তরুণ কুমার চাঙমা : ঐতিহ্য হারানোর বেদনায় এক কবির কণ্ঠ - ইনজেব চাঙমা
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী, জুমজীবন, লোকসংস্কৃতি ও মানুষের সহজ-সরল জীবনধারা, এসবের সঙ্গে যে কবির সৃষ্টিশীল মন গভীরভাবে যুক্ত, তিনি কবি ও গীতিকার তরুণ কুমার চাঙমা। তাঁর কবিতা ও গানে যেমন পাহাড়ি জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ধরা পড়ে, তেমনি ধরা পড়ে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে, তা তাঁকে ভাবিয়েছে গভীরভাবে। সেই ভাবনা তাঁর সাহিত্য ও গানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
কবি তরুণ কুমার চাকমা ১৯৫৮ সালের ২১ জানুয়ারি রাঙামাটি জেলার বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের খারেক্ষ্যং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা চঞ্চয় চাঙমা এবং মাতা লক্ষ্মী সোনা চাঙমা। খারেক্ষ্যং গ্রামের প্রকৃতি ও পার্বত্য জনজীবনের আবহেই তাঁর শৈশব-কৈশোরের ভিত্তি গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তিনি ১৯৭৯ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রীর নাম ভাগ্য সোনা চাঙমা। তাঁদের এক ছেলে প্রদীপ্ত চাঙমা এবং এক মেয়ে জয়া চাঙমা।
তরুণ কুমার চাকমার প্রাথমিক শিক্ষা রাজদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নিজের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন নিয়েও চিন্তা করেছেন। শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চা, দুই ধারার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাকে পরিণত করেছে এবং সৃষ্টিশীলতাকে দিয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
তরুণ কুমার চাকমার সাহিত্যিক যাত্রায় গানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩ সালে খারেক্ষ্যং বনানী পাঠাগার, রাঙামাটির উদ্যোগে তাঁর একক গানের সংকলন ‘বাঝী র’ প্রকাশিত হয়। অল্প বয়সেই প্রকাশিত এই সংকলন তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রাথমিক পরিচয় বহন করে।
তাঁর গানের ভাষা ও বিষয়বস্তুতে পার্বত্য মানুষের জীবন, প্রকৃতি, অনুভূতি এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। গান তাঁর কাছে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির কথা বলার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁর সৃষ্টিতে পাহাড়ি মানুষের জীবনযাপন, আনন্দ-বেদনা এবং পরিবর্তিত সময়ের অভিঘাত একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
গানের পাশাপাশি তরুণ কুমার চাঙমা কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ রচনায়ও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন। ২০০৫ সালে তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ ‘এচ্যা বিঝুত মা গঙ্গী তরে দিবে বিজু ফুল’ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি চাকমা ও বাংলা দুই বর্ণে প্রকাশিত হওয়ার ফলে এর পাঠপরিসরও বিস্তৃত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় গ্রন্থটির প্রকাশনা সম্পন্ন হয়েছিল বলে জানা যায়।
এরপর তাঁর আরও কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভাবিবের কথা’ এবং ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ‘জুম গাভুরী’। তাঁর সাহিত্যকর্মের সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করা যায় ‘সুজাতা ও ভগবান বুদ্ধ’ গ্রন্থটিকে।
এই গ্রন্থগুলোর মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যচর্চার বিষয়বৈচিত্র্যও প্রতিফলিত হয়। একদিকে রয়েছে পাহাড়ি জনজীবন, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ; অন্যদিকে রয়েছে দর্শন, জীবনবোধ ও মানবিক উপলব্ধির প্রকাশ।
তরুণ কুমার চাঙমার সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর দায়বোধ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু প্রাচীন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকাচার ও জীবনধারা সময়ের পরিবর্তনে ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে, এই বাস্তবতা তাঁর চিন্তাকে নাড়া দিয়েছে।
আধুনিকতার প্রবাহ, সামাজিক পরিবর্তন এবং বহিরাগত সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির অনেক উপাদান আজ আগের মতো জীবন্ত নেই। এই পরিবর্তনকে তিনি কেবল সামাজিক রূপান্তর হিসেবে দেখেননি; এর মধ্যে নিজের জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকটও অনুভব করেছেন। ফলে তাঁর গান ও কবিতায় অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ পাশাপাশি উপস্থিত হয়েছে।
তাঁর সাহিত্য যেন সেই হারিয়ে যেতে বসা সময়ের প্রতি এক ধরনের স্মৃতিরক্ষার প্রয়াস। তিনি পাহাড়ের মানুষের জীবনকে শুধু বাইরে থেকে দেখেননি; বরং সেই জীবনের ভেতর থেকে উঠে আসা অনুভূতিকে শব্দ ও সুরে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।
তরুণ কুমার চাঙমার কবিতার ভাষায় জটিলতার চেয়ে অনুভবের স্বাভাবিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সৃষ্টিতে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামষ্টিক জীবনবোধ পাশাপাশি চলেছে। পাহাড়ের প্রকৃতি তাঁর কাছে নিছক দৃশ্য নয়, এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাঁর গানেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মানুষের মুখের ভাষা, পরিচিত জীবন, পার্বত্য প্রকৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির নিবিড় সম্পর্ক তাঁর সাহিত্যকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। তাই তাঁকে শুধু কবি বা গীতিকার হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না; তিনি একই সঙ্গে নিজের সমাজের একজন সচেতন সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষক।
দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে তরুণ কুমার চাঙমা বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। জীবনের শেষ পর্বে শারীরিক অসুস্থতারও মুখোমুখি হয়েছেন; স্ট্রোকের পর তিনি সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন। বর্তমানে তিনি রাঙামাটি শহরের রাজবাড়ী এলাকার লিচুবাগান এলাকায় বসবাস করছেন বলে জানা যায়।
তবে বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রার মূল্য কমিয়ে দেয়নি। কয়েক দশক ধরে গান ও কবিতার মাধ্যমে তিনি যে জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধারণ করেছেন, তা পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
তরুণ কুমার চাঙমার সৃষ্টিকর্মের মূল্য শুধু তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যায় নয়; বরং তাঁর রচনায় যে সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি সংরক্ষিত হয়েছে, তার মধ্যেই তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নিহিত। পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রা যখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন তাঁর গান ও কবিতা হয়ে উঠেছে একটি সময়ের স্মারক।
একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি প্রজন্মের কাছে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দিয়েছেন; একজন কবি ও গীতিকার হিসেবে তিনি ধারণ করেছেন পাহাড়ের মানুষের অনুভূতি; আর একজন সচেতন সাংস্কৃতিক মানুষ হিসেবে নিজের জাতিসত্তার ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে কণ্ঠ দিয়েছেন। এই তিন পরিচয়ের সমন্বয়েই তরুণ কুমার চাঙমার সাহিত্যিক সত্তা গড়ে উঠেছে।
পাহাড়ের বাতাসে যেমন পুরোনো দিনের গন্ধ থেকে যায়, তেমনি তাঁর কবিতা ও গানের ভেতরও থেকে গেছে একটি সময়ের মানুষ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির স্মৃতি। সেই স্মৃতিই তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারায় স্বতন্ত্র করে রেখেছে।
তথ্য: রাণ্যাফুল কাব্যগ্রন্থ, কবির প্রকাশিত বই। সহযোগিতা করেছেন, কবি মৃত্তিকা চাঙমা ও শুভ্র জ্যোতি চাঙমা।
বি.দ্র.: লেখাটিতে তথ্যগত অসংগতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। কোনো কোনো বক্তব্য আপনার জানা তথ্য বা মতের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তাই লেখাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে, নিজস্ব জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ রইল। হোয়াটঅ্যাপ: 01516-195366

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন