জুম্মদের দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ : বিভেদের শেকড় কোথায়? - ইনজেব চাঙমা

পাহাড়ের ইতিহাসে কিছু ক্ষত আছে, যার রক্তচিহ্ন মুছে গেলেও ব্যথা মুছে যায় না। সময়ের স্রোত অনেক কিছু দূরে সরিয়ে নেয়, কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে কিছু বিভাজন, কিছু মৃত্যু, কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন কখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। জুম্মদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সংঘাত তেমনই এক গভীর ক্ষত, যার অভিঘাত আজও পাহাড়ের সমাজ ও রাজনীতিকে বহন করতে হচ্ছে।

জুম্মদের মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে অনেকে ‘দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর সূচনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রায়ই বলা হয়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সবার মনঃপূত হয়নি; চুক্তির বিরোধিতা থেকেই পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের স্লোগান নিয়ে ইউপিডিএফের জন্ম এবং পরবর্তীতে সংঘাতের সূত্রপাত। কিন্তু ইতিহাস কি সত্যিই এত সরল?

একটি নদীর ভাঙন যেমন হঠাৎ একদিনে শুরু হয় না, তার আগে নদীর তলায় অদৃশ্যভাবে সরে যায় মাটি; তেমনি কোনো রাজনৈতিক বিভাজনও কেবল একটি ঘটনার দিনে জন্ম নেয় না। তার আগে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকে মতপার্থক্য, অভিমান, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক দূরত্ব এবং পারস্পরিক সন্দেহ। ১৯৯৭ সালের চুক্তি হয়তো সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক; কিন্তু বিভেদের সব শেকড় যে কেবল চুক্তির মধ্যেই নিহিত ছিল, এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি ধারণ করে না।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে চুক্তিরও আগের সময়ের দিকে, বিশেষ করে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও যুব আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের দিকে। তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ ও বক্তব্য এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক দলিলের পাতায় লেখা থাকে না; আন্দোলনের ভেতরে থাকা মানুষদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ বয়ানেও তার অনেক অপ্রকাশিত অধ্যায় লুকিয়ে থাকে।

‘পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ১ যুগ পূর্তি, ২০০১’ স্মারকগ্রন্থে জীবন চাঙমার ‘চুক্তি বিরোধীরা কার স্বার্থে’ শীর্ষক লেখায় সেই সময়ের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও মতপার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন—

“১৯৯৫ সালের শেষ দিকে শেষ বারের মতো প্রসিত আর রবি বাবু এলো পার্টির সভাপতির সাথে সাক্ষাত করতে। পার্টি ও বাইরে আন্দোলনরত কতিপয় ছাত্র ও যুব নেতার মধ্যেকার বিরাজমান সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য। এর পরে সঞ্চয়ের নেতৃত্বে আট নয় জনের একটা গ্রুপ এসেছিল। আজকের কথিত শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ-এর শীর্ষস্থানীয় নেতাই ছিল তখন। এদের সাথেই মূলত মতবিরোধ এক সময় তিক্ততায় পরিণত হয়।”

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, চুক্তি স্বাক্ষরের অনেক আগেই ছাত্র-যুব নেতৃত্বের একটি অংশের সঙ্গে পার্টির সম্পর্কের মধ্যে মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ পরবর্তী রাজনৈতিক বিভাজনের সবটুকু ব্যাখ্যা কেবল ১৯৯৭ সালের চুক্তির পর থেকে শুরু করলে তার আগের ঘটনাপ্রবাহটি অদৃশ্য থেকে যায়।

জীবন চাঙমার লেখায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। মতপার্থক্য থাকলেও তৎকালীন সময়ে পার্টির পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়ার সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। আন্দোলনের লক্ষ্য অভিন্ন, এই উপলব্ধি থেকেই মতভিন্নতা যেন সংঘাতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি লিখেছেন—

“পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যতই মতভিন্নতা থাক আমাদের লক্ষ্য তো এক, সুতরাং যদি আন্দোলন করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যেকার দূরত্ব বেড়েই যায় তাহলেও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে হোক। অর্থাৎ ঝগড়া বিবাদটাও নিজেদের জানাজানির মাধ্যমে একটা সমঝোতার ভেতর হয়ে যাক। তার মানে আন্দোলন যে যার লাইনে করবে কিন্তু নিজেদের মধ্যে সংঘাত হবে না। এভাবে আন্দোলনকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো।”

এই বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তৎকালীন মতপার্থক্যকে তখনও অনিবার্য বিচ্ছেদ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং একই বৃহত্তর সংগ্রামের ভেতরে ভিন্ন মত ও ভিন্ন কর্মপদ্ধতির সহাবস্থানের একটি পথ খোঁজা হচ্ছিল। কিন্তু ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় দেখায়, সেই বোঝাপড়ার সেতু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি।

জীবন চাঙমার লেখায় আরও একটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ওই ছাত্র-যুব নেতারা পার্টির শপথ নেওয়া সদস্য বা কর্মী ছিলেন না। পার্টির শুভেচ্ছা ও সমর্থন নিয়ে তাঁরা নিজেদের মতো করে ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে আন্দোলনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তাঁর ভাষায়- 

“পার্টি অবশ্য কোনকালেই তাদের নির্দেশ দেয়নি। কারণ নির্দেশ দেয়ার তারা কে? তারা তো পার্টির কোন শপথ নেয়া সদস্য বা কর্মী নয়। পার্টির খেয়ে জুম্ম জনগণের স্বার্থে আন্দোলন করে যাচ্ছে। অর্থাৎ পার্টির শুভেচ্ছা নিয়ে নিজেদের মত করে ছাত্র যুবকদের নিয়ে আন্দোলনের স্বার্থে কর্মকান্ড চালাচ্ছে। তারা পার্টির নির্দেশ শোনার কে?”

কিন্তু একই সঙ্গে তিনি পার্টির অবস্থানও ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বর্ণনায়, পার্টি তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ভবিষ্যতের আন্দোলনের নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিল। তিনি লিখেছেন- 

“পার্টি কি চেয়েছে? পার্টি চেয়েছে এই অগ্রগামী ছাত্র-যুবকরাই আগামী দিনের আন্দোলনের ভবিষ্যত। তাদের গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্বই পালন করতে চেয়েছে পার্টি।”

এই সম্পর্কের মধ্যে তাই ছিল এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতা, একদিকে পার্টির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক আশ্রয়, অন্যদিকে ছাত্র-যুব নেতৃত্বের নতুন প্রজন্মের উদ্যম ও আন্দোলনের শক্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের ভেতরেই যদি অবিশ্বাসের ছায়া ঘনীভূত হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী বিভাজনকে বুঝতে সেই মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।

জীবন চাঙমার স্মৃতিচারণে পার্টির পক্ষ থেকে ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি আন্তরিকতা ও সহযোগিতার কথাও এসেছে। তিনি লিখেছেন-

“এদিক থেকে পার্টির কোন কার্পণ্য ছিল না। আন্তরিকতায়, আপ্যায়নে ছিল না কোন খুঁত। বরং বলা যায় সামর্থ্যেরও বেশি মনোনিবেশ করেছে পার্টি। সংশ্লিষ্ট পার্টি সদস্যরা নিজেরা কম খেয়ে, কষ্ট স্বীকার করেও দু'হাত বাড়িয়েছিল আন্দোলনরত ছাত্রদের সুখে-দুঃখে।”

এই বর্ণনা নিঃসন্দেহে তৎকালীন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা হলো, একসময় যে সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার, সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের মধ্যেই সন্দেহ জন্ম নিতে পারে।

ক্ষমতা, নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সুবিধা, সাংগঠনিক প্রভাব, এসব প্রশ্ন যখন কোনো আন্দোলনের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন ব্যক্তিগত সম্পর্কও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অর্থ পেতে শুরু করে। কে কাকে অনুসরণ করবে, কে নেতৃত্ব দেবে, কার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে, এই প্রশ্নগুলো তখন শুধু সাংগঠনিক প্রশ্ন থাকে না; হয়ে ওঠে পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন।

তবে এসব কারণকে ইতিহাসের চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ঘোষণা করার আগে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও প্রত্যক্ষ দলিল, স্মৃতিকথা ও সাক্ষ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা হলো, স্মৃতিকে প্রমাণের বিকল্প করে ফেলা। এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

যদি মতপার্থক্য এতটাই গভীর হয়ে থাকে, তাহলে ১৯৯৫-৯৬ সালেই কেন আলাদা রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠল না? কেন তখনই বিচ্ছেদ ঘটল না? সম্ভবত এর উত্তর নিহিত ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই।

সশস্ত্র সংগ্রাম তখনও চলমান। বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে। পার্টি ও ছাত্র-যুব আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্কও পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। মতপার্থক্য থাকলেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক পরিসর তাদের পাশাপাশি রেখেছিল। ফলে বিরোধ ছিল, কিন্তু সেই বিরোধ তখনও সাংগঠনিক বিচ্ছেদের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ, বিভাজনের জন্য শুধু মতপার্থক্য যথেষ্ট ছিল না; প্রয়োজন ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাহাড়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর একটি অংশ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। যারা বছরের পর বছর পরিবার-পরিজন থেকে দূরে ছিলেন, তারা ঘরে ফেরেন। জীবনের ক্লান্ত শরীর কিছুটা বিশ্রাম চায়, পরিবারকে সময় দিতে চায়, স্বাভাবিক জীবনের স্পর্শ ফিরে পেতে চায়। কিন্তু একই সময়ে আন্দোলনের ভেতরে জমে থাকা রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোও নতুনভাবে সামনে আসে।

চুক্তিকে কেউ দেখলেন দীর্ঘ সংগ্রামের একটি রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে; কেউ দেখলেন অসম্পূর্ণ সমাধান হিসেবে। আর এই মতপার্থক্যের ওপর ভর করেই পরবর্তী সময়ে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

এখানেই চুক্তি একটি স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে থাকতে পারে, কিন্তু স্ফুলিঙ্গ যেখানে আগুন ধরায়, সেখানে আগে থেকেই শুকনো কাঠ জমে থাকে।

চুক্তির পর পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের স্লোগান সামনে রেখে ইউপিডিএফের আবির্ভাব ঘটে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ক্রমে সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং পরে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। একই জাতিসত্তার মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক মতভেদ গণতান্ত্রিক বিতর্ক, সংগঠন ও আন্দোলনের ভিন্ন পথের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেতে পারত, তা ধীরে ধীরে অস্ত্রের ভাষা পেতে শুরু করে। এভাবেই পাহাড়ের আকাশে আরেক ধরনের অন্ধকার নেমে আসে।

যে মানুষগুলো একসময় একই স্বপ্নের কথা বলেছিল, তাদের কেউ কেউ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াল। যে পাহাড়ে অধিকার ও আত্মপরিচয়ের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম চলেছিল, সেই পাহাড়ের বুকেই শুরু হলো নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষরণ।

আজ প্রায় তিন দশক পেরিয়ে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে সংঘাত শুধু জীবন কেড়ে নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে আস্থা। পরিবার ভেঙেছে, সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, জুম্ম জনগণের দীর্ঘদিনের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যে শক্তি, ঐক্য ও সামাজিক সংহতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, অভ্যন্তরীণ সংঘাত সেই ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।

একটি জাতির সংগ্রাম কেবল পাহাড়, নদী, বন বা ভূমির জন্য নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষের পারস্পরিক আস্থা। সেই আস্থা যখন ভেঙে যায়, তখন বাহ্যিক প্রতিপক্ষের চেয়েও গভীর ক্ষত তৈরি হয় ভেতরে।

তাই আজ ফিরে তাকালে প্রশ্ন জাগে, চুক্তি কি সত্যিই সবকিছুর শুরু? নাকি চুক্তি ছিল এমন এক দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রকাশের মুহূর্ত, যার শেকড় আরও গভীরে? ইতিহাসের প্রতি ন্যায় করতে হলে হয়তো আমাদের এই প্রশ্নটিই নতুন করে করতে হবে।

কোনো পক্ষকে সম্পূর্ণ দায়ী করে ইতিহাস লেখা সহজ। কিন্তু ইতিহাসের সত্য সাধারণত এত সহজ নয়। সেখানে থাকে বহু মানুষের বহু সিদ্ধান্ত, বহু ভুল, বহু অপূর্ণতা এবং বহু না-বলা কথা।

তাই জুম্মদের দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের ইতিহাসকে শুধু ‘চুক্তিপন্থী’ ও ‘চুক্তিবিরোধী’, এই দুই শব্দের মধ্যে আটকে রাখলে ইতিহাসের একটি বড় অংশ অন্ধকারে থেকে যাবে। দেখতে হবে চুক্তির আগের রাজনৈতিক সম্পর্ক, ছাত্র-যুব আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, নেতৃত্বের প্রশ্ন, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং চুক্তি-পরবর্তী পরিবর্তিত বাস্তবতা, সবকিছুকে একই ধারাবাহিকতায়।

তবে একটি বিষয় আজও স্পষ্ট, যে বিভাজনের আগুন একদিন রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে জ্বলে উঠেছিল, তা বহু বছর ধরে একই সমাজের বুক পুড়িয়েছে। পাহাড়ের ভবিষ্যৎ তাই অতীতকে ভুলে যাওয়ার মধ্যে নয়; বরং অতীতকে নির্ভয়ে পড়ার মধ্যে। কে কোথায় ভুল করেছিল, কোথায় সম্পর্কের সেতু ভেঙেছিল, কোন মুহূর্তে মতপার্থক্য শত্রুতায় রূপ নিয়েছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

কারণ ইতিহাসকে চাপা দিলে ইতিহাস মুছে যায় না। বরং অমীমাংসিত ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধে আরও ভারী হয়ে ফিরে আসে।

প্রায় ত্রিশ বছরের এই রক্তাক্ত বিভাজন জুম্ম সমাজকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তার সবচেয়ে কঠিন পাঠ সম্ভবত একটাইএকটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামে বাহ্যিক প্রতিকূলতার চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজন কখনো কখনো আরও গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।

যে অর্জনের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেই অর্জন যদি নিজেদের মধ্যকার সংঘাতের ধোঁয়ায় ম্লান হয়ে যায়, তবে ইতিহাসের কাছে আমাদের প্রশ্ন করতেই হবে, আমরা কি অতীতের ত্যাগকে যথার্থ অর্থে ধারণ করতে পেরেছি? আজ সেই প্রশ্নই পাহাড়ের বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আর উত্তরটি খুঁজে বের করার দায়িত্ব, শুধু ইতিহাসবিদের নয়; পুরো জুম্ম সমাজের।

[জেন-জি যদি ইতিহাস থেকে শুধু ক্ষোভ নেয়, বিভাজন চলবে। যদি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, তাহলে হয়তো নতুন একটি পথ তৈরি হবে। পাহাড়ের আগামী দিনের প্রশ্ন তাই শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে নয়, তোমাদের কাছেও। তোমরা কি পুরোনো বিভাজনের উত্তরাধিকার বহন করবে, নাকি ইতিহাসকে বুঝে একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা করবে?]
 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা