[অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার বাইরে নজর দেওয়া হোক মাতৃভাষা, বর্ণমালা ও প্রকাশনায়]
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- তিন জেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য পৃথক সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা, গবেষণা ও প্রকাশনা- এসব তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। তবে এই বিস্তৃত কর্মকাণ্ডের মধ্যে মাতৃভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। কারণ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে তার ইতিহাস, সাহিত্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে- মাতৃভাষা ও বর্ণমালার জন্য তারা কী প্রকাশ করেছে এবং সেই কাজের ধারাবাহিকতা কতটা?
রাঙামাটি ও বান্দরবান ইনস্টিটিউটের সরকারি তথ্যেই মাতৃভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং গবেষণার কথা উল্লেখ রয়েছে। তিন জেলার কার্যক্রমের দিকে তাকালে কিছু পার্থক্যও চোখে পড়ে। বান্দরবান ইনস্টিটিউটের সরকারি ওয়েবসাইটে মাতৃভাষা শিক্ষা কোর্স, মাতৃভাষায় সাহিত্য প্রতিযোগিতা, রচনা ও বক্তৃতাসহ পৃথক মাতৃভাষাভিত্তিক কার্যক্রমের তথ্য রয়েছে; ২০২৬ সালেও ম্রো ভাষা শিক্ষা কোর্সের অক্ষরজ্ঞান ব্যাচের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। রাঙামাটি ইনস্টিটিউটে গবেষণা ও প্রকাশনার পৃথক শাখা রয়েছে, যা ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকাশনার সুযোগ তৈরি করে। খাগড়াছড়ি ইনস্টিটিউটেও প্রকাশনা ও লাইব্রেরির ব্যবস্থা রয়েছে এবং অতীতে ‘মাতৃভাষা’ নামে একটি ম্যাগাজিনের তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানা যায়; কিন্তু এর পর আর ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। এসব উদ্যোগ ও কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূল প্রশ্ন থেকে যায়- মাতৃভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে নিয়মিতভাবে কতটি বই, সাময়িকী ও শিক্ষাসামগ্রী প্রকাশিত হচ্ছে?
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতা প্রয়োজনীয়; এগুলো মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ায় এবং সাংস্কৃতিক চর্চাকে জীবন্ত রাখে। কিন্তু একটি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়, একটি প্রতিযোগিতার সময়ও সীমিত। বিপরীতে একটি মাতৃভাষার বই, বর্ণমালার গ্রন্থ, ভাষাশিক্ষার উপকরণ কিংবা সাময়িকী দীর্ঘদিন সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়। তাই মাতৃভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রকাশনা একটি স্থায়ী ও দৃশ্যমান ফলাফল।
এক্ষেত্রে মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি সহজ প্রশ্নই যথেষ্ট- কতটি মাতৃভাষার বই ও সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে, কতটি বর্ণমালা ও ভাষাশিক্ষার উপকরণ তৈরি হয়েছে, কতগুলো ভাষা ও জনগোষ্ঠী এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং প্রকাশনার ধারাবাহিকতা কতটা বজায় রয়েছে?
তিন ইনস্টিটিউট চাইলে যৌথভাবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম মাতৃভাষা ও বর্ণমালা প্রকাশনা কর্মসূচি’ গ্রহণ করতে পারে। এর আওতায় মাতৃভাষার বই, বর্ণমালা ও ভাষাশিক্ষার উপকরণ, সাময়িকী এবং পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ বা পুনর্মুদ্রণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবছর একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে সাধারণ মানুষ সহজেই জানতে পারবেন- কোন ভাষায় কী প্রকাশিত হয়েছে এবং আগের বছরের কাজ কতটা এগিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিযোগিতার জন্য নয়; বরং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ও ভাষা সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে।
তিন সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব বিস্তৃত। তাই তাদের সামগ্রিক সাফল্য শুধু মাতৃভাষার কাজ দিয়ে বিচার করা যাবে না। কিন্তু মাতৃভাষা ও বর্ণমালা যদি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ফলাফল প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। প্রশ্নটি তাই সরল-
অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার পাশাপাশি মাতৃভাষা ও বর্ণমালার জন্য কী প্রকাশনা রেখে যাচ্ছে তিন প্রতিষ্ঠান?
কারণ একটি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একটি বই থেকে যায়। একটি বর্ণমালার গ্রন্থ শুধু অক্ষর শেখায় না, একটি ভাষার লিখিত অস্তিত্বও ধরে রাখে। ভাষা শুধু মুখে বেঁচে থাকে না; বইয়ে, বর্ণমালায় এবং ধারাবাহিক প্রকাশনায়ও বেঁচে থাকে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন