকে শিল্পচর্চা, অন্যদিকে সামাজিক দায়িত্ব- এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছিল।

চুণীলালের প্রতিভা ক্যানভাসে থেমে থাকেনি। কলকাতায় শিল্পশিক্ষার সময়ই তিনি ভাস্কর্যচর্চায় দক্ষতা অর্জন করেন। মাটি, কাঠ সিমেন্টসহ বিভিন্ন উপাদানে তিনি ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন।

নানিয়ারচরের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে তাঁর নির্মিত বুদ্ধমূর্তির নিদর্শনের কথা জানা যায়। কাঠের ওপর খোদাই করা বুদ্ধ আনন্দের ভাস্কর্য এবং তাঁর নিজের প্রতিকৃতিও তাঁর ভাস্কর্যসত্তার স্মারক হয়ে আছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

একজন শিল্পীর জন্য এটি এক বিরল ক্ষমতা, একই সঙ্গে রেখা, রং ত্রিমাত্রিক অবয়বকে নিজের শিল্পভাষায় ধারণ করা।

চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যিক পরিচয় তাঁর শিল্পী পরিচয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম দিকের সাহিত্যপত্রগৈরিকাপ্রকাশিত হয় ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে, অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যার সুদৃশ্য প্রচ্ছদ চুণীলাল দেওয়ানের আঁকা ছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ‘গৈরিকা’- একাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁরচাকমা কবিতাবাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম চাকমা আধুনিক কবিতা হিসেবে বিবেচিত।

এই একটি তথ্যই চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যিক গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট।

কারণ একটি ভাষার আধুনিক কবিতার সূচনা শুধু কয়েকটি পঙ্ক্তির জন্ম নয়; এটি একটি জাতিসত্তার নিজস্ব অনুভূতিকে নতুন সাহিত্যিক কাঠামো দেওয়ার ঘটনা। চুণীলাল দেওয়ান সেই কাজটিই করেছিলেন।

তাঁর কবিতায় প্রেম আছে, প্রকৃতি আছে, ধর্মীয় অনুভব আছে, আছে নির্মল সৌন্দর্যবোধ। পাহাড়ের প্রকৃতি তাঁর কাছে কখনো নিছক দৃশ্য নয়; তা হয়ে উঠেছে অনুভূতির ভাষা।

তাঁর প্রথম দিকের রচনাগুলোর মধ্যেফাল্গুনী পূর্ণিমাতে’- কথাও উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষায় রচিত এই দীর্ঘ কবিতাটিগৈরিকা’- প্রকাশিত হয়েছিল বলে আপনার সংগৃহীত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তৃত অংশের একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন পরেনিবেদননামে প্রকাশিত হয়।

চুণীলাল ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যাঁর কাছে কবিতা গান ছিল একই অনুভূতির দুই রূপ। তিনি গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং নিজেই গেয়েছেন। হারমোনিয়াম, পিয়ানো, বাঁশি সেতার বাজাতে পারতেন। তাঁর গান কবিতার মধ্যে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা সৌন্দর্যের অনুভব মিশে আছে।

১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাপক নন্দলাল শর্মার সম্পাদনায়নিবেদননামে তাঁর গান কবিতার একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। সেখানে তাঁর ৩২টি গান কবিতা সংকলিত হয়েছিল বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরেও তাঁর সৃষ্টিকে সংগ্রহ করে প্রকাশ করার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। তাঁর আরও কিছু অপ্রকাশিত রচনা ছিল বলেও জানা যায়।

চুণীলাল দেওয়ান ছিলেন অন্তর্মুখী, সংযমী স্বাধীনচেতা মানুষ। তাঁর মধ্যে প্রচারের আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল না। নিজের কাজের মধ্যেই তিনি যেন নিজের অস্তিত্বের পূর্ণতা খুঁজে পেতেন।

কলকাতায় ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন মিতব্যয়ী। শিল্পচর্চা প্রকৃতির প্রতি তাঁর টান ছিল গভীর। বন্ধুদের সঙ্গে প্রকৃতির দৃশ্য আঁকার জন্য দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু নিজের প্রচার বা খ্যাতি অর্জনের জন্য তিনি কখনো ব্যস্ত হয়ে ওঠেননি। এই নিভৃতচারিতাই হয়তো তাঁর শিল্পীজীবনের একদিকে সৌন্দর্য, অন্যদিকে দুর্ভাগ্য।

কারণ প্রতিভা থাকলেই ইতিহাসে জায়গা পাওয়া যায় না; প্রতিভার সংরক্ষণ, প্রচার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নও প্রয়োজন। চুণীলাল দেওয়ানের ক্ষেত্রে সেই কাজটি যথেষ্ট হয়নি। তাঁর অধিকাংশ চিত্রকর্ম সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। অল্প কিছু ছবি, ভাস্কর্য লেখা আজ তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

জীবনের শেষ পর্বেও তিনি শিল্পচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ আছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।

১৯৫৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর চুণীলাল দেওয়ান মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৪৪ বছরের জীবনে তিনি যে সৃষ্টির বিস্তার রেখে গেছেন, তা তাঁর আয়ুর তুলনায় বিস্ময়করভাবে দীর্ঘ।

চুণীলাল দেওয়ানের মৃত্যুর পর তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে, তাঁর ছবি বিভিন্ন সংগ্রহে সংরক্ষিত হয়েছে এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। তাঁর স্মৃতি আজও নানিয়ারচর রাঙামাটির সাংস্কৃতিক পরিসরে জীবন্ত। এমনকি নানিয়ারচরের চেঙ্গী নদীর ওপর নির্মিত সেতুটিও তাঁর নামেচিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ান সেতুহিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।

নামকরণ কেবল একটি সেতুর নামকরণ নয়; এটি একটি অঞ্চলের স্মৃতির সঙ্গে একজন শিল্পীর নামকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার প্রয়াস।

চুণীলাল দেওয়ানকে কোনো একটি জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে দেখা তাঁর শিল্পীসত্তার প্রতি সুবিচার হবে না। তিনি যেমন চাকমা সমাজের গর্ব, তেমনি নানিয়ারচরের কৃতী সন্তান। তিনি যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ, তেমনি বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের বৃহত্তর ঐতিহ্যেরও অংশ।

একজন শিল্পীর জন্ম কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে হতে পারে, তাঁর ভাষা হতে পারে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাষা; কিন্তু তাঁর শিল্পের সৌন্দর্য মানুষের। তাঁর সৃষ্টির উত্তরাধিকার তাই বৃহত্তর সমাজের। চুণীলাল দেওয়ানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন চাকমা শিল্পীকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা। তাঁকে সংরক্ষণ করা মানে একটি জাতির স্মৃতি সংরক্ষণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসের একটি হারিয়ে যেতে বসা অধ্যায়কে সংরক্ষণ করা।

চুণীলাল দেওয়ানের জীবন আমাদের একটি গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়প্রতিভা কখনো একা আসে না; তার সঙ্গে আসে সংগ্রাম, নিঃসঙ্গতা এবং অনেক সময় বিস্মৃতির দীর্ঘ ছায়া। তিনি এমন এক সময়ে শিল্পচর্চা করেছেন, যখন পাহাড় থেকে কলকাতায় গিয়ে শিল্পশিক্ষা নেওয়া ছিল দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত। এমন এক সময়ে কবিতা লিখেছেন, যখন চাকমা ভাষায় আধুনিক সাহিত্যিক প্রকাশের পরিসর ছিল অতি সীমিত। এমন এক সময়ে ছবি এঁকেছেন, যখন পাহাড়ের প্রকৃতি মানুষের জীবনকে জাতীয় শিল্পপরিসরে তুলে ধরার সুযোগ ছিল খুবই কম।

তবু তিনি থেমে থাকেননি। তাঁর হাতে পাহাড় পেয়েছিল রং। তাঁর কবিতায় পাহাড় পেয়েছিল শব্দ। তাঁর গানে পাহাড় পেয়েছিল সুর। তাঁর ভাস্কর্যে পেয়েছিল অবয়ব। আর তাঁর জীবন পাহাড়কে দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের এক নতুন শিল্পভাষা।

চুণীলাল দেওয়ান তাই কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধি। তিনি সেই সময়ের প্রতীক, যখন পাহাড়ের এক নিভৃত জনপদ থেকে উঠে এসে একজন মানুষ প্রমাণ করেছিলেন, সৃষ্টিশীলতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

আজ তাঁর অধিকাংশ ছবি নেই। অনেক লেখা হারিয়ে গেছে। অনেক গান হয়তো সময়ের অন্ধকারে বিলীন। তবু যে অল্প কিছু অবশিষ্ট আছে, তার মধ্যেই তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার দীপ্তি দেখা যায়। ইতিহাসের বিস্মৃত পাতায় তাই চুণীলাল দেওয়ানের নাম শুধু পুনরায় লেখা নয়, তাঁর শিল্পকর্ম, কবিতা, গান, ভাস্কর্য জীবনসংক্রান্ত দলিল সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ চুণীলাল দেওয়ান আর্কাইভ বা স্মৃতি-সংগ্রহশালা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

কারণ একটি জাতির ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়াদের ইতিহাস নয়; শুধু যুদ্ধ, রাজনীতি প্রশাসনের ইতিহাসও নয়। ইতিহাসের গভীরতম স্তরে থাকে এমন মানুষদের জীবন, যারা নীরবে একটি সমাজের সৌন্দর্যকে ভাষা দেন। চুণীলাল দেওয়ান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

তিনি পাহাড়ের রংকে ক্যানভাসে, পাহাড়ের নীরবতাকে কবিতায় এবং পাহাড়ের হৃদস্পন্দনকে গানে রূপ দিয়েছিলেন। তাই চুণীলাল দেওয়ানকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করা নয়,

নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে স্মরণ করা।

আর সেই কারণেই চুণীলাল দেওয়ান কোনো একক জাতি বা গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধ সম্পদ নন; তিনি নানিয়ারচরের গর্ব, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অথচ দীর্ঘদিন অবহেলিত নাম।

চুণীলাল দেওয়ানের শিল্পপ্রতিভা তাঁর জীবদ্দশাতেই বিভিন্ন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার মে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর চিত্রকর্মের প্রশংসা করেন। পরবর্তীতে ১৫ মে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লার কমিশনার এবং নভেম্বর ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জে. . হিউম তাঁর শিল্পকর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, তাঁর শিল্পকর্ম সমকালীন সমাজের প্রচলিত গণ্ডি অতিক্রম করে বৃহত্তর পরিসরেও গুরুত্ব অর্জন করেছিল।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটিতে আয়োজিত একটি শিল্প প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে চুণীলাল দেওয়ান প্রথম পুরস্কার হিসেবে পদক লাভ করেন। অর্জন তাঁর শিল্পজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। পাহাড়ের প্রকৃতি, নদী, ঝরনা, জনজীবন, মানুষের সরলতা এবং পার্বত্য সমাজের বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র তাঁর তুলিতে যে রূপ পেয়েছিল, তা তাঁকে সমকালীন শিল্পচর্চায় স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয়।

তাঁর শিল্পপ্রতিভার স্বীকৃতি অবশ্য শুধু জীবদ্দশাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মৃত্যুর পরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর অবদানের যথার্থ মূল্যায়নের চেষ্টা করেছে। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ কর্তৃক তিনি মরণোত্তর সম্মাননা সনদ পদকে ভূষিত হন (২০০১) পরবর্তীকালে নানিয়ারচর সংগীত একাডেমি মরণোত্তর সম্মাননা/২০১৯ ও নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ তাঁর চাঙমা ভাষা-সাহিত্য সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপনোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক’ (মরণোত্তর, ২০২৩) এবং সনদ প্রদান করে।

এই সম্মাননাগুলো কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি নয়; বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসে চুণীলাল দেওয়ানের অবস্থানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরায় প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। তিনি যে সময়ে শিল্পচর্চা করেছিলেন, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন, প্রকৃতি সংস্কৃতিকে শিল্পের ভাষায় বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে পাহাড়কে ক্যানভাসে, কবিতায় গানে ধারণ করেছিলেন।

চুণীলাল দেওয়ানের শিল্পজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা। চিত্রকলার পাশাপাশি কবিতা, গান, সুরসৃষ্টি, সংগীতচর্চা ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের সময়কে ধারণ করেছেন। তাঁর শিল্পে পাহাড় কেবল একটি ভূখণ্ড নয়- এটি মানুষের জীবন, স্মৃতি, প্রকৃতি, বেদনা ভালোবাসার সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। সেই কারণেই চুণীলাল দেওয়ানের উত্তরাধিকারকে শুধু কোনো একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়। চাকমা সমাজের গর্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়েও তিনি বৃহত্তর বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের স্মৃতি আজও নানিয়ারচর পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিসরে জীবন্ত। তাঁর নামে সেতুর নামকরণ, বিভিন্ন সময়ে তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী এবং মরণোত্তর সম্মাননা, সবকিছু মিলিয়ে প্রমাণিত হয় যে, সময়ের স্রোত তাঁর শিল্পস্মৃতিকে মুছে দিতে পারেনি। বরং যত সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে, ততই তাঁর শিল্প সাহিত্যকর্মের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

তথ্যসূত্র:  

দেওয়ান, দেবী প্রসাদ ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.)। চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম। প্রকাশস্থান: রাঙ্গামটি, প্রকাশক: রেগা প্রকাশনী, প্রকাশকাল: এপ্রিল, ২০২১খ্রি

চাঙমা, সুগত। “চাকমা প্রথম চিত্রশিল্পী চুনীলাল দেওয়ান সর্ম্পকে ভারতীয় চিত্রশিল্পী অমরেন্দ্র নাথ রায়ের একটি পত্র ও কিছু কথা।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

খীসা, ডা. ভগদত্ত। “সেই এক চুণীবাবু।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

চাঙমা, সুগম। “চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

শর্মা, নন্দলাল। “নিবেদন নিয়ে কিছু কথা।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

রহমান, মো. মিজানুর। “চুনিলাল পার্বত্যাঞ্চলের এক অনন্য প্রতিভা।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

চাঙমা, ধনমনি। “শিল্পী চুনীলাল দেওয়ান।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

দেওয়ান, প্রীতম। “চুণীলাল দেওয়ান: আমাদের গর্ব ও প্রেরণা” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

কার্বারি, প্রমোদ বিকাশ। “চিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ান সংক্ষিপ্ত জীবনী।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

 

চাঙমা বর্ণমালা: সুযোগের দ্বারে দাঁড়িয়েও কেন এত দূরে? - ইনজেব চাঙমা

“ চাকমাদের নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্য আছে। দু ’ শ বছর আগেও চাঙমা লিপিতে চাঙমা ভাষায় সাহিত্য রচনা হতো বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ব...