শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়ের বেদনা, ভাষার প্রেম ও স্বপ্নবাহী এক কাব্যযাত্রা: কবি ঊষাতন চাকমা - ইনজেব চাঙমা

  

    মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে, যা কেবল ব্যক্তিগত ইতিহাসের সীমানায় আবদ্ধ থাকে নাতা এক বিস্তীর্ণ জনপদের স্মৃতি, একটি জাতিসত্তার সংগ্রাম এবং মাতৃভাষার দীর্ঘশ্বাসকে ধারণ করে কবি ঊষাতন চাকমা তেমনই এক অনন্য জীবনগাথার নাম তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যার কলমে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিসর্গ যেমন রঙিন হয়ে ওঠে, তেমনি বাস্তুচ্যুত জীবনের নির্মম বেদনা, মাতৃভাষার আকুলতা, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অটল দায়বদ্ধতা সমান শক্তিতে ধ্বনিত হয় তাঁর কবিতা কেবল কাব্যিক সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়; বরং ইতিহাস, স্মৃতি, আত্মপরিচয় স্বপ্নের এক চিরন্তন অভিযাত্রা

    সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯৮০ সালের ২ জুলাই খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার শান্তিপুর গ্রামের (চেঙে পার) সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির বুকে কবি ঊষাতন চাকমা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিনয় কৃষ্ণ চাকমা এবং মাতা সুমিতা চাকমা। চার সন্তানের স্নেহময় পরিবারে তিনি দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠেন।

    বর্তমানে তাঁর সহধর্মিণী তন্বী চাঙমা, যার পৈতৃক নিবাস রাঙামাটি জেলার তবলছড়ি এলাকার মাঝের বস্তি। তাঁদের দাম্পত্য জীবন দুই সন্তানের হাসি-আনন্দে পরিপূর্ণ, পুত্র উৎকর্ষ চাঙমা (তূর্ণ), ৯ম শ্রেণি এবং কন্যা রূধিরা চাঙমা (তমা) ৪ বছর। পাহাড়ের নির্মল বাতাস, ঝরনার সুর, জুমক্ষেতের রঙিন সৌন্দর্য এবং পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল জীবন ছিল তাঁর শৈশবের প্রথম পাঠশালা।

     তবে এই শান্ত নির্মল শৈশব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি ইতিহাসের অস্থির তরঙ্গ তাঁকে খুব অল্প বয়সেই উদ্বাস্তু জীবনের করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চারটি বছর তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর বেদনাময় অধ্যায় পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বাগানটিলা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া, নিরাপত্তার অভাব, অনিশ্চিত দিন আর অন্ধকারের মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর শিশুমনে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তা- পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এই সংকীর্ণ বাস্তবতার মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন- একদিন স্বদেশে ফিরে নিজের ভাষায় লিখবেন, নিজের মানুষের কথা বলবেন সেই স্বপ্নই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যচর্চার শক্ত ভিত্তি রচনা করে

    শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হলেও শরণার্থী শিবিরের অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হয় দেশে ফেরার পর পানছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন এরপর পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে পানছড়ি সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ১৯৯৬ সালে এসএসসি এবং খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯৮ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন

    উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলতার সঙ্গে স্নাতক (অনার্স) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত বিস্তৃত সাহিত্যাঙ্গন তাঁর চিন্তার জগৎকে নতুন মাত্রা দেয় বাংলা, ইংরেজি বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত পাঠ তাঁর কাব্যভাষাকে পরিপক্ব সমৃদ্ধ করে তোলে

     শিক্ষকতা দিয়ে কবি ঊষাতন চাকমার কর্মজীবনের সূচনা ঘটে ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের মেরন সান স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ঢাকার বনফুল আদিবাসী গ্রিন হার্ট কলেজে শিক্ষকতা করেন তরুণদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর এই সময়টি তাঁর জন্য অত্যন্ত প্রীতিময় তৃপ্তিদায়ক ছিল

    পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তিনি জনতা ব্যাংক পিএলসি.-তে যোগদান করে পেশাগত জীবনে নতুন অধ্যায় সূচনা করেন বর্তমানে তিনি মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পেশাগত নানা ব্যস্ততা সত্ত্বেও সাহিত্য সৃষ্টি থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি; দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন শেষে তিনি প্রতিনিয়ত ফিরে গিয়েছেন কবিতার নীরব সৃষ্টিশীল জগতে

     কলেজজীবনে সূচনা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চা গতি পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক পত্রিকায় বাংলা কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, অনলাইন সাহিত্যপত্র এবং শিশু-কিশোর সাময়িকীতে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে

    তিনি ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প এবং শিশুদের জন্য গান রচনায় সমান স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তাঁর লেখার ভাষা সহজ-সরল, অথচ অনুভূতি অত্যন্ত গভীর তাঁর কাব্যভাষায় পাহাড়ের মাটি, মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম, বেদনা আত্মপরিচয়ের সুর একাকার হয়ে ফুটে ওঠে

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাজসমূহ:

 রানজুনির রং (২০২২): চাকমা ভাষায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, পাহাড়সম হৃদয় (২০২৩): বাংলা ভাষায় রচিত কাব্যগ্রন্থ, চাঙমা নিজেনী: যৌথভাবে সম্পাদিত চাকমা ভাষা শিক্ষার বই সংজোআর: চাকমা সাহিত্য বা-এর রজতজয়ন্তী উপলক্ষে সম্পাদিত বিশেষ স্মারকগ্রন্থ   এবং শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষায় অবদান রাখার লক্ষ্যে চাকমা ভাষায় রচিত তাঁর একটি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে

     শিশু-কিশোর সাহিত্যচর্চার প্রতি কবি ঊষাতন চাকমার গভীর অনুরাগ রয়েছে ঢাকার শিশু-কিশোর পত্রিকা- কানামাছি এবং বগুড়ার কুঁড়ি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখেন তিনি বিশ্বাস করেন, কচি-কাঁচাদের হাতে বই তুলে দিতে পারলে ভাষা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকবে

    এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলন, কবিতা উৎসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত কবিতা পাঠ আবৃত্তি করেন তাঁর উচ্চারিত কবিতায় ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি পাহাড়ের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি লাভ করে

 ঊষাতন চাকমার সাহিত্যভাবনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে মাতৃভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, একটি জাতির ভাষা হারিয়ে গেলে তার অস্তিত্ব ইতিহাসও ধীরে ধীরে মুছে যায় তাই তাঁর কাছে সাহিত্যচর্চা কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, এটি জাতিসত্তা সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রাম

    ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল পরিবারপ্রেমী মানুষ তাঁর সহধর্মিণী তন্বী চাকমা ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর একজন সিনিয়র শিক্ষক এক ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে তাঁদের পরিবার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা শিক্ষণীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ

     কবি ঊষাতন চাকমার জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে যে সংগ্রাম মানুষকে ভেঙে ফেলে না, বরং তাকে আরও মানবিক, সংবেদনশীল সৃজনশীল করে তোলে শরণার্থী শিবিরের নির্মম কষ্ট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা, শিক্ষকতার অনুভূতি, ব্যাংকিং জীবনের ব্যস্ততা এবং সাহিত্যসাধনার নিরলস পথচলা- সব মিলিয়ে তিনি আজ পাহাড়ি জনপদের এক অনন্য স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর যতদিন পাহাড়ের প্রকৃতি রবে এবং মাতৃভাষার প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকবে, ততদিন কবি ঊষাতন চাকমার কবিতা পাঠকের হৃদয়ে চির অম্লান থাকবে

 

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

কবি নূতন ধন চাঙমা: শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচেতনার অন্যতম এক আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

"যে মানুষ এক হাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালান, অন্য হাতে কবিতার অক্ষরে একটি জাতির আত্মপরিচয় রচনা করেন, তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের সাংস্কৃতিক জাগরণের দলিল।"


পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে জন্ম নেওয়া কবি নুতন ধন চাঙমা সেইসব আলোকিত মানুষের অন্যতম, যাঁরা শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ত্রিমাত্রিক সাধনায় নিজেকে নিবেদিত করেছেন। তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন সৃজনশীল কবি, দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী এবং সমাজমনস্ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর কলমে যেমন পাহাড়ের প্রকৃতি প্রাণ পায়, তেমনি উচ্চারিত হয় মানুষের জীবনসংগ্রাম, ভাষার অস্তিত্ব এবং জাতিসত্তার অম্লান চেতনা।

১৯৭৮ সালের ৩০ এপ্রিল খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার মধুমঙ্গল পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা আনন্দ রাখাল চাঙমা এবং মাতা চন্দ্র বালা চাঙমা। পারিবারিক স্নেহ, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত নির্মাণ করে। পরবর্তীকালে জীবনের সহযাত্রী হন সুপিলা চাঙমা, যিনি তাঁর সাহিত্য ও কর্মজীবনের নীরব প্রেরণার উৎস।

নুতন ধন চাঙমার শিক্ষাজীবন ছিল অধ্যবসায় ও আত্মনির্মাণের এক ধারাবাহিক যাত্রা। ১৯৯৪ সালে পুজগাংমুখ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৯৬ সালে পানছড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৯৮ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষকতা পেশাকে কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং জাতি গঠনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তিনি ২০০৫ সালে ফেনী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে এমএড ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষাবিদ হিসেবে নিজের দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেন।

২০০০ সালে লোগাং বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। শ্রেণিকক্ষ তাঁর কাছে ছিল কেবল পাঠদানের স্থান নয়; বরং একটি স্বপ্ন নির্মাণের কর্মশালা। তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, সংস্কৃতিবোধ এবং সাহিত্যপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেখান না, মানুষ গড়েন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতায়ও রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য পদচিহ্ন। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো-এর প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দৈনিক সমকাল এবং দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করেছেন।

সংবাদ সংগ্রহ তাঁর কাছে ছিল কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়; বরং প্রান্তিক মানুষের কথা, পাহাড়ের বাস্তবতা এবং সমাজের নীরব সত্যকে বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে তুলে ধরার এক সামাজিক অঙ্গীকার। তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পাহাড়ের জীবন, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সময়ের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা।

কবি নুতন ধন চাঙমার সাহিত্যচর্চার মূল ভিত্তি তাঁর মাতৃভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তিনি চাঙমা ভাষায় ‘ঘিলেফুল’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে মাতৃভাষার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।

‘ঘিলেফুল’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি পাহাড়ি মানুষের অনুভূতি, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য, প্রেম, স্মৃতি, জীবনসংগ্রাম এবং জাতিগত আত্মপরিচয়ের কাব্যিক দলিল। তাঁর কবিতায় পাহাড়ের সবুজ, ঝরনার কলতান, মানুষের হাসি-কান্না এবং ভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা একাকার হয়ে যায়। সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষা তাঁর কাব্যকে সাধারণ পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

নুতন ধন চাঙমা সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একই সূত্রে বেঁধেছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করেছেন; সাংবাদিক হিসেবে সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন; আর কবি হিসেবে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে শব্দের অলংকারে অমর করে রেখেছেন।

তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বৃহত্তর সমাজ, ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধ অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে তাঁর রচনা কেবল নান্দনিকতার জন্য নয়, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দলিল হিসেবেও মূল্যবান।

কবি নুতন ধন চাঙমার জীবন আমাদের শেখায়—কলম যখন শিক্ষার আলো, সাহিত্যের সৌন্দর্য এবং সমাজের দায়বদ্ধতাকে একসূত্রে গাঁথে, তখন একজন মানুষ নিজের সীমানা অতিক্রম করে সময়ের সম্পদে পরিণত হন। তাঁর কর্ম, সাহিত্য এবং আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাতৃভাষা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের পথে অনুপ্রাণিত করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে তাঁর নাম তাই এক নিবেদিত শিক্ষক, এক সংবেদনশীল কবি এবং এক দায়িত্বশীল সমাজসচেতন মানুষের পরিচয়ে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

অনুকরণীয় শিক্ষক সুমনা চাঙমা: পাহাড়ের কোলে আলোর দ্যুতি - ইনজেব চাঙমা

মানুষ গড়ার কারিগর এক আলোকিত শিক্ষকের গল্প

  

সুমনা চাঙমা
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের মহৎ কর্ম সময়ের বুক থেকে কখনো মুছে যায় না। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ জন্ম নেয়, আবার একদিন নীরবে চলে যায়। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক মানুষই তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও মানবিকতার মাধ্যমে মৃত্যুকেও অতিক্রম করে অমরত্ব লাভ করেন। তাঁদের জীবন ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; সমাজের, জাতির এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনির্বাণ প্রেরণার উৎস।

    একজন আদর্শ শিক্ষকও তেমনি একজন নির্মাতা। তিনি ইট-পাথরের স্থাপনা নির্মাণ করেন না; তিনি নির্মাণ করেন মানুষের বিবেক, চরিত্র, মনন ও স্বপ্ন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাই একদিন সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।

    পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, ঝরনার সুর, জুমক্ষেতের ঘ্রাণ আর নিরাভরণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ভেতর জন্ম নিয়েছেন এমনই এক আলোকিত মানুষ- সুমনা চাঙমা। তিনি কেবল একজন প্রধান শিক্ষিকা নন; তিনি একজন স্বপ্নসাধক, সংস্কৃতিসেবী, মানবিক শিক্ষাবিদ এবং অনেক অনেক শিক্ষার্থীর জীবনের নীরব স্থপতি।

    প্রচারবিমুখ এই মানুষটি কখনো আলো খুঁজে বেড়াননি; বরং নিজেই আলো হয়ে উঠেছেন। তাঁর কর্মই তাঁকে পরিচিত করেছে। তাঁর সাফল্যের পরিমাপ কোনো পদক বা পদবিতে নয়; তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের জীবনেই তাঁর প্রকৃত পরিচয় লেখা আছে।

    ১৯৬৩ সালের ২২ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলার কমলছড়ি গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুমনা চাঙমা। তাঁর পিতা বিনোদ বিহারী চাকমা এবং মাতা লীলাময়ী চাঙমা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পরিবারে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও শিক্ষার যে পরিবেশ ছিল, তা তাঁর চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

    শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী, অধ্যবসায়ী ও সৃজনশীল। পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্য, আবৃত্তি ও সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। পাহাড়ের প্রকৃতি তাঁর সংবেদনশীল মনকে যেমন কোমল করেছে, তেমনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে মানবিক হতে শিখিয়েছে।

    জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি বাঁধা পড়লেন বাঘাইছড়ি উপজেলার ঝগড়াবিল গ্রামে  অনন্ত বিজয় চাকমার সাথে। স্বামী পেশায় ছিলেন মাটিরাঙা উপজেলার ফুড কন্ট্রোলার, আজ অবসরপ্রাপ্ত। বর্তমানে তাঁদের বসবাস খাগড়াছড়ি সদর উপালি পাড়া গ্রামে।  তাঁদের কোল জুড়ে দুই কৃতী সন্তান - বড় ছেলে অগ্নিভ চাকমা তূর্য, খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের চিকিৎসক, বিসিএস ক্যাডারভুক্ত এক মানবিক ডাক্তার; আর ছোট ছেলে পৃথ্বীভ চাকমা নুটু, ছোট ছেলে পৃথ্বীভ চাঙমা নুটু পরিবেশ বিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।

    অনেকে চাকরি করেন জীবিকা নির্বাহের জন্য; কিন্তু কিছু মানুষ পেশাকে জীবনদর্শনে পরিণত করেন। সুমনা চাঙমা ছিলেন সেই বিরল মানুষের একজন। বাড়ির পাশে উন্নয়ন বোর্ডে অফিস সহকারী পদে যোগদানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই চাকরি গ্রহণ করেননি। কারণ তাঁর স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার। মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তিনি শিক্ষকতার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন।

    ১৯৮৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি রাঙামাটি জেলার দুর্গম জুরাছড়ি উপজেলা “ফকিরাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়” সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পাহাড়ি দুর্গম পথ, দীর্ঘ পদযাত্রা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, সব প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই শুরু হয় তাঁর কর্মজীবনের মহাকাব্য। সকাল -৯টার দিকে যাত্রা শুরু করলে অনেক সময় বিকেল -৫টার দিকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হতো। চারপাশের প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা কষ্ট তাঁকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং এসব প্রতিকূলতাকেই তিনি নিজের শিক্ষকতা জীবনের শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।

তিনি মনে করেন

"প্রতিকূলতা আমাকে কখনো ভয় দেখাতে পারেনি। আমার কাছে বিদ্যালয় ছিল উপাসনালয়, আর শিক্ষার্থীরা ছিল সেই উপাসনার দেবতা।"

২০০০ সালের ১৭ আগস্ট তিনি কুকিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বিদ্যালয়ের অবস্থা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। বৃত্তি পরীক্ষায় সাফল্যের হার শূন্য, শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল, সহশিক্ষা কার্যক্রম প্রায় অনুপস্থিত।

কিন্তু তিনি বিদ্যালয়টিকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেননি।

তিনি প্রথমেই বিদ্যালয়ের প্রতিটি নথি পর্যালোচনা করেন। কোথায় সমস্যা, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় সম্ভাবনা, সবকিছু বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি বিদ্যালয়টিকে সম্পূর্ণ বদলে দেন।

যে বিদ্যালয় একসময় বৃত্তি পরীক্ষায় শূন্য ছিল, সেই বিদ্যালয়ই ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ বৃত্তি অর্জনে জেলার অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। শতভাগ পাস, ধারাবাহিক সাফল্য এবং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, এসবই তাঁর নিরলস সাধনার ফসল।

সুমনা চাঙমার কাছে শিক্ষা মানে ছিল না কেবল বই মুখস্থ করা। তিনি বিশ্বাস করতেন "যে শিশু গান শেখে, সে সহিংসতা থেকে দূরে থাকে; যে শিশু কবিতা পড়ে, তার হৃদয় মানবিক হয়; যে শিশু ছবি আঁকে, সে পৃথিবীকে সুন্দরভাবে দেখতে শেখে।"

তাই বিদ্যালয়ে তিনি আবৃত্তি, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, গল্প লেখা, উপস্থিত বক্তৃতা, ক্রীড়া এবং পাঠাভ্যাসকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

নিজের অর্থে বই কিনেছেন। নিজের বাড়ির সংবাদপত্র বিদ্যালয়ে নিয়ে গেছেন। বিদ্যালয়ে পাঠাগার গড়েছেন। শিশুদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন, তখন শিক্ষা হয়ে ওঠে হৃদয়ের সম্পর্ক। দীর্ঘ বন্ধ/ছুটির সময় বাড়িতে তাঁর তত্ত্বাবধানে রেখে, মায়ের মতো স্নেহ-মমতায় লেখাপড়া করিয়েছেন। নিজের বিনোদন বিসর্জন দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে সময় দিতেন। এভাবে  শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

তাঁর কাছে কোনো শিশুর পরিচয় ছিল না তার অর্থনৈতিক অবস্থান; তাঁর কাছে প্রতিটি শিশুই ছিল সম্ভাবনার এক একটি প্রদীপ।

তাঁর নেতৃত্বে কুকিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে চিত্রাঙ্কন, কবিতা আবৃত্তি, গল্প লেখা, উপস্থিত বক্তৃতা, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করে।

২০১৪ সালে আশামণি চাকমা আন্তঃপ্রাথমিক অঙ্ক দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকার করে বিদ্যালয়ের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনে। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করে।

তাঁর অনেক শিক্ষার্থী আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত এবং কেউ কেউ সম্পন্ন করেছে। কেউ বিদেশে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করছে, কেউ উন্নয়নকর্মী, কেউ শিক্ষক, সেনাবাহিনী, আবার কেউ বিদেশে অধ্যয়নরত আর কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে কর্মরত।

সুমনা চাঙমা শুধু শিক্ষক নন; তিনি একজন সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। তিনি একজন দক্ষ আবৃত্তিকার এবং রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। অবসর গ্রহণের আগে আন্তর্জাতিক শিল্পী-সাহিত্যিক সম্মিলন পরিষদ "বিশ্বভরা প্রাণ"-এর জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

অবসরের পর অধিকাংশ মানুষ যখন বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন সুমনা চাঙমা নতুন উদ্যমে সংস্কৃতিচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট-এ তিন বছর মেয়াদি রবীন্দ্রসংগীত কোর্সে অধ্যয়নরত। তাঁর এই অধ্যবসায় প্রমাণ করে, শেখার কোনো বয়স নেই। এ যেন তাঁর জীবনের আরেকটি বসন্ত। তিনি বিশ্বাস করেন,  "শিক্ষা যেমন আজীবনের সাধনা, সংস্কৃতিও তেমনি আজীবনের অনুশীলন।"

 দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ (চট্টগ্রাম বিভাগ, ২০২২)। শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী সম্মাননা। এবং প্রথম আলোর বন্ধুসভা পুরস্কার ২০২২খ্রি.।

একাধিকবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচিত হন (০৯/০৪/২০০৮ খ্রি., ২৫/০৯/২০১২খ্রি., ২৯/০৯/২০১৪খ্রি. ১৯/০৭/২০১৫খ্রি.) । এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা হিসেবে বিভাগীয় সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ।

কালের কণ্ঠ পত্রিকায় "অনুকরণীয় শিক্ষক সুমনা চাকমা: পাহাড়ের কোলে আলোর দ্যুতি" শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদন।

 শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে মালয়েশিয়া শিক্ষা সফর।

২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন সুমনা চাঙমা। কিন্তু তাঁর জীবনের কর্মযজ্ঞ থেমে যায়নি। আজও তিনি সাহিত্য পড়েন। রবীন্দ্রসংগীত শেখেন। আবৃত্তি করেন। নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন। কারণ তিনি জানেন, আলো কখনো অবসর নেয় না। একজন মানুষ, এক অনন্ত উত্তরাধিকার; একজন শিক্ষক কত দূর পর্যন্ত মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারেন, সুমনা চাঙমার জীবন তার এক অনন্য উদাহরণ।

তিনি বিদ্যালয়কে ভালোবেসেছেন নিজের সংসারের মতো। শিক্ষার্থীদের ভালোবেসেছেন নিজের সন্তানের মতো। সংস্কৃতিকে ধারণ করেছেন আত্মার মতো। আর মানুষ গড়াকে গ্রহণ করেছেন জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে। আজ তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। তাঁদের প্রতিটি অর্জনের ভেতরে জেগে আছে এক শিক্ষকের নীরব স্পর্শ।

সুমনা চাঙমা তাই কেবল একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা-ইতিহাসের এক দীপ্তিমান অধ্যায়, এক মানবিক আলোকবর্তিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার নাম।

তথ্যসূত্র: পিন্টু চাঙমা, শিক্ষক (সুমনা চাঙমার শিক্ষার্থী)। “শতফুল” প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা। দৈনিক কালেকণ্ঠ,  ৫ অক্টোবর ২০১০ খ্রি.

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

শব্দের ভুবনে এক নিবেদিত প্রাণ: কবি বিনয় বিকাশ তালুকদার

কবি বিনয় বিকাশ তালুকদার
"একটি জাতির ভাষা যখন তার নিজস্ব বর্ণমালায় উচ্চারিত হয়, তখন সেই ভাষার প্রতিটি শব্দ ইতিহাসের মতো দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। আর সেই ইতিহাসকে যাঁরা কলমে ধারণ করেন, তাঁরাই জাতির প্রকৃত আলোকবর্তিকা।"

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় শুধু সবুজ বনানী, ঝরনা আর মেঘের নিবাস নয়; এটি শতাব্দীপ্রাচীন ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। সেই ভাণ্ডারের নীরব প্রহরীদের অন্যতম কবি বিনয় বিকাশ তালুকদার, যিনি জীবনের আরাম-আয়েশ নয়, বেছে নিয়েছেন শব্দের কঠিন সাধনা এবং জাতিসত্তার সেবাকে।

১৯৬১ সালের ১১ নভেম্বর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার নাবিদে পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা রেবতি রঞ্জন তালুকদার এবং মাতা কল্পলতা চাঙমার স্নেহছায়ায় বেড়ে উঠলেও শৈশব ছিল অভাব, অনটন ও সংগ্রামে ঘেরা। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর স্বপ্নকে পরাজিত করতে পারেনি; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস এবং নিজের জাতির জন্য কিছু করার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই তাঁর জীবনের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

শিক্ষাজীবনের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র তার ভাষা ও সাহিত্য। সেই উপলব্ধি থেকেই সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে। তাঁর কলমে জন্ম নিতে থাকে কবিতা, নাটক, গল্প, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ। ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা অতিক্রম করে তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে পাহাড়ের জীবন, মানুষের সংগ্রাম, সংস্কৃতির গৌরব এবং অস্তিত্ব রক্ষার আকুতি। তাঁর রচনাগুলো বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়ে পাঠকমহলে বিশেষ সমাদৃত হয়।

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সমান সক্রিয় ছিলেন। ২০১৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক ফোরাম-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সাহিত্য আন্দোলনে নতুন প্রাণসঞ্চার করেন। ২০১৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ অ্যাসোসিয়েশন-এর শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। পরের বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম শিক্ষা সহায়ক ফাউন্ডেশন-এর ট্রাস্টি সম্পাদক হিসেবে শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তাঁর কর্মপরিধি কেবল সংগঠনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। ‘তানঝাং’ নামের চাঙমা সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি নতুন লেখকদের উৎসাহিত করেছেন, সাহিত্যচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন এবং চাঙমা ভাষার বিকাশে নিরলস শ্রম দিয়েছেন। একই সঙ্গে চাঙমা ভাষা প্রশিক্ষক হিসেবে মাতৃভাষা ও চাঙমা বর্ণমালা শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাপ্রীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে জাগ্রত করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।

কবি বিনয় বিকাশ তালুকদারের সাহিত্যজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আহ্’ভিল্যাচ’। এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণ চাঙমা ভাষায় এবং চাঙমা বর্ণমালায় প্রকাশিত, যা কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক সাংস্কৃতিক ঘোষণা। নিজস্ব ভাষা ও লিপিতে সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মা, ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি।

আজ বিনয় বিকাশ তালুকদার কেবল একজন কবির নাম নন; তিনি এক নীরব সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর কলমে পাহাড়ের নিসর্গ যেমন কথা বলে, তেমনি উচ্চারিত হয় মানুষের অধিকার, ভাষার মর্যাদা এবং সংস্কৃতির অমর আবেদন। তিনি বিশ্বাস করেন, যে জাতি তার ভাষাকে ভালোবাসে, সেই জাতির ইতিহাস কখনো বিলীন হয় না।

সময়ের স্রোত একদিন মানুষের জীবনকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের সাহিত্যিকের সৃষ্টি কখনো থেমে থাকে না। বিনয় বিকাশ তালুকদারের শব্দসাধনা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অটল নিবেদন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর সাহিত্যকর্ম ও সাংস্কৃতিক অবদান চাঙমা জাতিসত্তার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে দীর্ঘকাল স্মরণীয় থাকবে।

 

সবার আগে আমি একজন মানুষ - ইনজেব চাঙমা


মানুষের পরিচয় কি কেবল তার ধর্মে?
সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—এই প্রশ্নের উত্তরেই কি তার সমস্ত অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের পরিচয়েরও আগে আছে একটি হৃদয়, একটি মন, কিছু স্বপ্ন, কিছু আনন্দ এবং মুক্তভাবে বেঁচে থাকার অধিকার?

 সম্প্রতি ‘শ্রাবণে মেঘগুলো’ ভিডিওকে কেন্দ্র করে স্কুলশিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল সমালোচনার মুখে পড়েছেন (২৩জুলাই ২০২৬ ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে সমালোচনা শুরু হয়)। তাঁকে ঘিরে যখন নানা প্রশ্ন, মন্তব্য ও বিতর্কের ঢেউ উঠেছে, তখন প্রতিবাদে সরব হয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ, কবি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষেরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, আমরা কি একজন মানুষকে তাঁর কর্ম দিয়ে বিচার করছি, নাকি তাঁর পরিচয়ের দেয়াল দিয়ে মাপছি?

 একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি পাতা নন। তিনি বিদ্যালয়ের ঘণ্টা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ থাকা বন্ধ করেন না। শ্রেণিকক্ষের বাইরে তাঁরও একটি পৃথিবী আছে, সেখানে আছে হাসি, গান, অনুভূতি, সংস্কৃতি, আনন্দ আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ছোট ছোট ইচ্ছা। দিনের পর দিন অন্যের সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব যিনি বহন করেন, তাঁর নিজের মনের জন্য কি সামান্য আকাশ থাকবে না?


মানুষের জীবন শুধু দায়িত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা নয়। দায়িত্বের পাশাপাশি আনন্দও আছে, কর্মের পাশাপাশি বিশ্রামও আছে, আর কঠোর বাস্তবতার পাশে আছে শিল্প ও বিনোদনের কোমল আশ্রয়। বিনোদন কোনো অপরাধ নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক অধিকার। গান মানুষের ক্লান্তি দূর করে, কবিতা মানুষের মনকে আলোড়িত করে, শিল্প মানুষকে জীবনের সৌন্দর্য চিনতে শেখায়।

 তবু কখনো কখনো আমরা ভুলে যাই, একজন মানুষের পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও তাঁর একটি ব্যক্তিসত্তা আছে। আমরা শিক্ষককে শুধু শিক্ষক হিসেবে দেখতে চাই, শিল্পীকে শুধু শিল্পী হিসেবে, শ্রমিককে শুধু শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু পরিচয়ের এই কঠিন খাঁচার ভেতরে যে একটি হৃদয় নিঃশব্দে স্পন্দিত হয়, তার কথা আমরা কতবার ভাবি?

 এই ঘটনাকে ঘিরে আমার মনে আরও একটি প্রশ্ন জাগে, তিনি যদি অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ হতেন, তবে কি একইভাবে তাঁকে এত প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হতো? প্রশ্নটি কোনো ধর্মকে ছোট করার জন্য নয়; বরং সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বৈষম্য ও দ্বিমুখী মানদণ্ডকে খুঁজে দেখার জন্য। মানুষের প্রতি আমাদের বিচার যদি ধর্মভেদে বদলে যায়, তবে সেখানে মানবতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

 ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে মানুষের কণ্ঠ স্বাধীন হবে, মর্যাদা নিরাপদ থাকবে এবং পরিচয়ের কারণে কেউ অবহেলিত বা বৈষম্যের শিকার হবেন না। আমরা ভেবেছিলাম, নতুন দিনের আলো পুরোনো সংকীর্ণতার অন্ধকার ভেদ করবে। কিন্তু আজও যদি ধর্ম, পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষের স্বাধীনতা নির্ধারণ করে, তবে আমাদের সেই স্বপ্নের পথ এখনো অনেক দূর।

 ধর্ম মানুষের বিশ্বাস—এটি হৃদয়ের আলো। কিন্তু ধর্ম কখনো মানুষের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়াক, তা কাম্য নয়। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রিস্টান, বিশ্বাসের পথ আলাদা হতে পারে, প্রার্থনার ভাষা ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু মানুষের কান্নার ভাষা এক, হাসির রং এক, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এক।

 আমরা যখন কাউকে দেখি, তখন আগে তাঁর ধর্ম নয়, তাঁর মানুষটিকে দেখি। আগে তাঁর পরিচয় নয়, তাঁর হৃদয়কে বুঝি। কারণ ধর্ম মানুষকে বিশ্বাসের পথ দেখায়, কিন্তু মানবতা মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে যায়।
আজ তাই আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে একটি বাক্য জেগে উঠুক—
“আমি হিন্দু নই, মুসলিম নই, বৌদ্ধ নই, খ্রিস্টান নই—এই পরিচয়গুলোরও আগে আমি একজন মানুষ।”
মানুষের পেশা তার দায়িত্ব, ধর্ম তার বিশ্বাস, সংস্কৃতি তার আত্মার ভাষা; কিন্তু মানবতা তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

 বিউটি রাণী পালকে ঘিরে এই আলোচনা তাই শুধু একজন শিক্ষিকাকে নিয়ে নয়। এটি আমাদের বিবেকের সামনে রাখা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা কি একজন মানুষকে দেখতে পাচ্ছি, নাকি শুধু তাঁর ধর্মীয় পরিচয়?

 সময় এসেছে পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানবতার পথে দাঁড়ানোর। সময় এসেছে অন্যের আনন্দকে সম্মান করার, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়ার এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার।
কারণ—
ধর্মের আগে মানবতা, পরিচয়ের আগে মর্যাদা, আর সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে—মানুষ।

 
#বি.দ্র.: “২০২৪ পর দেশে যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, আজ সেই প্রত্যাশা নানা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি হেনস্তা, ভয়ভীতি, সামাজিক অপমান কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ উদ্বেগজনক।

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

কবি বিনয় শংকর চাঙমার জীবন, সাহিত্য ও সংগ্রাম - ইনজেব চাঙমা

 
“যে কবি নিজের জনপদের কান্না শুনতে পান, তিনিই একদিন একটি জাতির স্মৃতির ভাষা হয়ে ওঠেন।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় কেবল সবুজ অরণ্যের বিস্তার নয়; তার প্রতিটি ঢালে জমে আছে ইতিহাসের স্তর, প্রতিটি ছড়ায় প্রবাহিত হয় মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের দীর্ঘ উপাখ্যান। সেই উপাখ্যানকে শব্দে, কবিতায় এবং গানে রূপ দিয়েছেন কবি বিনয় শংকর চাঙমা। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি পাহাড়ের স্মৃতিরক্ষক, স্বজাতির ভাষার প্রহরী এবং সংস্কৃতির অন্যতম নিবেদিতপ্রাণ সাধক।

প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং জীবনের নির্মম বিপর্যয় তাঁর সাহিত্যযাত্রাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি ক্ষত তাঁর সৃষ্টিকে করেছে আরও গভীর, আরও মানবিক। তাই তাঁর কলমে যেমন ফুটে উঠেছে পাহাড়ের অপরূপ প্রকৃতি, তেমনি উচ্চারিত হয়েছে মানুষের বেদনা, ইতিহাসের দহন, জাতিসত্তার সংগ্রাম এবং অস্তিত্ব রক্ষার অদম্য প্রত্যয়। তাঁর অমর সৃষ্টি “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক।

১৯৪৯ সালের ১১ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার কিয়াংঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বিনয় শংকর চাঙমা। পিতা বিত্তলাল চাঙমা এবং মাতা বিজন মালা চাকমা এর স্নেহময় পরিবারেই তাঁর শৈশবের বীজ রোপিত হয়।

শৈশবের পাঠশালা ছিল পাহাড়, নদী, ছড়া, জুমক্ষেত, বনভূমি আর প্রকৃতির উন্মুক্ত অঙ্গন। পাহাড়ি মানুষের সরল জীবন, উৎসবের রঙ, প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য এবং লোকজ সংস্কৃতির স্পন্দন তাঁর কিশোর মনকে এমনভাবে আলোড়িত করেছিল যে পরবর্তী জীবনে সেগুলোই হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যজগতের প্রধান অনুষঙ্গ। প্রকৃতি তাঁর কাছে কেবল দৃশ্য নয়, সে ছিল শিক্ষক, বন্ধু এবং অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস।

ব্যক্তিজীবনে তিনি জীবনসঙ্গিনী বাসনা চাঙমাকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক স্নেহময় পরিবার। তাঁদের দুই কন্যা বিজয়িনী (সোনা) ও বিদুসিনি (রূপা) এবং দুই পুত্র—বিমুক্তি দর্শন চাঙমা ও অলিয়ন চাঙমা।

রাঙামাটিতে শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি উপলব্ধি করেন, একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
এই উপলব্ধিই তাঁকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে। তিনি পাহাড়ী ছাত্র সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তরুণ শিল্পীদের সংগঠিত করেন।
তাঁর লেখা প্রকাশিত ‘শিঙা’ গানের সংকলন পাহাড়ি সাংস্কৃতিক জাগরণের এক স্মরণীয় মাইলফলক। যেন দীর্ঘ নীরবতার পর আত্মপরিচয়ের ”শিঙা” প্রথমবারের মতো প্রতিধ্বনিত হয়েছিল পাহাড়ের উপত্যকায়।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি লেমুছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাঁচ বছর শিক্ষকতা করার পর সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগে যোগ দেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু সরকারি চাকরির ব্যস্ততা কখনোই তাঁর সাহিত্যচর্চাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। দিনের দাপ্তরিক কর্মব্যস্ততার পর রাতের নির্জনতাই হয়ে উঠত তাঁর সৃষ্টির সময়। পাহাড় যেন নীরবে তাঁর সঙ্গে কথা বলত, আর তিনি সেই কথোপকথনকে কবিতা, গান ও গদ্যের ভাষায় অমর করে রাখতেন।
বিনয় শংকর চাঙমার সাহিত্যজীবন যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বেদনাবিধুর। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও গান লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যসাধনার পথ বারবার আগুনে দগ্ধ হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ে মিজো ও পাঠানদের হামলায় তাঁর বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়ে যায়। দীর্ঘ সাধনার ফসল মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়।
এরপর ২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট মহালছড়িতে সেটেলার বাঙ্গালির সংঘটিত সহিংসতায় তাঁর বাড়িঘর অগ্নিসংযোগে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই আগুনে তাঁর অবশিষ্ট সাহিত্যকর্মও ভস্মীভূত হয়।
চাকমা সমাজে একটি প্রবাদ আছে, “চুরে নিলে তিন কুন, আগুনে নিলে চের কুন।” অর্থাৎ, চোর কিছু নিয়ে গেলেও কিছু অবশিষ্ট থাকে; কিন্তু আগুন গ্রাস করলে আর কিছুই ফিরে পাওয়া যায় না।

এই প্রবাদ যেন তাঁর জীবনেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, আগুন তাঁর কাগজ পুড়িয়েছে, তাঁর স্বপ্ন নয়। প্রতিবার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই তিনি আবার নতুন করে কলম হাতে তুলে নিয়েছেন।
বিনয় শংকর চাঙমা একজন শক্তিমান গীতিকারও। তাঁর রচিত “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” গানটি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মণি স্বপন দেওয়ান-এর সুরে পরিবেশিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা অতিক্রম করে দেশ-বিদেশের চাকমা সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এটি কেবল একটি গান নয়; এটি পাহাড়ের মানুষ, লোগাং, নদী, ভালোবাসা এবং স্বদেশচেতনার এক জীবন্ত দলিল। আজও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিঝু উৎসব কিংবা প্রবাসী চাকমা সমাজের মিলনমেলায় এই গান একই আবেগে উচ্চারিত হয়।
যে গান মানুষের স্মৃতিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে, সেটিই প্রকৃত অর্থে লোকঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” সেই মর্যাদাই অর্জন করেছে।

বিনয় শংকর চাঙমার সাহিত্যভুবন বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। তিনি চাকমা ভাষা ও বাংলায় সমান দক্ষতায় কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, ভ্রমণকাহিনি এবং আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ, ১। রাঙাবেল (চাকমা কবিতা ও বাংলা অনুবাদসহ, ২০১৯), ২। চিত্তমণি ও ধিত্তমণি: সাত প্রজন্মের বংশতালিকা (২০২১), ৩। এযের ফাগুন মাচ (চাকমা কবিতা, ২০২৩), ৪। আমি আদিবাসী (চাকমা কবিতা, ২০২৩), ৫। সবুজ পাহাড়ের কান্না (বাংলা কবিতা, ২০২৩)
এছাড়াও তাঁর ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ রচনা এখনও অপ্রকাশিত। এর মধ্যে রয়েছে, ১। মার ভাচ, ২। ফাগুত্তুম, ৩। মিয়ানমার ভ্রমণ কাহিনী, ৪। ভারতের তীর্থ ও ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ কাহিনী, ৫। অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ কাহিনী, ৬। আমার অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ৭। চিগোন ছড়া, ৮। আতঙ্কিত জনপদে বিঝু প্রভৃতি।

বিনয় শংকর চাঙমার কবিতায় পাহাড় কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের প্রতীক। তাঁর ভাষা সহজ, স্বচ্ছ ও হৃদয়স্পর্শী; কিন্তু তার অন্তর্গত অনুভব গভীর। লোকজ উপমা, চাকমা সংস্কৃতির চিত্রকল্প, প্রকৃতির প্রতীকী ব্যবহার এবং মানবিক সংবেদনশীলতা তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তাঁর রচনায় প্রকৃতি কখনো মায়ের মতো আশ্রয়দাত্রী, কখনো প্রতিবাদের সহযাত্রী, আবার কখনো ইতিহাসের নির্বাক সাক্ষী। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে সমসাময়িক পাহাড়ি সাহিত্যধারায় অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিনয় শংকর চাঙমার জীবন ও সাহিত্য পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য প্রতিফলন। ব্যক্তিগত ক্ষতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অগ্নিকাণ্ডে বারবার পাণ্ডুলিপি হারানো, কোনো প্রতিকূলতাই তাঁর সাহিত্যসাধনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি।
তিনি শুধু কবিতা রচনা করেননি; তিনি একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে সাহিত্যের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয়, একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি।

আজ তিনি খাগড়াছড়ির খবং পজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা অতিক্রম করে বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরেও গভীর মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সময় মানুষের দেহকে ক্ষয় করে, কিন্তু সত্যিকারের সাহিত্যিক সময়কে অতিক্রম করেন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। বিনয় শংকর চাঙমার জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

আগুন তাঁর পাণ্ডুলিপিকে ছাই করেছে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি; ধ্বংস করেছে কাগজ, কিন্তু নিভিয়ে দিতে পারেনি তাঁর স্বপ্নের প্রদীপ। তাই তিনি কেবল একজন কবি নন, তিনি পাহাড়ের স্মৃতিবাহক, ভাষার প্রহরী এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক অনমনীয় রক্ষক।
যতদিন পাহাড় থাকবে, ছড়ার জল বহমান থাকবে, মানুষের মুখে মুখে লোকগান ভেসে উঠবে, ততদিন বিনয় শংকর চাঙমার নামও উচ্চারিত হবে পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে। তাঁর সাহিত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে—ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিই একটি জাতির সবচেয়ে স্থায়ী আশ্রয়, আর সেই আশ্রয় নির্মাণে কবির কলম কখনো পরাজিত হয় না।

তথ্যসূত্র
১. কবি বিনয় শংকর চাঙমার ব্যক্তিগত জীবনবৃত্তান্ত ও মৌখিক সাক্ষাৎকার।
২. কবির প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তির প্রতিশ্রুতি, রক্তের পুনরাবৃত্তি - ইনজেব চাঙমা

 

ইনজেব চাঙমা

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

সুরের অমলিন প্রদীপ: শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার - ইনজেব চাঙমা

শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার

সুরের অমলিন প্রদীপ: শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার

মানুষের জীবন কখনো কখনো একটি গানের মতো—কখনো উচ্ছ্বাসে ভরা, কখনো বেদনার সুরে বিষণ্ন। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর জীবন কোনো একক জীবনের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; তাঁর কণ্ঠ, তাঁর শিল্প আর তাঁর সৃষ্ট স্মৃতি সময়ের স্রোত পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্পর্শ করে। শরীর একদিন নিঃশেষ হয়, অথচ শিল্পের অনুরণন থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায়, একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগীত-ঐতিহ্যে তৃপ্তি তালুকদার ছিলেন তেমনই এক উজ্জ্বল নাম—যাঁর জীবন ছিল সংগীত, সংস্কৃতি, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয়।

তৃপ্তি তালুকদার নামে তিনি সর্বাধিক পরিচিত হলেও জন্মসূত্রে ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত দেওয়ান পরিবারের কন্যা। তাঁর পিতা তেজেন্দ্র লাল দেওয়ান এবং মাতা জ্যোতির্ময়ী দেওয়ান। ১৯৪০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন লারমা গঝা পিড়াভাঙা গুত্তিভুক্ত এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। এই পরিবারে শিক্ষা, শিল্পচর্চা, সংস্কৃতিপ্রীতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত মূল্যবোধ। সেই পরিবেশেই শৈশবের তৃপ্তির হৃদয়ে প্রথম জেগে ওঠে সংগীতের প্রতি অনুরাগ, নৃত্যের প্রতি আকর্ষণ এবং অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি মঞ্চে গান গাইতে শুরু করেন। যে বয়সে অধিকাংশ শিশু খেলায় মগ্ন থাকে, সে বয়সেই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে শিল্পের প্রথম আহ্বান। সেই ক্ষুদ্র পদচারণাই পরবর্তীকালে তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম স্মরণীয় কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করে।

১৯৪৯ সালে তিনি রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মেধা, শৃঙ্খলা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিভার জন্য অল্প সময়েই তিনি শিক্ষকদের স্নেহ ও সহপাঠীদের শ্রদ্ধা অর্জন করেন। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে বিদ্যালয়ের ‘বেস্ট গার্ল’ নির্বাচিত হয়ে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূতের হাত থেকে একটি রূপার কাসকেট পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি ছিল কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর সম্মাননা নয়; ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল শিল্পীসত্তার প্রতি সময়ের নীরব স্বীকৃতি।

১৯৫৯ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরও এক বছর আগে, ১৯৫৮ সালে, তিনি অমিয় প্রকাশ তালুকদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু সংসার তাঁর শিল্পসাধনার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। বরং বিবাহোত্তর জীবনেই তিনি চট্টগ্রামের সঙ্গীত ভবন থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত ও রবীন্দ্রসংগীতে তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা অর্জন করে নিজের শিল্পীজীবনকে আরও পরিপূর্ণ করে তোলেন।

সংসারও ছিল তাঁর আরেকটি সৃজনভূমি। তিনি ছিলেন তিন পুত্রের স্নেহময়ী জননী—তুষার শুভ্র তালুকদার (বাবলী), পার্থ প্রতিম তালুকদার (মিঠুল) এবং আশীষ তালুকদার (বিটু)। মাতৃত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব এবং শিল্পসাধনা—এই তিন ধারাকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় একসূত্রে বেঁধেছিলেন।

তাঁর কণ্ঠ ছিল কোমল অথচ দৃঢ়, মধুর অথচ গভীর। রবীন্দ্রসংগীতের আবেগময় সৌন্দর্য যেমন তিনি নিখুঁত ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করতে পারতেন, তেমনি চাকমা লোকগানের সহজ-সরল প্রাণস্পন্দনও তাঁর কণ্ঠে নতুন প্রাণ লাভ করত। তাঁর কাছে সংগীত ছিল না কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ; ছিল আত্মপরিচয়ের ভাষা, সংস্কৃতির ধারক এবং মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার সবচেয়ে নির্মল পথ।

গানের পাশাপাশি নৃত্য ও নাট্যকলাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। রাঙামাটির ঐতিহাসিক রাজবাড়ীতে রাজমাতা বিনীতা রায় ও সলিল রায়ের পরিচালনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘মৃণালিনী’ নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। সেই নাট্যমঞ্চে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়, কুমার সৌমিত রায়, রাজকুমারী মৈত্রী রায়, রাজকুমারী রাজশ্রী রায়, কবি অরুণ রায়, অনিল রায়, জয়তী রায়, প্রণতি দেওয়ানসহ রাজপরিবার ও সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁদের পাশে সমান দক্ষতায় অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় বংশে নয়, প্রতিভায়; পরিচিতিতে নয়, সাধনায়।

বাংলাদেশের বেতারজগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের নিবন্ধিত রবীন্দ্রসংগীত ও চাকমা গানের শিল্পী। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পাহাড়িকা’ অনুষ্ঠানের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তাঁর সুরেলা কণ্ঠ বেতারের তরঙ্গে ভেসে পৌঁছেছে পাহাড়ের জনপদ থেকে সমতলের অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে।

বিশেষত চাকমা ভাষার গান পরিবেশন করে তিনি এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেন। গীতিকার সুগত চাকমা ননাধন ও শিল্পী রঞ্জিত দেওয়ানের রচিত বহু গান তিনি কণ্ঠে ধারণ করেন। রঞ্জিত দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর গাওয়া একাধিক দ্বৈত সংগীতও শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর কণ্ঠে মাতৃভাষার গান যেন পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছতা, অরণ্যের বাতাসের নির্মলতা এবং মানুষের মমত্বের উষ্ণতা একসঙ্গে ধারণ করত।

তৃপ্তি তালুকদার কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন একজন আদর্শ স্ত্রী, স্নেহময়ী মা এবং সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। সংসারের দায়িত্ব পালনের মধ্যেও তিনি কখনো শিল্পচর্চাকে বিসর্জন দেননি। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—যে মানুষ শিল্পকে ভালোবাসে, সে জীবনকেও ভালোবাসে।

২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর উত্তর কালিন্দীপুরের নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল পঁচাশি বছর। তিনি রেখে গেছেন তিন পুত্র, তিন পুত্রবধূ এবং চারজন নাতি-নাতনি। তবে তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তাঁর পরিবার নয়; তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য গান, তাঁর শিল্পসাধনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর আজীবন নিবেদন।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবু পাহাড়ি সন্ধ্যায় যখন কোনো পুরোনো চাকমা গান ভেসে আসে, কিংবা রবীন্দ্রসংগীতের কোনো সুর হৃদয়কে নীরব করে দেয়, তখন মনে হয়—তৃপ্তি তালুকদারের কণ্ঠ এখনও বাতাসে মিশে আছে। কারণ প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শিল্পে, তাঁর উত্তরসূরিদের স্মৃতিতে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীরতম অনুচ্ছেদে।

তৃপ্তি তালুকদারের জীবন তাই কেবল একজন শিল্পীর জীবনী নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগীত-ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—শিল্পের সাধনা নিছক ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার নীরব সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের এক নিবেদিত, বিনয়ী ও দীপ্তিমান যোদ্ধা ছিলেন শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার।

তথ্য: তুষার শুভ্র তালুকদার 



কবি আশীষ খীসা : পাহাড়ের নৈঃশব্দ্যে যে কবি শব্দের প্রদীপ জ্বালান - Injeb Changma

পাহাড়ের জীবন কখনো কেবল পাহাড়ের মতো স্থির নয়। তার বুকের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অজস্র গল্প — বৃষ্টিভেজা শৈশব , সবুজের মায়া , ...